Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৩ ফাল্গুন ১৪২৫, শনিবার ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

খানজাহান আলী বিমান বন্দর: এলাকাবাসীর মধ্যে হাহাকার


২৫ ডিসেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার, ১২:৩১  পিএম

শেখ হেদায়েতুল্লাহ, খুলনা

বহুমাত্রিক.কম


খানজাহান আলী বিমান বন্দর: এলাকাবাসীর মধ্যে হাহাকার

খুলনা : বসতবাড়ির জমিটুকু ছাড়া আর কোন জমি নেই। জমিটুকু বিমানবন্দরের জন্য সরকার নিয়ে নিয়েছে। টাকা যা পেয়েছি তাতে নতুন করে জমি কিনতে পারছি না। নতুন জমির অনেক দাম। আবার বসত বাড়ি করার মত জমি কিনতেও পাওয়া যায় না।

দীর্ঘকাল যাবত একসঙ্গে প্রতিবেশিদের সাথে মিলেমিশে বসবাস করছি। নতুন বাড়ি-ঘর তৈরী করে যেখানে যাব সেখানকার সবাই অপরিচিত। স্বজনদের ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে নতুন করে সবকিছু শুরু করতে হবে। নতুন শুরুর জন্যে প্রয়োজন অনেক। কিন্তু সরকার আমাদের প্রয়োজনের দিক দেখছে না। আমাদের বসবাসের সুযোগ যদি না হয় তবে আমরা এই টাকা দিয়ে কি করবো? অভাবের সংসারে নগদ টাকা কয়েকদিনের মধ্যে খরচ হয়ে যাবে, তারপরতো একেবারে পথে দাঁড়াতে হবে। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার হোগলডাঙ্গা গ্রামের মামুন মলঙ্গীর স্ত্রী মারিয়া বেগম (৩০) কথাগুলো বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

শুধুমাত্র মারিয়া বেগম নন, হোগলডাঙ্গা গ্রামের প্রায় সকল পরিবারের সদস্যদেরই কণ্ঠে এমন হাহাকার। খান জাহান আলী বিমানবন্দরের জন্যে নতুনভাবে জমি অধিগ্রহণের জন্যে এই গ্রামের প্রায় সকল জমিই চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকা নেওয়ার জন্যে অফিস আদেশ হয়েছে। জমি, অবকাঠামো ও অন্যান্য ফসলের জন্যে ক্ষতিপূরণ ধরা হয়েছে। বিপত্তি হয়েছে ক্ষতিপূরণের অর্থ সকলের একরকম হয়নি। কারও কারও অভিযোগ ভূমি অফিসের কর্তারা সুবিধা নিয়ে কাউকে কাউকে অনেক ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দিয়েছে; আর যারা তাদেরকে সন্তুষ্ট করেনি, তাদের জন্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ খুবই কম নির্ধারিত হয়েছে।

মারিয়া বেগম জানান, ১০ বছর আগে অনেক টাকা খরচ করে পাকা ইটের দেয়াল দিয়ে ও টিনের ছাউনির একটি ঘর তৈরি করে বসবাস করছিলাম। অথচ ঘর বাবদ কোন টাকা সরকার দিচ্ছে না। জমি ছেড়ে দিতে বলেছে। জমি বাবদ টাকা দেয়া হচ্ছে, তাহলে ঘর করার টাকা কোথায় পাবো?

হোগলডাঙ্গা বিলে আমন ধান কাটছিলেন মো: বাকীবিল্লাহ মল্লিক (৪৫)। তার জমিও সরকার বিমান বন্দরের জন্য নেবে বলে ৭ ধারা (উচ্ছেদ-এর নোটিশ) জারি করেছে। অফিসে ঘুষ না দেওয়ায় তার জমির কাগজপত্র সঠিক নেই বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। পরে ভূমি অফিসে নির্দিষ্ট হারে টাকা দিলেই তার সকল কাগজপত্র সঠিক বলা হয়।
পাশেই ছিলেন মো: রফিকুল ইসলাম (৬০)। তিনি বলেন, তাদের শরিকদের মোট ১৪ বিঘা জমি বিমানবন্দরের জন্য নেয়া হচ্ছে। ওই জমির আরএস পর্চা, সিএস পর্চাসহ অন্যান্য কাগজপত্র ঠিক করতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ভূমি অফিসে ৪০ টাকার খাজনার দাখিলা নিতে দিতে হয়েছে ১ হাজার টাকা। ১০০ টাকার দাখিলায় দিতে হয়েছে চার হাজার টাকা। শুধু তাই নয় ক্ষতিপূরণের চেক নিতে গিয়েও টাকা দিতে হয়েছে।

