Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৯ ভাদ্র ১৪২৬, রবিবার ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

কোথায় যাবে অন্তঃসত্ত্বা নুপুর?


৩১ জুলাই ২০১৯ বুধবার, ১১:৪০  পিএম

সৈয়দ মোকছেদুল আলম

বহুমাত্রিক.কম


কোথায় যাবে অন্তঃসত্ত্বা নুপুর?

কোথায় যাবে আশ্রয়হীন অন্তঃসত্ত্বা নুপুর? কিভাবে বাঁচবে সে আর গর্ভের অনাগত শিশু? দুইটি কিডনি-ই নষ্ট হয়ে যাওয়া রিকশা ভ্যান চালক বাবা এ ভার বইতে পারবেন না। অসহায় মা গাজীপুরের শ্রীপুরে বাবার সাথে ছোট্ট ঘরে থাকেন। দুই বোনের মধ্যে বড় মিলি। বিয়ের পর থেকে সেও স্বামীর কর্মস্থলের কাছে বাংলাবাজার এলাকায় থাকে। নুপুরের বিয়ে হয়েছিল কালিয়াকৈর উপজেলার ঢালজোড়ায় হাফিজুদ্দিনের বড় ছেলে আসাদুলের সাথে। আসাদুল নিজের পছন্দে নুপুরকে বিয়ে করেছিল। নুপুরের শ্বশুর তা সহজভাবে মেনে নেননি। বিয়ের বছরটা ঘুরতে না ঘুরতেই জোর করে খোলা তালাকনামায় স্বাক্ষর নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয় শ্বশুর আর তার সাথে থাকা অন্যান্যরা।

গত ৮ মে বিশ্ব নারী দিবস পালিত হয়। এর দুইদিন পরই নুপুর আমাদের পত্রিকা অফিসে আসে। সেদিনই ওকে প্রথম দেখি। চুপচাপ, নিরীহ সাদাসিধে এক বাঙালি মেয়ে। বড় অসহায় আর নিরূপায় চেহারাটা মায়াভরা। মাত্র ২২ বছরের আদুরে এই তরুণীটি আর বেঁচে থাকতে চায় না। পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থায় তাকে জবরদস্তি করে তালাক দেয়া হয়েছে। আশ্রয়হীন করা হয়েছে। কোথায় থাকে, কিভাবে বাঁচে কেউ খবর রাখে না। উপায়হীন নুপুর গামের্ন্টের কাজে ঢুকে। হোতাপাড়ার মেম্বারবাড়ি এলাকায় ভাড়া ঘরে থাকতো। সেখানে এসে আসাদুল এসিড মেরে মুখ ঝলসে দিবে বা জীবনে মেরে ফেলবে বলে ভয় দেখিয়ে নুপুরের উপর অমানসিক যৌন নিপীড়ন চালাতো।

সেরকমই এবারও তিনদিন একটি ঘরে আটকে রেখে আসাদুল অমানবিক অত্যাচার-নির্যাতন চালায়। পরে ছেড়ে দিলে নুপুর র‌্যাব অফিসে অভিযোগ দিতে যায়। সেখান থেকে থানায় অভিযোগ দিয়ে একটি কপি নিয়ে তাদের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়া হয়। জয়দেবপুর থানায় গেলেও অভিযোগ নেওয়াতে ব্যর্থ হয় নুপুর। তখন এলো চান্দনা-চৌরাস্তায় দৈনিক গণমুখ পত্রিকা অফিসে। লেখাপড়া না জানা নুপুরের একটা কথা মনে খু-উ-ব করে দাগ কেটে দিল। ওর মানবেতর জীবন কাহিনি বলার সময় কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিল। শেষে হতভম্ব করে দিয়ে বলেছিল, স্যার! শরীরটাই সব? আমি কী মানুষ না, আমার কি মন নাই?

ওকে বাঁচার জন্য সাহস দিয়েছিলাম। সহযোগিতার আশ^াস দিয়েছিলাম। বুঝিয়েছিলাম আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়। আর আইনের চোখেও আত্মহত্যা করা অপরাধ। আমি তা করার খবর ছাপাতে মোটেও আগ্রহী নই। বরং আইনের পথে অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় পাশে থাকার আশ^াস দিলাম। এক পর্যায়ে বললাম, আমার কোন মেয়ে সন্তান নেই, তুমিই আমার মেয়ে।

নুপুর নতুন করে বাাঁচার স্বপ্ন দেখতে লাগলো। নানা হয়রানির মধ্যেও পুলিশ সুপারের সদিচ্ছার কারণে আসাদুলের বিরুদ্ধে নুপুরের মামলাটি রুজু হলো। আসামি গ্রেপ্তারও হলো। প্রায় তিন মাস ধরে আসাদুল কারাগারে আছে।

এদিকে জয়দেবপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের হওয়া মামলাটির প্রয়োজনে নুপুর তালাকনামার নকল আনতে কালিয়াকৈরে কাজী অফিসে যায়। পথে স্বামী আসাদুলের সহোদরের নেতৃত্বে বেধড়ক পিটিয়ে নুপুরকে রক্তাক্ত জখম করা হয়। এ ঘটনায় আরেকটি মামলা হয় কালিয়াকৈর থানায়।

