Bahumatrik Logo
২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৩:১৫ পূর্বাহ্ণ

সচিন-ভিভের প্রতি ঘোর অন্যায় হচ্ছে: কোহলি


০৩ জুন ২০১৬ শুক্রবার, ০৩:১০  পিএম

বহুমাত্রিক ডেস্ক


সচিন-ভিভের প্রতি ঘোর অন্যায় হচ্ছে: কোহলি

ঢাকা : সচিন টেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনা হচ্ছে দেখলে তাঁর কী মনে হয়? সেই সচিন, যাঁকে দেখে তাঁর ক্রিকেটার হিসাবে বেড়ে ওঠা। তাঁকে দেখে দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখা শুরু। ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে তুলনা হচ্ছে দেখলে কেন অস্বস্তিতে পড়ে যান? কেন লজ্জিত বোধ করেন? তারকার অন্দরে লুকিয়ে থাকা এক মাটির মানুষের কাহিনি।

বেঙ্গালুরুতে এবেলা -কে দেয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারের সেসব কথা বলেছেন বিরাট কোহলি

এই যে সচিন টেন্ডুলকার বা ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে আপনার তুলনা শুরু হয়েছে, সেটা দেখে কেমন লাগে?

বিরাট কোহলি: মনে হয়, ওঁদের প্রতি খুব অন্যায় হচ্ছে। আমার সঙ্গে ওঁদের কোনও তুলনাই চলে না। সচিন তেন্ডুলকর যেমন। আমাদের দেশে সকলকে ক্রিকেট খেলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আমার বয়সী যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন। একটাই উত্তর পাবেন— সচিন টেন্ডুলকারকে দেখে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছি। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। আর শুধু আমাদের প্রজন্ম কেন, আমার সিনিয়রদের প্রেরণাও তো সেই একটাই লোক। যুবি পাজি (যুবরাজ সিংহ) বা বীরু ভাই (বীরেন্দ্র সহবাগ)— ওরাও সচিন টেন্ডুলকারকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ, একটা লোক কি না প্রায় তিনটে প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করেছে ক্রিকেট খেলার জন্য। আমি এই তিনটে দলের মধ্যে তৃতীয় প্রজন্মের। সেই কারণে তুলনাটা হচ্ছে দেখলে নিজের যেমন ভীষণ একটা অস্বস্তি হয়, তেমনই মনে হয় সচিন টেন্ডুলকারের প্রতি অন্যায় হচ্ছে। বারবার আপনাকে বলতেও শুনেছি যে, আর যাই হোক সচিনের সঙ্গে তুলনা করবেন না।

কোহলি: সত্যি কথা বলতে কী, আমি লজ্জিত হয়ে পড়ি এই তুলনাটা দেখলে। মুখ ঢাকার জায়গা খোঁজার মতো অবস্থা হয় আমার। ক্রিকেট খেলতে এসে কতটা যে সচিন টেন্ডুলকার নামটার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি, আমার পক্ষে ব্যাখ্যা করাই কঠিন। এটা নিয়ে যা-ই বলি না কেন, কম হয়ে যাবে। দেশের অন্য কোনও যে কোনও কিশোরের সঙ্গে এই জায়গাটায় আমার কোনও তফাত ছিল না। একমাত্র তফাত হচ্ছে, আমি আপনার সামনে বসে সচিন টেন্ডুলকারকে নিয়ে আমার ভাবনার কথা বলতে পারছি। আমার বলা সেই কথাগুলো অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। ভারতের অনেক কিশোর বা তরুণ সেই সুযোগই পায়নি। হয়তো তাদের ক্রিকেট যাত্রা আগেই থেমে গিয়েছে। কিন্তু সচিন টেন্ডুলকারকে নিয়ে আমাদের কারও ভাবনায় কোনও তফাত নেই।

সচিন টেন্ডুলকারকে নিয়ে আপনার ভাবনার কথা লিখতে গেলে তাহলে কী লেখা উচিত?

