Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, রবিবার ২৬ মে ২০১৯, ৫:১৩ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

খুলনায় শুরু হয়নি বোরো সংগ্রহ


১৫ মে ২০১৯ বুধবার, ০১:১৯  পিএম

শেখ হেদায়েতুল্লাহ, খুলনা

বহুমাত্রিক.কম


খুলনায় শুরু হয়নি বোরো সংগ্রহ

খুলনা : বোরো ধান কাটার মৌসুমা প্রয় শেষ। ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। এক মণ ধান উৎপাদনে প্রায় ৭শ’ টাকা খরচ হলেও এলাকা ভেদে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে।

ধান মজুদ রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই কৃষকের। অনেক কৃষক জমি লিজের, সেচের, সার ও কীটনাশকের টাকা যোগান দিতে পারছে না। ধার দেনা করে মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে ধান চাষ করেছিল। এই সুদের টাকাও দিতে হবে। তাই কৃষক উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

এই মৌসুমে সরকারীভাবে সারা দেশে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টন। অথচ ৬৪ টি জেলার মধ্যে শুধুমাত্র খুলনাতেই ধান উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন। কিন্তু খুলনায় মাত্র ১ হাজার ৯১৩ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অপরদিকে চাল সংগ্রহ করা হবে মিলারদের কাছ থেকে ১৬ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন। কিন্তু এখনও সরকারের পক্ষ থেকে ধান- চাল সংগ্রহ শুরু হয়নি। সরকার যখন ন্যায্য মূল্যে ধান ক্রয় বাড়িয়ে দিবে তখন কৃষকের হাতে ধান থাকবে না। মহাজনদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে হবে। আর সরকারের দেয়া কৃষকের সুবিধা ভোগ করবে মহাজন। বোরো আবাদের টার্গেট ছিল ৫৬ হাজার ৬১৭ হেক্টর ( ১ হেক্টর= ২.৪৭ একর) অর্জন হয়েছে ৫৯ হাজার ৫৩০ হেক্টও জমি।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ি, কেজি প্রতি ২৬ টাকা দরে ধান কিনলে কৃষক প্রতি মন ধানে পাবে ১ হাজার ৪০ টাকা। অথচ কৃষক বর্তমানে ১ মণ ধান বিক্রি করে পাচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০টাকা। অথচ প্রতি মণ ধান উৎপাদনে প্রতি কৃষকের উৎপাদন খরচ ৭শ’ টাকার উপরে। হিসেবে মতে, ধান বিক্রি করে লাভ তো দুরের কথা উৎপাদন খরচই উঠাতে পারছেনা কৃষক।

বোরো মৌসুমে ধান কাটতে প্রতিবছরের মতো এবারও সারাদেশে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। দেশের কোনো কোনো স্থানে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১ হাজার টাকায় উঠেছে। তবে অধিকাংশ স্থানেই কৃষকের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ দেড় কাঠা (পৌনে ৭ শতাংশ) জমির ধান কাটতে পারেন। সমপরিমাণ জমি থেকে ধানের উৎপাদন গড়ে তিন মণ।

বাজার দরে বর্তমানে তিন মণ ধানের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন মূল্যের অর্ধেক চলে যাচ্ছে দিনমজুর দিয়ে ধান কাটানোর পেছনে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ধান কাটা ছাড়াও আরও রয়েছে বীজতলা তৈরি, জমি তৈরি (চাষ), সেচ, রোপন, কীটনাশক প্রয়োগ ও নিড়ানোর কাজ। সব মিলিয়ে ধান উৎপাদনে খরচ উঠছে না কৃষকের। বরং কাঠা প্রতি কৃষকের ক্ষতি ৬৫০ টাকা কিংবা তারও বেশি।

ডুমুরিয়া উপজেলার কোমলপুর গ্রামের সাহাবুদ্দিন হোসেন সরদার এ বিষয়ে বলেন ‘ধানের ফলন ভালোই হয়েছে। তবে এতে আমাদের কোনো লাভ নেই।’ কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘ধানের দাম খুবই কম। মাত্র ৫৫০ টাকা মনে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। তাতে কাঠাপ্রতি ( পৌনে ৭ শতাংশ) লোকসান হচ্ছে ৬২৫ টাকা।’ ধান চাষের প্রথম থেকে চূড়ান্ত ধাপের খরচের ব্যাখ্যা দিয়ে এই কৃষক জানান, পৌনে ৭ শতাংশের এক কাঠা জমিতে ধান চাষে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৬২৫ টাকা (ধান কাটায় ৫০০ টাকা, সেচে ৩৫০ টাকা, সার ও কীটনাশকে ৩৫০ টাকা, বীজে ১২৫ টাকা, রোপনে ২০০ টাকা ও আগাছা পরিষ্কারে ১০০ টাকা)। অথচ উৎপাদিত ধানের দাম ১ হাজার টাকা। ফলে কাঠাপ্রতি কৃষকের ক্ষতি ৬২৫ টাকা। অঞ্চলটিতে বর্তমানে কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৭৫০ টাকা বলেও জানান সাহাবুদ্দিন হোসেন সরদার।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পঙ্কজ কান্তি মজুমদার বলেন, আমরা চাই ধানের উৎপাদন বাড়ুক। একইসঙ্গে উৎপাদন খরচ কম হোক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শ্রমিক খরচই সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন ধান পেকে গেলে তখন কৃষকের আর কোনো উপায় থাকে না। মজুর দিয়ে ধান কেটে আনতে হয়। ফলে মোট হিসাবে লোকসান হয়।
করণীয় বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ উজ্জামান বলেন প্রতিবছরই কৃষক ধানের দাম পাচ্ছে না। শুধু ধান নয়, অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এ পরিস্থিতিতে ধান কেনার ক্ষেত্রে সরকারকে আরও বেশি নজরদারি করতে হবে। মিল মালিকদের কাছ থেকে না কিনে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে। আর ধান মজুত রাখার জন্য জেলা-উপজেলাগুলোয় শস্য গুদাম করা যেতে পারে, পরবর্তী সময়ে কৃষকরা যেন সঠিক দামে ওই ধান বিক্রি করতে পারেন।
খুলনা জেলা খাদ্য বিষয়ক কমিটির সদস্য সচিব ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো: তানভীর রহমান বোরো সংগ্রহ বিষয়ে বলেন, গত ৪ মে কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় জেলা থেকে ১৬ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন চাল ও ১ হাজার ৯১৩ টন ধান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ধান সংগ্রহ করা হবে উপজেলা এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে। অপরদিকে চাল সংগ্রহ করা হবে মিল মালিকদের কাছ থেকে। সময়মত ধান- চাল সংগ্রহ না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত আসার পরই এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। তিনি বলেন, কৃষকেরা অভাবী তারা ধান উৎপাদন করতে গিয়ে মহাজন বা এনজিও’ র দারস্ত হয়। তাদেও দেনা পরিশোধ করতেই আগাম ধান কম মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হন। তিনি বরৈন খুলনা মহানগরীর মিলগুলো থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা খাদ্য কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চাল ও ধান সংগ্রহ করা হবে। তিনি বলেন ধান সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে কৃষি অফিসের তালিকা অনুযায়ী কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হবে।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।