একই গ্রামের মনসুর মল্লিক জানান, তিনি ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫ লাখ টাকা পেয়েছেন। এরজন্যে অফিসে দিতে হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। মাহমুদ মৌলঙ্গীকে ক্ষতিপূরণের ২৪ হাজার টাকা নিতে দিতে হয়েছে ৫ হাজার টাকা। মাহমুদ মৌলঙ্গী বসতঘরের ক্ষতিপূরণ পাননি, পেয়েছেন মুরগীর ঘর বাবদ ২৪ হাজার টাকা।

বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী, বিমান বন্দর নির্মাণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ৬২৮ টাকা। ইতোমধ্যে অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের ৪০০টি চেকের মাধ্যমে জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩৬ কোটি ৭৬ লাখ ৪ হাজার ৩৬৩ টাকা, অবকাঠামো ও গাছপালার ক্ষতিপূরণ বাবদ ২১ কোটি ২১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৭৬ টাকা প্রদান করা হয়েছে। এখনও অনেকেই ক্ষতিপূরণের টাকা গ্রহণ করেনি। কারণ, তাঁদের অভিযোগ তাঁদেরকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে না।

বাগেরহাট জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা বলেন, অনেকেই ক্ষতিপূরণের অর্থ নেননি। আমরা তাদের কথা শুনছি, তাদের অভিযোগ গ্রহণ করছি। সাতশতাধিক অভিযোগ পেয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার ফয়লায় তৈরি হচ্ছে খানজাহান আলী বিমানবন্দর। মূল প্রকল্পটি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৫ সালের মে মাসে একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ প্রকল্পটি পিপিপির আওতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে গ্রহণের জন্য নীতিগত অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

বর্তমানে শুধু ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় বাবদ ধরা হচ্ছে ২১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল।

বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের দপ্তরের এলএ বিভাগের সূত্রে জানা যায় ’খানজাহান আলী নির্মাণ’ প্রকল্পটির প্রথম প্রস্তাব দাখিল হয় ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। পরে চুড়ান্ত প্রস্তাব দেয়া হয় ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর। ওই প্রস্তাবে ৯টি মৌজায় ৫৩৬ একর জমির কথা উল্লেখ করা হয়। ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর প্রাথমিক অবস্থায় আনুসঙ্গিক ব্যযের জন্য সরকার বরাদ্দ দেয় ৪৩ কোটি টাকা। সম্বাব্যতা যাচাই শুরু হয় ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি। এরপর জেলা প্রশাসক জমি অধিগ্রহণের জন্য এল এ কেস নং ০৫/২০১৬-১৭- এ ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ৩ ধারার নোটিশ জারি করে।

এরপর বিমান বন্দরের জমি অধিগ্রহণের সম্ভাব্য এলাকায় নতুন কোন স্থাপনা নির্মাণের উপরেও নিষেধাঙ্গা দিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি ও এলাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিংও করা হয়। এরপর ২০১৭ সালের ৩ মে জেলা ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভায় ৫২৯.গ৪ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য সিদ্বান্ত নেয়া হয়। পরে ২০১৭ সালের ৭ আগষ্ট জমি অধিগ্রহণের চুড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। একই বছরের ২৬ অক্টোবর ভূমি মন্ত্রণালয় জমি অধিগ্রহণের জন্য অনুমোদন দেয়। চলতি বছর ১১ জানুয়ারি ৬ ধারা জারি করে জেলা প্রশাসন। জমি অধিগ্রহণের মূল্য বাবদ সরকার ১৬৯ কোটি ২৫ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৭ টাকা বরাদ্দ ডাওয়ার পর চলতি বছরের ২৭ জুন ৭ ধারা নোটিশ জারি করে। ১৮ আগষ্ট জেলা প্রশাসন ওই জমি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করে।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম মেয়াদে বাগেরহাট জেলায় একটি ‘শর্ট টেকঅফ এন্ড ল্যান্ডিং এয়ারপোর্ট’ হিসেবে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ জন্য ফয়লা এলাকায় ৯৭ দশমিক ৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ওই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালের ৫ মার্চ খুলনা সফরে গিয়ে খানজাহান আলী বিমানবন্দরটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দরে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ফলে আবারো নড়েচড়ে বসে বেবিচক ( বে-সামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। ২০১৫ সালের ৫ মে একনেক বৈঠকে পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর হিসেবে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। এ জন্য নতুন করে ৪০৩ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৫৪৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ওই বছরের ১ জুলাই থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে এরই মধ্যে আলোচনায় আসে বিমানবন্দরের রানওয়েকে ভবিষ্যতের জন্য আরো উপযুক্ত করার বিষয়টি। অন্তত ১০ হাজার ফুট রানওয়ে নির্মাণের জন্য আরো ১৩৩ একর জমি বাড়িয়ে মোট ৫৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়া হয়।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।