Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১০ আষাঢ় ১৪২৬, মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০১৯, ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

অধিক শীতে বোরো আবাদে কমিউনিটি বীজতলা


১১ জানুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার, ০৬:১৪  পিএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


অধিক শীতে বোরো আবাদে কমিউনিটি বীজতলা

ঢাকা : বর্তমানে সারাবিশ্বের মধ্যে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে। আর গুরুত্ব ও প্রয়োজন বিবেচনায় বাংলাদেশের কৃষিতে ধান উৎপাদন একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। আউশ, আমন, বোরো- এ তিন মৌসুমেই বাংলাদেশে ধান উৎপাদন করা হয়ে থাকে।

তবে এখন বোরো আবাদে ধান উৎপাদনের জমির পরিমাণ ও আওতা সবচেয়ে বেশি। আর বোরো আবাদের সময়টি হলো শীতকালে। অর্থাৎ বোরো আবাদের মৌসুমটি শুরু হয় একেবারে শীতের শুরুতেই। আমরা জানি ধান আবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো সঠিক পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরী করা। কাজেই বীজতলা তৈরী এবং এর মাধ্যমে মানসম্মত ধানের চারা উৎপাদনই উচ্চফলনশীল বোরো আবাদের সফলতা পাওয়া যেতে পারে।

সময় ও স্থানভেদে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ হতেই বোরো আবাদের জন্য বীজতলা তৈরীর প্রস্তুতি নিতে হয়। এ বীজতলার জন্য এ মৌসুমে একটি বড় সমস্যা রয়েছে। সেটি হলো বীজতলায় অধিক শীতের প্রকোপে চারার বাড়-বাড়তি কমে যেতে থাকে এবং চারার আগা থেকে প্রথমে লাল হয়ে তা নিচে গোড়া পর্যন্ত বিস্তৃত হতে থাকে এবং এক সময় চারা আর না বেড়ে দুর্বল হয়ে তা মরে যেতে থাকে। এটি একটি রোগ। এ রোগটিকে কোল্ড ইনজুরি বলা হয়ে থাকে।

ধানের চারা উৎপাদনের জন্য একটি স্থায়ী নিয়ম বা থাম্ব রোল রয়েছে। প্রতি শতাংশ জায়গায় ৪-৫ কেজি ধানের বীজ বুনতে হয়। সেই পরিমাণ সুস্থ-সবল চারা দিয়ে তার ২০গুণ পরিমাণ জমিতে বোরো আবাদ করা যায়। তবে শর্ত থাকে যে সেসব চারার মান ভালো হতে হবে। ডিসেম্বর মাসের শেষ দিক থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বোরো ধানের চারা রোপণ করা যায়। কাজেই দেখা যাচ্ছে নির্ধারিত সময় ও পরিমাণে বীজতলার মাধ্যমে ধানের চারা উৎপাদনের উপর বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও পারফরমেন্স নির্ভর করে।

যেহেতু বোরো আমাদের দেশের কৃষি অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভবনাময় ফসল। কাজেই এর উৎপাদন সুষ্ঠু ও মানসম্মতভাবে বজায় রাখার জন্য আমাদের সম্ভব সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ বাঞ্ছণীয়। সেজন্য বীজতলা আদর্শ পদ্ধতিতে করা প্রয়োজন। দেখা গেছে আমাদের দেশের বেশিরভাগ কৃষক মান্দাতা কিংবা সনাতন পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরী অধিকতর অভ্যস্ত। সেজন্য আমাদেরকে আধুনিক পদ্ধতিতে বোরো বীজতলা প্রস্তুতের ব্যবস্থা নিতে হবে। বিভিন্নভাবেই বীজতলা প্রস্তুত করা যায়। শুকনা পদ্ধতি, ভেজা পদ্ধতি, ভাসমান পদ্ধতি, বেড পদ্ধতি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এগুলোর মধ্যে বেড পদ্ধতিই হলো আদর্শ বীজতলা পদ্ধতি। এ পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিকভাবে কমিউনিটি বীজতলা বলা হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিটি অন্যান্য সকল পদ্ধতি থেকে একটু আলাদা। কারণ এর অনেক সুবিধা রয়েছে যা অন্য সাধারণ পদ্ধগুলোতে নেই।

