Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৩১ বৈশাখ ১৪২৮, শুক্রবার ১৪ মে ২০২১, ১২:৪৮ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

করোনাকালে নিরাপদে হাওরের বোরো সংগ্রহ


০৯ এপ্রিল ২০২১ শুক্রবার, ০৬:৫৫  পিএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


করোনাকালে নিরাপদে হাওরের বোরো সংগ্রহ

বর্তমানে বাংলাদেশে সারাবছরে যে পরিমাণ ধান উৎপাদিত হয় তার একটি বিরাট অংশ অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক আসে বোরো মৌসুম থেকে। সেই বোরো মৌসুমের মোট উৎপাদিত ধানের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় হাওরাঞ্চল থেকে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানটি নিন্মরূপ। সারাবছর সারাদেশে মোট ধান উৎপাদিত হয় প্রায় তিন কোটি আশি লক্ষ মেট্রিক টন। তারমধ্যে শুধু বোরো মৌসুমেই উৎপাদিত হয় এক কোটি নব্বই লক্ষ থেকে প্রায় দুই কোটি মেট্রিক টন। আর কেবল হাওরাঞ্চলেই উৎপাদিত হয় প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৭টি জেলার ৪৭টি উপজেলায় এ বোরো ধানের আবাদ হয়ে থাকে। কাজেই এ অঞ্চলটিকে বোরো ধানের জন্য শস্যভা-ার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সেজন্য দেশের মোট বোরো ফসলের এক পঞ্চমাংশ ফসল নিরাপদে ঘরে উত্তোলন করার উপর সারাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কযুক্ত।

হাওরাঞ্চলের বোরোধান নিরাপদে সংগ্রহের জন্য একটি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়ে থাকে, কারণ সেখানকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টিকে মাথায় রেখে। আমরা জানি প্রতিবছর অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হানা দিয়ে এসব বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে প্রকৃতি। এবছরও (২০২১) এপ্রিল মাসের শুরুর দিকেই বড় একটি ঝড়ো হাওয়া হাওরসহ সারাদেশের অনেকস্থানে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। বিগত কয়েকবছর আগেও এ মৌসুমে পাহাড়ি ঢল আর আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ফসলেই শুধু নয় সেখানকার মাছ গাছ থেকে শুরু করে পশু পাখি পর্যন্ত বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেটি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি সেসব এলাকার স্বল্প আয়ের মানুষজন। আর সেটি যে শুধু ঐ এলাকার কৃষকেরই ক্ষতির কারণ হয় তা নয়। সেটি জাতীয় ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। কাজেই প্রতিবছরই সেখানকার বোরোফসল উত্তোলনের জন্য এলাকার কৃষককুল তো বটেই সরকারও এ বিষয়ে সংবেদনশীল থাকে সবসময়।

গতবছর (২০২০) পূর্বের আশঙ্কার সাথে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছিল করোনা ভাইরাসের মহামারি। কোভিড-১৯ কারণে বিশ^ এখন কার্যত এখনও বিচ্ছিন্ন। কোন দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ তো নয়ই, আন্তর্জাতিক সকল প্রকার যোগাযোগ সীমিত পরিসওে চালু রয়েছে। অপরদিকে বিশে^র সকল দেশ এখন ফসল উৎপাদিন কার্যক্রম চালাতে পারছেনা। কোন একটি দেশে অতিরিক্ত খাদ্য মজুত খাকলেও তা বিশে^র অন্যান্য যেসব দেশে খাদ্যপণ্য মজুদ নেই সেগুলো যোগাযোগের অভাবে অন্যত্র পৌঁছাতে সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। সেকারণে অনেক এলাকায় দেখা দিচ্ছে খাদ্যাভাব। যেহেতু বিশ্বে করোনা পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, এমন পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোতে আরো কঠিন থেকে কঠিনতম অবস্থা হবে দিনকে দিন। সেজন্য কোন অবস্থাতেই আমাদের ইতিমধ্যে বোরো মৌসুমে ধানের যে বাম্পার ফলন হতে দেখা যাচ্ছে সেগুলো নষ্ট হতে দেওয়া যাবেনা। তাই হাওরের বোরো ধানের প্রতি সবারই একটি নজর রয়েছে।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সমতল ভূমির তুলনায় হাওরে একটু আগে এবং আগাম জাতের উচ্চ ফলনশীল বোরো ধানের জাত রোপন করা হয়। সেজন্য সারাদেশের তুলনায় সেখানকার বোরা ধান একটু আগেভাগেই কর্তন ও মাড়াই করা যায়। তাই প্রতিবছরের ন্যায় এবারেও সেখানকার ধান কাটার জন্য এখন উপযুক্ত মৌসুম চলছে। কোন কোন জমির ধান এখনই কাটার উপযুক্ত, আবার কোন কোন জমির ধান আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কর্তন উপযোগী হয়ে উঠবে। তাছাড়া আগাম পাহাড়ি ঢলের বন্যার আশঙ্কায় ক্ষেতের পুরো ধান পাকার আশায় বসে না থেকে ৮০% ভাগ ধান পাকলেই তা কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ।