কোহলি: আরাধনা। এই শব্দটাই আমি ব্যবহার করতে চাই। আমি সচিন তেন্ডুলকরের আরাধনা করে বড় হয়েছি। আক্ষরিক অর্থেই এটা হচ্ছে সঠিক শব্দ। এভাবেই একমাত্র আমি সচিন টেন্ডুলকারকে নিয়ে আমার ভাবনা ব্যাখ্যা করতে পারি। তাতেও হয়তো পুরোপুরি বুঝিয়ে বলা গেল না। সচিন তেন্ডুলকরকে দেখেই আমি ভারতের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্ন দেখেছি, ওরকম ব্যাট করব, দেশকে জেতাব। ভেবেছি, আহা যদি আমিও একদিন একইভাবে গোটা দেশের মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারি আমার খেলা দিয়ে! ভারতের জনতার মনে সচিন টেন্ডুলকারকে ঘিরে যে সাম্রাজ্য তৈরি হয়ে ছিল, রয়েছে এবং আজীবন থেকেই যাবে, সেটা এককথায় অবিশ্বাস্য! ওঁকে নিয়ে গোটা দেশের মানুষের ভালবাসা আর শ্রদ্ধাটাই এত পবিত্র! সচিন টেন্ডুলকার অবসর নেওয়ার সময় আমি লোককে কাঁদতে দেখেছি। ভারতীয় জনতার মনে কোথায় তাহলে স্থান থাকতে পারে তাঁর! অন্য কেউ সেই জায়গা পাবে, আমি বিশ্বাসই করি না। চব্বিশ বছর ধরে আমাদের দেশের সকলের কাছে সবচেয়ে ভালবাসার মানুষটির নাম ছিল সচিন টেন্ডুলকার। প্রত্যেকটা বাড়িতে প্রত্যেকটা লোক জানত, তিনি কে। প্রত্যেকে তাঁর সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করত। প্রত্যেকের শুভকামনা সবসময় এই একজনের সঙ্গে থাকত। কখনও কেউ সচিন তেন্ডুলকরকে ঘৃণা করেনি। সেখানে আমার তো মনে হয় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ লোক আমাকে পছন্দই করে না।

এখনও এটা আপনি মনে করেন যে, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ আপনাকে পছন্দ করে না? বর্তমান আবহটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। এখন ভারতীয় জনতার ডার্লিং তো বিরাট কোহলিই!

কোহলি: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে হয়তো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা পাল্টেছে আমাকে নিয়ে। সেটা আমি বুঝতে পারছি। মানুষ এখন আমাকে নিয়ে অনেক বেশি সহানুভূতিশীল। কিন্তু এটা তো ঠিক যে, অনেক মানুষের আমাকে নিয়ে বিরক্তি ছিল। অনেকেই আমাকে পছন্দ করত না। আমার মনে হয় সেটার একটা কারণ হচ্ছে, আমি আমার মতোই থেকে যেতে চেয়েছি। নিজেকে পাল্টাতে চাইনি। কখনও মনেও হয়নি যে, নিজেকে পাল্টে ফেলি। এখন মাঝেমধ্যে শুনবেন আমি বলছি, ঠান্ডা হতে চাই। ধীরস্থির হতে চাই। কিন্তু সেটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যত পরিণত হব, তত সেটা আসবে। সেখানে সচিন তেন্ডুলকরকে নিয়ে ভাবুন। পাকিস্তানে টেস্ট অভিষেকের প্রথমদিন থেকে কখনও এই একজনকে নিয়ে কারও বিরক্তি ছিল না। আমি কখনও কাউকে বলতে শুনিনি যে, সচিন টেন্ডুলকারকে সে পছন্দ করে না। বরং অভিষেকের মুহূর্ত থেকে ধারণাটাই ছিল যে, ব্যাট হাতে এক বিস্ময় বালক শুধু ভারতীয় দলকে নয়, ক্রিকেটটাকেই পাল্টে দিতে এসেছে। আর চব্বিশ বছর ধরে সেই প্রত্যাশাকে পূরণ করে গেলেন সেই লোকটা। সচিন তেন্ডুলকরের হাইওয়েটাই অন্যদের চেয়ে আলাদা। তিনি একটি রাস্তা ধরে চলেছেন, বাকিরা অন্য রাস্তা ধরে। অন্যরা খেলতে এসে তাদের ঘিরে সাম্রাজ্য বা যুগ তৈরি করার চেষ্টা করে। কেউ সেটা গড়তে পারে, কেউ পারে না। সচিন টেন্ডুলকারের আবির্ভাবই ঘটেছিল একটা সাম্রাজ্য সঙ্গে নিয়ে। সচিন যুগের শুরু। পরবর্তী বছরগুলোতে সেটা শুধুই বেড়েছে।

তবু তুলনা তো এড়ানোও যাচ্ছে না, তাই না?