আমরা জানি বীজতলা তৈরীর জন্য একটু আলাদা ধরনের জমির প্রয়োজন হয়। আর সেটি হতে হবে একটু উচুতে, হতে হবে পানি ধরে রাখার গুণসম্পন্ন অর্থাৎ কাদাযুক্ত মাটি, হতে হবে সেচ সুবিধাযুক্ত জায়গাতে, একসাথে অনেকটুকু পরিমাণ জায়গা থাকতে হবে যাতে অনেক মানুষের জন্য অনেক জমিতে রোপণ করা যায় এবং একসাথে অনেক কৃষক মিলে বীজতলা তৈরী করা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। সেখানে সময়মত জমি প্রস্তুত করে সেখানে হালকা পানি ধরে রেখে কাদা মাটি প্রস্তুত করতে হবে। এরপর জমিতে লম্বালম্বিভাবে উত্তর-দক্ষিণমুখী এক মিটার (দুইহাত) প্রস্তের বেড তৈরী করতে হবে। প্রতি দুই বেডের মাঝে ৬-৮ ইঞ্চি পরিমাণ ফাঁকা নালা রাখতে হবে যাতে বীজ বোনা এবং বীজতলার আন্ত:পরিচর্যা অতি সহজেই করা যায়।

এভাবে তৈরী করা বীজতলাতে সেচ দিয়ে দিয়ে প্রতিবারই অল্প পরিমাণে ইউরিয়া সার এবং জমি প্রস্তুতের সময় পরিমাণমত টিএসপি, এমওপি ইত্যাদি সার ছিটিয়ে দিতে হবে। তবে চারা লাল হয়ে যাওয়ার ভাব পরিলক্ষিত হলে সেখানে তাৎক্ষণিক কার্যকর হওয়ার জন্য অল্প পরিমাণ ইউরিয়া সার পানিতে গুলিয়ে চারার পাতার উপর স্প্রে করতে হবে।

তাতে কোল্ড ইনজুরি আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। যেকোন জীবের ছোটকালকে যেমন যত্ন করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে, ঠিক তেমনি ধানের চারা রোপণের জন্য প্রস্তুত করতে হলেও সেরকম বিশেষ যতেœর প্রয়োজন। প্রত্রকান্তওে দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে কোল্ড ইনজুরিতে অনেক বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেগুলোকে বিশেষ যতেœর মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে একবার বোরো বীজতলা নষ্ট হয়ে গেলে পুনরায় তা স্থাপন করা সম্ভব নয়।

আর বিশেষ যতেœর প্রয়োজন বলেই একে নার্সারি বলা হয়ে থাকে। কাজেই ভালো ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে যেমন ভালো জাতের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ভালো মানের চারা উৎপাদন করা। আর ভালো মানের চারা উৎপাদন করে বোরো আবাদ ও ফলন বৃদ্ধি করে দেশজ কৃষি আয় বাড়ানোর জন্য সারাদেশে আদর্শ বীজতলা তৈরীর বিকল্প নেই। আর সেটি করতে হলে প্রয়োজ ব্যাপক কৃষক প্রশিক্ষণ। আমার জানা মতে সারাদেশে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের, (ব্লক, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা কৃষি অফিস) অফিসগুলোর মাধ্যমে তাদের পর্যাপ্ত মাঠকর্মীকে দিয়ে প্রতি মৌসুমের শুরুতেই এ প্রশিক্ষণের কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। এখন কাজ হলো সেটিকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়ে এর সুফল লাভে সকলকে ব্রতী করা। পারলে এটি এবছরে এবং এ মৌসুম থেকেই শুরু করা।

লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
email: [email protected]om

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।