Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৬ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০, ১২:৪২ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

গরুর মাংসের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি


১২ আগস্ট ২০২০ বুধবার, ১১:৫৫  এএম

সাদিয়া রহমান

বহুমাত্রিক.কম


গরুর মাংসের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি

আমাদের মুসলমানদের ধর্মীয় সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভক্ষণযোগ্য যতো মাংস/গোশত রয়েছে, তার মধ্যে গরুর মাংস নিঃসন্দেহে অন্যতম সুস্বাদু ও জনপ্রিয়। গরুর মাংস দিয়ে রান্না করা ঝাল ফ্রাই, কালাভূনা, লালভূনা, শাহী রেজালা, শিক কাবাব, শাহী কাবাব, টিক্কা কাবাব, মেজবানি, বিরিয়ানী সহ ইত্যাদি নানা রকমের মুখরোচক খাবারের নাম মনে এলেই জিভে জল চলে আসে!

মুসলমানদের মধ্যে জীবনে গরুর মাংস চেখে দেখেনি কিংবা স্বাদ নেয়নি, এমন লোকের সংখ্যা খুঁজে পাওয়া দায়! প্রানঘাতী করোনা মহামারীর চোখ রাঙানো হুমকির মাঝেও অতি সম্প্রতি আমরা স্ব-পরিবারে পালন করলাম আমাদের প্রিয় উৎসব পবিত্র ঈদ-উল-আজহা।

আমাদের দেশ সহ মুসলিম উম্মাহর বসবাসরত পৃথিবীর সকল দেশেই মহান আল্লাহকে রাজি ও খুশি করতে ত্যাগের মাহাত্ম্য অনুধাবন করে কোরবানী করা হয়েছে লাখ লাখ গরু। আমাদের ধর্মীয় বিধান অনুসরন করে সেসব জবাইকৃত গরু গুলোর মাংসও আমরাই সমাজের সকলের সঙ্গে মিলেমিশে খেয়ে থাকি। অন্যান্য অনেক ধর্মের মানুষও নিয়মিত গরুর মাংস খেয়ে থাকেন।

বেশ সুস্বাদু ও মেহমানদের খাতিরদারিতে বিখ্যাত এই মাংস খাওয়া নিয়ে আবার অনেকের মাঝেই রয়েছে নানান রকমের বাতিক! সেটি হচ্ছে, গরুর মাংস স্বাস্থ্যের জন্য অনুপযোগী। এর পেছনে অবশ্য উপযুক্ত কারণও রয়েছে। প্রেশারের এবং হার্টের রোগীদেরকে প্রায়শই গরুর মাংস খেতে নিষেধ করে থাকেন ডাক্তারগন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গরুর মাংস সত্যিই কী স্বাস্থ্যের জন্য এতোটা ক্ষতিকর? কিংবা গরুর মাংসের উপকারী দিকগুলোই বা কী কী? আজকের লিখাটি লিখতে চলেছি গরুর মাংসের নানা উপকারী দিক নিয়েই…!

শুরুতেই বলে নেয়া ভালো, সুস্থ, স্বাভাবিক, রোগমুক্ত মানুষজন স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিমিত পরিমাণে গরুর মাংস খেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য বরং উপকারই বয়ে আনে। গরুর মাংসের প্রানীজ প্রোটিন সাধারণত উচ্চ মানের হয় এবং দেহের বৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। আমাদের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের একক বৃহত্তম উৎস হিসেবে এই মাংস ভূমিকা রাখতে পারে । কারন এতে প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো এডিসের সব কয়টিই বিদ্যমান থাকে।