কোহলি: কিন্তু তুলনাটা একদমই হওয়া উচিত নয়। কোনও মানেই হয় না। মানুষ হয়তো উত্তেজিত হয়ে পড়ে অন্যদের ভাল পারফরম্যান্স দেখে। যেমন আমার এই সাফল্য দেখে কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। কিন্তু ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, আমার এই সাফল্য শুধুমাত্র পাঁচ-ছ’মাসের। ২০১৬’র জানুয়ারি থেকে মে। বছরটাও এখনও শেষ হয়নি। সবে অর্ধেক রাস্তা পেরিয়েছে। আর ছ’মাসের ক্রিকেটের সঙ্গেই কি না তুলনা হচ্ছে চব্বিশ বছরের এক পূজনীয় কেরিয়ারের! এটা অন্যায় না তো কী?

আমার মনে হয় তুলনাটা হচ্ছে শুধুই এ বছরের ক্রিকেট দেখে নয়। ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায়। যখন মিচেল জনসনদের ঠেঙিয়ে চারটি টেস্টে আপনি চারটি সেঞ্চুরি করলেন। একটা ধারণা হতে শুরু করে দেয় তখন থেকেই যে, আমরা একজন স্পেশ্যাল প্লেয়ারকে ব্যাট করতে দেখছি।

কোহলি: এটা ঠিক যে, অস্ট্রেলিয়ায় আমি ভাল খেলেছিলাম। কিন্তু এই তুলনাগুলো তখন হয়নি। এগুলো শুরু হয়েছে এ বছর থেকেই। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত আমার যে ফর্ম, সম্ভবত সেটা দেখে। আমি এই তুলনাগুলো সমর্থন তো করিই না, শুনলে খুব লজ্জিতই হয়ে পড়ি। নিজের মনে বলে উঠি, কার সঙ্গে কার তুলনা! হায় রে! স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডসের সঙ্গে আমার তুলনা কী করে হতে পারে? পাগল নাকি? ভিভের যুগটা ভাববে না লোকে? সেই সময় কোনও প্রোটেক্টিভ গিয়ারই ছিল না। হেলমেট ছিল না। খোলা পিচে খেলতে হতো। যে পিচ কখনও ব্যাটসম্যানদের সাহায্য করত না। পুরোপুরি বোলার-সহায়ক ছিল। আর সেই সমস্ত পিচে একটা লোক খালি মাথায় সারা বিশ্বের তুখোড় সব বোলার, আগুনে সব ফাস্ট বোলারকে শাসন করেছেন। শুধু তাদের বিরুদ্ধে হেলমেট ছাড়া খেলে রানই করেননি, তাদের শাসন করে রান করেছেন। এখনকার ব্যাটসম্যানদের কাউকে গিয়ে বলুন না, হেলমেট ছাড়া ব্যাট করতে নামো আর বোলারদের পিটিয়ে এসো যাও। আমার মনে হয় না খুব বেশি লোক সেটা চেষ্টা করে দেখতেও আগ্রহী হবে (হাসি)। তাই বলছি, সচিন টেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনাটার যেমন কোনও মানেই হয় না, তেমনই ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে তুলনাটাও হাস্যকর। কী করে দু’টো প্রজন্মের মধ্যে তুলনা হতে পারে? এই তুলনাগুলো শুনলে এত লজ্জা লাগে আমার! ওই যে বললাম, আমার জন্য অস্বস্তিকর আর সচিন-ভিভের প্রতি ঘোর অন্যায় হচ্ছে!

এবেলা

 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।