নুপুর বুকভরা আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে তার স্বপ্ন পূরণ হবার পথের দিকে। কিন্তু শ^শুরবাড়ির কেউ আসে না তাকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে। গর্ভে সন্তান থাকা অবস্থায় তালাক বৈধ হয় না জেনেও শ^শুর বাড়ির লোকেরা তাকে জোর করে সই নিয়ে তাড়িয়ে দিল। এ সময়টায় স্বামী আসাদুলও তো বাড়িতে ছিল না।

ঢালজোড়ার সাবেক ই্উপি চেয়ারম্যান কলিম উদ্দিন জানাচ্ছিলেন, নুপুরের শ^শুর হাফিজ উদ্দিন তাঁর ভাগিনা। তাদের উভয়ের বাড়ি খুব কাছাকাছি। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে নুপুর তাকে জোর করে তালাক দিতে অনেক না করেছে। সে যে অন্তঃসত্ত্বা সেটাও বলেছে। কিন্তু কথাটা কেউ কানে নেয় নাই। এখন তো নুপুরের কথাই ঠিক হলো। জোর করে তালাকের জেরে মামলা মোকদ্দমার সৃষ্টি হলো।

আমিই শেষে নুপুরকে নিয়ে দুইদিন ওর শ্বশুরবাড়ি গেলাম একটা সুরাহার আশায়। নুপুর আর এখানে সেখানে থাকতে রাজি নয়। তা বেশিদিন সম্ভবও নয়্। এখন ও ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ও শ্বশুরবাড়ি থাকতে চায়। একটা ছোট্ট সংসার পেতে সুখের জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখে। কিন্তÍ দুইদিনই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা নুপুরকে বাড়িতে থাকতে দিতে কোনভাবেই রাজি হলো না। তবে দ্বিতীয় দিন কথা হলো, দু একদিনের মধ্যে একটা সমাধান করবে। এই বলে বিদায় দিলেও তা কথার কথা হয়েই থাকলো।

শেষে গত মঙ্গলবার নুপুর একাই শ্বশুরববাড়ি গিয়ে উঠে বিকেলের দিকে। কিন্তু রাত দুপুরে পুলিশ নিয়ে গিয়ে নুপুরকে ফের রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হয়। পুলিশ কেন এ ভুমিকা নিল জানিনা। আমি সহযোগিতার জন্য ৯৯৯ - এ ফোন করেিেছলাম। এ ঘটনায় এটি ছিল দ্বিতীয়বার ফোন করা। না তেমন কার্যকর সেবা মিললো না। নুপুরকে মাঝ রাতে থানায় এনে বললো, এবার নিজ বাড়ি চলে যাও। কোথায় নিজ বাড়ি? এতো রাতে সে কোথায় যাবে? শেষে জোর করেই সারা দিনরাত না খাওয়া মেয়েটি থানার বারান্দায় বসে কাটালো বুধবার দুপুর পর্যন্ত। এরপর নুপুরের জেদের কারণে গাজীপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এনে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ভাগ্য খারাপ। পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার অফিসে নেই। তিনি খু-উ-ব ভাল এবং কাজের লোক বলে সুনাম শুনেছে নুপুর। তাই সে তাঁকে বলতে চায় সব কিছু।

জানি না বাংলাদেশে এ রকম সমস্যার সমাধান কী হতে পারে? পারিবারিক নির্যাতন আইনে মামলা হতে পারে নিশচ্য়-ই। কিন্তু তাতে কি নুপুরের একটা নিরাপদ আশ্রয় মিলবে! তাতে কি ওর অন্গাত শিশুটির কোন সুন্দর ভবিষ্যত পাওয়া যাবে?

এভাবেই সমাজে নানা অস্থিরতা আর আদালতে মামলা জট তৈরি হয়। চেয়েছিলাম অন্ততঃ এ ঘটনাটার সুষ্ঠু একটা সমাধান হোক। আত্মহত্যার মত কোন আত্মঘাতি কান্ড না ঘটুক। প্রত্যেকেই যদি নিজের দায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করি তাহলে এরকম সমস্যা কমে আসবে। কিন্তু মূল্যবোধ ও ন্যয়-নীতির বড় অভাব সর্বত্র। বেশির ভাগই ভাল কাজে সময় ব্যয় করতে রাজি না। ধান্দায় ব্যস্ত। দুই একজন আমার মত এগিয়ে গেলে ওরা বলে, কিছু একটা ধান্দা আছে নিশ্চয়-ই!

তাই বলে তো হাত-পা গুটিয়ে নেয়া যাবে না। কম সংখ্যক হলেও ভাল লোকদের ভাল থাকার, ভাল করার কাজটা চালিয়ে যেতে হবে। আমরা তো আর সব রসাতলে যাকÑ তা চাই না। নিশ্চয়ই এমন লোকরা আছেন। আর তাদের জন্যই নুপুররা শেষ পর্যন্ত হয তো বাঁচার পথ খুঁজে পায়।

লেখক: সাহিত্যিক, কবি ও সহ-সভাপতি, গাজীপুর প্রেস ক্লাব

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।