প্রতিদিন আমাদের দেহে প্রোটিনের চাহিদা থাকে (Dietary Reference Intake/DRI) প্রতি কেজি ওজনের জন্য ০.৮ গ্রাম । সেই অনুপাতে প্রাপ্ত বয়স্ক একজন পুরুষের জন্য গড়ে প্রায় ৫৬ গ্রাম এবং প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার জন্য গড়ে প্রায় ৪৬ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। এদিকে প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর মাংসে (৮৫% চর্বিহীন মাংস/ lean meet+১৫% চর্বি) প্রোটিন থাকে ২৬ শতাংশ এবং পানি থাকে প্রায় ৬০ শতাংশ। তাই অল্প পরিমাণে গরুর মাংস প্রোটিন চাহিদা বেশ ভালোভাবেই মেটাতে সক্ষম। তবে বেশ কিছুটা কোলেস্টেরল বিদ্যমান থাকায় এবং অন্য সকল উপাদানের উপর ভিত্তি করে গরুর মাংস মাঝারী পরিমাণেই খাবার পরামর্শ দেন ডাক্তারগণ।

এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যদিও লাল এই মাংস প্রোটিন ভিটামিন এবং খনিজের উৎস, তবুও প্রক্রিয়াজাত মাংসের ব্যবহার প্রতিদিন ৭০ গ্রাম (রান্না ওজন) বা প্রতি সপ্তাহে 500 গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত । উচ্চ মাত্রায় গ্রহণে (৯০ গ্রামের বেশি গ্রাম প্রতি দিন) অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে।

গরুর মাংসে উপস্থিত খনিজ উপাদান সমূহ:

আয়রন: গরুর মাংসের সর্বোত্তম স্বাস্থ্য উপকারিতা হলো এতে প্রচুর পরিমাণে হিম আয়রন থাকে, যা সহজেই শোষিত হয় এবং রক্ত স্বল্পতা রোধে সহায়তা করে। পর্যাপ্ত আয়রনের অভাবে অক্সিজেন বহনকারী হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। তাই বলা যায় শক্তির স্তর বজায় রাখতে আয়রন একটি প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে।

ফসফরাস: ফসফরাস দেহে বৃদ্ধিসাধন এবং আভ্যন্তরীন রক্ষণাবেক্ষণের কাজে সহায়তা করে।

জিংক: স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার জন্য শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ন। এটি যথাসম্ভব কার্যকর রাখতে শরীরে যথেষ্ট পরিমাণ জিংক নিশ্চিত করা খুবই জরুরী। পরিমান মতো গরুর মাংস প্রতিদিন জিংকের চাহিদার ৩৪% সরবরাহ করতে পারে।

সেলেনিয়াম: গরুর মাংস কিংবা যেকোন ধরনের লাল মাংসেই থাকে সেলেনিয়াম যা প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন । বিজ্ঞানীরা গবেষনা করে দেখেছেন, সেলেনিয়ামের ঘাটতির জন্যই প্রজনন জনিত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। যেমন: ভ্রুনের বৃদ্ধিজনিত সমস্যা, গর্ভপাত কিংবা নিদির্ষ্ট সময়ের পূর্বেই প্রসব। তাই এ সকল সমস্যা এড়ানোর জন্য গর্ভবতী মহিলাদের উচিৎ পরিমিত গরুর মাংস বা লাল মাংস খাওয়া যা সেলেনিয়ামের অভাব পূরণ করতে পারবে।

এছাড়াও গরুর মাংসে প্রয়োজনীয় আরও অনেক খনিজ উপস্থিত থাকে যা আমাদের মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় এবং সার্বিক উতকর্ষ সাধন করতে সক্ষম। যেমন: ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, কপার, ম্যাঙ্গানিজ এবং ফ্লোরাইড প্রভৃতি।

ভিটামিন এবং গরুর মাংস:

খনিজের চেয়েও বেশি ভিটামিন উপস্থিত থাকে গরুর মাংসে। তেমনই কিছু ভিটামিনের উপস্থিতি এখানে উল্লেখ করা হলো। যেমন -

ভিটামিন বি১ (থায়ামিন): গরুর মাংস ভিটামিন বি১ এর একটি উৎস । এটি স্নায়ুতন্ত্র, বিশেষ করে মানসিক চাপ কম করতে সাহায্য করে বলে একে "অ্যান্টি স্ট্রেস" ভিটামিন বলা হয়।
ভিটামিন বি২ (রাইবোফ্লাবিন): গরুর মাংসে উপস্থিত এই উপাদানটি আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ভিটামিন বি৩ (নায়াসিন): নিয়াসিন সাধারণত যেকোন খাবারকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে। তাছাড়া ত্বকের জন্যেও গুরুত্বপূর্ন এই ভিটামিনটি।

