Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৪ আষাঢ় ১৪২৬, সোমবার ১৭ জুন ২০১৯, ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

এবার প্রথম ভোট দেবেন ঝালকাঠির বেদেরা


২৪ ডিসেম্বর ২০১৮ সোমবার, ০৫:৫৫  পিএম

মোঃ আমিনুল ইসলাম, ঝালকাঠি প্রতিনিধি

বহুমাত্রিক.কম


এবার প্রথম ভোট দেবেন ঝালকাঠির বেদেরা

ঝালকাঠি : বেদে বা বাংলাদেশি যাযাবর সম্প্রদায় ভুক্তরা সাপুড়ে নামে পরিচিত। পানিতে ভাসমান নৌকাতেই এদের জীবন কাটে। কোন কোন পরিবারে কেবল বেদেনীরাই সাপের খেলা দেখায়।

বেদে-বেদেনীরা কাঠের বাক্সে, চটের ব্যাগে, বাঁশের ঝুড়িতে ও মাটির পাত্রে নানা ধরনের সাপ রাখে এবং সাপ্তাহিক হাট-বাজারে খেলা দেখানোর জন্য সেগুলি নিয়ে যায়। বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সেই সাপই জীবনধারনের অবলম্বন।

তাদের উপার্জন, পরিবারের ভরণপোষণ সবই চলে সাপের খেলা দেখিয়ে। এই ভয়ঙ্কর-সুন্দর বিষধর প্রাণী যাদের হাতে খেলনা হয়ে ওঠে তাদের কাছে জীবনযাপন তো খুব সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু তেমনটা হয়নি। বরং জীবন যাপন খুব কঠিন হয়ে উঠেছে তাদের কাছে। আধুনিক যুগে সাপের খেলা দেখিয়ে আর জীবন চলে না বেদে সম্প্রদায়ের। তাই তারা নৌকা ছেড়ে স্থলে বসতি স্থাপন করেছে।

ঝালকাঠি শহরের কৃষ্ণকাঠি এলাকার সুতালড়ি পুলিশ লাইনের পিছনে রয়েছে বেদে পল্লী। সেখানে ঘনবসতিতে ২ শতাধিক বাসিন্দা রয়েছে। এরমধ্যে ২০টি পরিবার নতুন বসতি স্থাপন করেছে। ২০টি পরিবারে নতুন ভোটার রয়েছেন ৪০ জন। নতুন ভোটারদের মধ্যে বয়সে তরুণ, মধ্যবয়সী ও প্রবীন নারী-পুরুষরা রয়েছেন।

অপরদিকে নলছিটি পৌর এলাকার ৪ নং ওয়ার্ডেও ২০ টি পরিবার নতুন বসতি স্থাপন করেছে। সেখানের ২০টি পরিবারে শতাধিক বাসিন্দা রয়েছে। শতাধিক বাসিন্দাদের মধ্যে এবছর নতুন ভোটার হয়েছেন ৬০ জন। এখানেও বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ নতুন ভোটার রয়েছে।

ঝালকাঠির সুতালড়ি পুলিশ লাইনের পিছনের বেদে পল্লীর সরদার মোঃ আঃ রহিম জানান, আমরা যারা সাপ খেলা দেখিয়ে নৌকায় করে জীবনযাপন করি তাদের স্থানের ঠিক নেই। তাই আমরা কখনওই ভোট দিতে পারি না। কৃষ্ণকাঠিতে বসতি স্থাপন করার পর ভোটার হয়েছি। তারপর ভোট দিতে শুরু করেছি। আমাদের মধ্যে আরো অনেক ভোটার আছে যারা এবছরই নতুন করে ভোট দিবেন। ২০ বছরের তরুনণ থেকে শুরু করে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধও এবার নতুন ভোটার হয়েছে। তারা জীবনের প্রথমবারে ভোট উৎসবে অংশ নিবে।

বেদেদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাপের ছোবলের মতই সভ্যতার ছোবল বড় নির্মম। বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ সাপের ছোবল সামলানোর কলাকৌশল রপ্ত করলেও সভ্যতার ছোবল থেকে বাঁচতে পারছে না। ফলে তারা আজ অস্তিত্ব সংকটে।

শহরের পথে পথে সাপ হাতে নিয়ে বেদেনীদের ঘুরে ঘুরে টাকা তোলা আমাদের কাছে অত্যাচার মনে হলেও তারা বেঁচে থাকার জন্যই সাপ খেলা দেখানো বাদ দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমেছে। শত শত বছর ধরে প্রচলিত সমাজ ও সভ্যতার প্রতি এক ধরনের উদাসীনতা রয়েছে বেদে সম্প্রদায়ের।

পৃথিবীর সর্বত্রই যাযাবর শ্রেণির মাঝে এই প্রবণতা বিদ্যমান। তারা নিজের কাজটাকে ভালোবাসে, ভালোবাসে মানুষকে আনন্দ দিতে। বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদা ছাড়া আর কোন চাহিদা যেন নেই তাদের।

নদীর স্রোতের মত, বহমান বাতাসের মত তাদের জীবন। নদী শুকিয়ে আসা, নদীকেন্দ্রীক জীবন বদলে যাওয়ার কারণে মূল পেশা থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে বেদেরা। তাছাড়া ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর কারণে নিজেদের স্থাবর সম্পত্তিও তেমন নেই।

নদীর ঘাট কিংবা খাস জমিতে তাদের অস্থায়ী বসবাস। সে কারণে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াও হয় না। যারা এই প্রতিকূল পরিস্থিতি ঠেলে লেখাপড়া করে তারা তথাকথিত সভ্য সমাজে জায়গা পায় না।

বেদে পল্লীর বাসিন্দা তাওহিদুল ইসলাম বললেন, অনেক কষ্টে অনার্স পড়েছি। বেদের ছেলেকে স্কুলে ভর্তি নিলেও কেউ চাকরি দিচ্ছে না। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। বেদে বলে আমরা মানুষ না? পিছুটানের বালাই নেই, সে কারণেই সাধারণ গৃহী মানুষ সবসময় এক দুর্বার আকর্ষণ অনুভব করেছে বেদে সম্প্রদায়ের প্রতি। বেদে নারীর তীব্র টানে বিবাগী হয়েছে কত শত পুরুষ। বাংলা সাহিত্যে সেইসব কাহিনী খুব বড় স্থান দখল করে রয়েছে। একটা সময় ছিল, যখন সাপের গল্প নিয়ে প্রচুর সিনেমা তৈরি হয়েছে।

নলছিটি পৌর এলাকার ৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আঃ কুদ্দুস মোল্লা জানান, নলছিটি লঞ্চঘাট ও ফেরী ঘাট এলাকায় মানতা (বেদে) সম্প্রদায়ের ২০ টি পরিবার নতুন বসতি স্থাপন করেছে। সেখানের ২০টি পরিবারে শতাধিক বাসিন্দা রয়েছে। শতাধিক বাসিন্দাদের মধ্যে এবছর নতুন ভোটার হয়েছেন ৬০ জন। এখানেও বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ নতুন ভোটার রয়েছে।

 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।