Bahumatrik Logo
২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ

১৯ বছরেও শুকায়নি মাগুরছড়ার ক্ষত, মেলেনি ক্ষতিপূরণ


১৪ জুন ২০১৬ মঙ্গলবার, ১২:০৭  এএম

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


১৯ বছরেও শুকায়নি মাগুরছড়ার ক্ষত, মেলেনি ক্ষতিপূরণ
ছবি-বহুমাত্রিক.কম

মৌলভীবাজার : মঙ্গলবার ১৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে বেদনাবিদূর মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন গভীর রাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া গ্যাস কূপে অক্সিডেন্টাল কোম্পানির ড্রিলিং চলাকালে ভয়াবহ বিষ্ফোরণ যে ক্ষত তৈরী করে প্রায় দুই দশকেও তা শুকায়নি। এখনো ফিরেনি বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ।

ভয়ানক সেই বিস্ফোরণে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া বনজ পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, রেল ও সড়কপথ, ভূ-গর্ভস্থ পানি, পানজুম, বিদ্যুৎ লাইনসহ স্থানীয় জনজীবনে যে গভীর ক্ষত হয়েছে, তা কত যুগে সারবে সে উত্তর জানা নেই কারোরই। 

দুর্ঘটনার প্রায় দুই দশক পার হতে চললেও বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আংশিক পরিশোধ করলেও এর জন দায়ী মার্কিন অক্সিডেন্টাল বন বিভাগকে কোন ক্ষতিপুরণ দেয়নি। যার ফলে ১৯ বছরেও ফিরেনি লাউয়াছড়া উদ্যানের ভেতরে মাগুরছড়ার প্রাকৃতিক বনের স্বাভাবিকতা।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের অভ্যন্তরে মাগুরছড়া এলাকায় ১৯৮৪-৮৬ ও ১৯৯৪ সালের দায়িত্ব পায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল গ্যাস উত্তোলনকারী অক্সিডেন্টাল কোম্পানি। দায়িত্ব গ্রহণের পর অক্সিডেন্টাল গ্যাস ফিল্ডের ড্রিলিং কাজের জন্য সাবলিজ প্রদান করে ডিউটেক নামের জার্মান কোম্পানিকে। ১৪নং ব্লকের মাগুরছড়াস্থ গ্যাসকূপের খননকালে ১৪ জুন মধ্য রাত ১টায় ভয়াবহ বিষ্ফোরণে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬৯৫ হেক্টর বনাঞ্চলের পরিবেশের জীববৈচিত্র্য, রেল ও সড়কপথ, ভূগর্ভস্থ পানি, ফুলবাড়ি চা বাগান, খাসিয়া পুঞ্জির বাড়িঘর ও পান জুম, পিডিবির ৩৩ হাজার বিদ্যূৎ লাইনের।

পরোক্ষভাবে ২৮টি চা বাগান সহ ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। এছাড়া ২শ’ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়, যার বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৫০ কোটি ডলার। দূর্ঘটনার দুই বছরের মধ্যে ফুলবাড়ি চা বাগানের ক্ষতিগ্রস্ত টি প্ল্যান্টেশন এলাকার ক্ষতিপূরণ, খাসিয়া পুঞ্জির ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ২ কোটি ৫ লাখ টাকা দাবির মধ্যে ৫০ লাখ টাকা ও বাস মালিক সমিতিকে ২৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। মাগুরছড়ায় অক্সিডেন্টালের গ্যাস কূপ খননের সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কাঠিয়ে উঠা যায়নি। ২০০৮ সালে মাগুরছড়া ও লাউয়াছড়ায় শেভরন ত্রি-মাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ কাজ সম্পন্নকালে বিভিন্ন এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়।