ভিটামিন বি৫ (পেন্টোথেনিক এসিড): এটি বিপাকেও সাহায্য করে থাকে এবং শক্তি যোগায়। ভিটামিন বি৬ (পাইরিডক্সিন): হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে সাহায্য করে এই ভিটামিন। এছাড়া হরমোনের স্বাভাবিক কার্যকলাপ বজায় রেখে প্রজনন তথা গর্ভধারনে সাহায্য করে থাকে ।

ভিটামিন বি৯ (ফোলেট): এটি ডিএনএ গঠন, মেরামত বা কোষ বিভাজন করতে সাহায্য করে। ভিটামিন বি ১২ (কোবালামিন): গরুর মাংসে বি১২ রয়েছে যা ক্লান্তিবোধ, বিষণ্ণতা, দুর্বল স্মৃতিশক্তি সহ নানা সমস্যার সমাধান করে ।

এছাড়াও গরুর মাংসে কোলিন, অল্প পরিমান ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে এবং বেটাইন থাকে যা শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ।

এমাইনো এসিড ও এন্টিঅক্সিডেন্ট:

গরুর মাংসে প্রয়োজনীয় এমাইনো এসিড ও এন্টিঅক্সিডেন্টও উপস্থিত রয়েছে। যেমন:

গ্লুটাথিয়ন: এটি ‘মাস্টার অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট’ নামে পরিচিত। গরুর মাংসে প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়। এটি আমাদের দেহে দীর্ঘায়ু দান করতে সাহায্য করার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে।

কার্নোসিন (এমাইনো এসিড): গ্লাইকেশন নামক একটি প্রক্রিয়া বার্ধক্যের সঙ্গে জড়িত এবং আমাদের দেহের ক্ষতি করে। কার্নোসিন ‘গ্লাইকেশন’ এর ক্ষয়কে হ্রাসকরে।

ক্রিয়েটাইন: ক্রিয়েটাইন পেশীর আকার বৃদ্ধি এবং বিকাশে সহায়তা করে, পেশী গুলোতে শক্তি সরবরাহ করে এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে। একজন সুস্হ ব্যক্তির যকৃত প্রতিদিন প্রায় ২গ্রাম ক্রিয়েটাইন তৈরি করতে পারে। গরুর মাংসে উপস্থিত ক্রিয়েটাইন দুটি ভূমিকা পালন করে। একদিকে যেমন দেহকে উন্নত করে, অন্যদিকে তেমনই দেহকে ক্রিয়েটিনিন তৈরি করতে সহায়তাও করে।

কনজুগেটেড লিনোলিক এডিস (ট্রান্স ফ্যাট): কনজুগেটেড লিনোলিক অ্যাসিড মাংস কিংবা দুগ্ধ জাতীয় পণ্য গুলিতে পাওয়া যায় যা খুবই স্বাস্থ্যকর। এটি ওজন হ্রাস সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সুবিধা দান করে।

তবে হ্যা, কোনো জিনিসই অতিরিক্ত ভালো নয়। গরুর মাংস খাওয়ার প্রভূত উপকারের পাশাপাশি যে অপকারগুলো আমরা শুনতে পাই, সেগুলো মাথায় রেখে আমাদের উচিত পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গরুর মাংস খাওয়া৷ বিশেষ করে যারা প্রেশারের রোগী এবং হার্টের রোগী, তাদেরকে গরু মাংস খাওয়ার ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। কেননা দিনশেষে স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। তাই আপনার স্বাস্থ্যের সুস্থতার দিকে বিশেষ মনযোগ দিন৷ সমাজকে সচেতন করতে ভূমিকা রাখুন।

লেখক: শিক্ষার্থী, এগ্রিকালচার, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।