কিন্তু এ করোনা আক্রান্ত সময়ে পূর্বের ন্যায় ধান কাটার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে যা নিয়ে শুধু ঐ এলাকার কৃষকই নয় সরকারও চিন্তিত হয়ে পড়েছে। সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রধান দুটি সমস্যা হলো- (১) হাওরাঞ্চলের ধান যেহেতু অন্য সমতল ভূমির তুলনায় একটু আগেই কর্তন করা হয় সেজন্য স্বাভাবিক সময়ে অন্যান্য এলাকা থেকে এখানে ধানকাটার জন্য কৃষি শ্রমিক প্রয়োজন। কিন্তু করোনায় কারণে সেসব কৃষি শ্রমিকের অনেকেই আসার সাহস পাচ্ছে না। অপরদিকে গণ পরিবহন চলাচল সীমিত থাকায় দূর-দূরান্তের কৃষি শ্রমিকের যাতায়াত অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে। (২) অন্য সময় অন্য সমতল এলাকা থেকে ধানকাটার যন্ত্র যাতায়াত করার সুযোগ পেতো যা এবার সেসব এলাকা থেকে ধান ফসল কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য কৃষি যন্ত্রপাতি স্থানান্তর করা সম্ভবপর হচ্ছে না। কিন্তু সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সরকারি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ধান কাটা ও মাড়াই যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষকদের সাহায্যে এগিয়ে আসছে।

সময়মতো বোরোধান সংগ্রহের জন্য আরো একটি বিশেষ পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। করোনার জন্য বোরোধান সংগ্রহে শ্রমিকের সমস্যাা হলে গতবছরের ন্যায় সরকারের বিভিন্ন সেবা সংস্থার পাশাপাশি সরকার দলীয় আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ, যুবকলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগসহ স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে এবারো। বতমানে করোনার কারণে শহরে কাজ করা অনেক মানুষ গ্রামে গ্রামে অবস্থান করছেন। তাদের এখন তেমন কোন কাজ নেই। এমন সময়ে তাদেরকে জাতির প্রয়োজনে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন যে গ্রামের কৃষি জমিতে কাজ করা অতটা ভয়ের কিছু নেই। কারণ সেখানে মুক্ত বাতাস ও রৌদ্রজ্জ্বল পরিবেশ। এমন পরিবেশে করোনার প্রাদুর্ভাব ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেকটাই কম। সেজন্য যেসব কৃষকের জমির ধান আগে পাকবে সে জমিতে সেসব মানুষদের নিয়ে দলীয়ভাবে ধান কেটে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। পরে সেই দলটি আরেকজন কৃষকের জমির ধান কেটে দিতে পারে। এলাকা ভিত্তিক এমন একটি টিম গঠন করে পুরো দুই সপ্তাহ সময়ের মধ্যে সারা হাওর এলাকার ধান কেটে ফেলা সম্ভব। এভাবে গতবছর সফলতা পাওয়া গিয়েছিল।

আমরা ছোট বেলায় আমাদের গ্রামে এমন কমিউনিটি ভিত্তিক ধান কাটতে দেখেছি। এলাকাভিত্তিক আমাদের এলাকায় মাংনী কামলা দেওয়া বলা হতো। সেটির বিশেষত্ব ছিল কোন টাকার বিনিময়ে নয়, স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কোন টাকা পরিশোধ না করে শুধু একবেলা ভাল খাওয়ার বিনিময়ে একাজটি সদলবলে উৎসবের আমেজে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সমমনা সবাই করে দিতেন। আমার মনে হয় তেমন একটি ব্যবস্থা গ্রহণের একটি কাজ আবার শুরু করার সময় এসে গেছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে এমন সামাজিক কার্যক্রম বাড়ানো দরকার। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, যারা এ কাজে সম্পৃক্ত হবেন, তারা অবশ্যই করোনা প্রতিরোধের সকল প্রকার স্বাস্থ্যবিধি মেনেই তা করতে হবে।

লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

email: [email protected]

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।