মাগুরছড়া দূর্ঘটনার ১৮ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পায়নি রেল সেকশন, ক্ষতিগ্রস্ত বন, পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্যের। বন বিভাগের হিসাবমতে প্রত্যক্ষ ক্ষতি ৩২ দশমিক ৫৩ কোটি এবং অন্যান্য ক্ষতি মিলিয়ে মোট ১৭৬ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা। এই সময়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় পুরো হিসাব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬০৯ কোটি টাকা নিরূপণ করে অক্সিডেন্টালের কাছে দাবি জানায়।

দুর্ঘটনার সময়ে তৎকালীন সরকারের খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার পর কমিটি ১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট পেশ করে। রিপোর্টে অক্সিডেন্টালের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করা হয়।

মাগুরছড়া বিস্ফোরণে পুড়ে যাওয়া ভূ-গর্ভস্থ গ্যাসের পরিমাণ ৪৮৫.৮৬ বিসিএফ এবং এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ২৪৫.৮৬ বিসিএফ উল্লেখ করা হলেও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। ১৯৯৭ সনের তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, মাগুরছড়া বিস্ফোরণে পুড়ে যাওয়া ভূ-গর্ভস্থ উত্তোলনযোগ্য ২৪৫.৮৬ বিসিএফ গ্যাসের দাম বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩৮৩৪.৪৮ কোটি টাকা।

তদন্ত রিপোর্টে ভূ-গর্ভস্থ পানি সম্পদ ও পরিবেশের ক্ষয়-ক্ষতির বিবরণ দেয়া হয়েছে, কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়নি। ভূ-গর্ভস্থ পানি সম্পদ ও পরিবেশের ক্ষয়-ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা নিরূপণের সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী মাগুরছড়ার মোট ক্ষতির পরিমাণ হচ্ছে ১৩ হাজার কোটি টাকার উপরে। ক্ষতি থেকে উদ্ধার পেতে সময় লাগবে ২০ বছর এবং ঐ ক্ষতি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০৭.১২ কোটি টাকা। এছাড়া বনাঞ্চলের সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা ধরা হয়েছে ৪০ হেক্টর ভূমি এবং ১৫,৪৫০টি গাছ। এ বনের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে ১১০ বছর।

সিলেট বিভাগীয় বন্যপ্রাণী বিভাগের একজন কর্মকর্তা বললেন, বনের ১৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি নিরূপণ করে দেয়া হলেও এ পর্যন্ত কিছুই পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক বনের ক্ষতি কোন সময়ে পুষিয়ে উঠার নয়। এদিকে ২০১০-১১ সালে শেভরন কমলগঞ্জের নূরজাহান ও ফুলবাড়ি চা বাগান এবং শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা বাগানে সবুজ বেষ্টনীর আবাদ করে গ্যাসকূপ খনন করে। এসব কূপের কার্যক্রমে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণির জন্য ক্ষতি বয়ে আনছে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, মাগুরছড়া দুর্ঘটনায় শুধু পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে ৬শ’ কোটি টাকা। ১৯৯৯ সালের আগষ্ট মাসে অক্সিডেন্টাল মাগুরছড়া গ্যাসকূপসহ তাদের ব্যবসা মার্কিনের অন্য কোম্পানি ইউনিকলের কাছে হস্তান্তর করে। ইউনিকল দায়িত্ব নেয়ার পর ক্ষতিপূরণ বিষয়ে টালবাহানা শুরু করে।

সব মিলিয়ে পুড়ে যাওয়া গ্যাস, ক্ষতিগ্রস্থ বন ও পরিবেশের বিশাল ক্ষয়ক্ষতি আদায়ে মার্কিন কোম্পানি সমূহের টাল বাহানায় মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের এ যাবত ৩ টি কোম্পানির হাত বদল হয়েছে। কিন্তু পুুরো ক্ষতিপূরণ আদায়ে আজও কোন পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রতি বছর ১৪ জুন আসলেই ঘটনাটিকে স্মরণ করা হয়। আর ক্ষয়ক্ষতির কথা উঠে আসে। কিন্তু বন ও পরিবেশের স্বাভাবিকতা এবং ক্ষতিপুরণ আদায়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।

 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

বিশেষ প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