Bahumatrik Logo
২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, বুধবার ০৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ৪:৩৩ অপরাহ্ণ

“আমি পাঞ্জাবি মারুম”


২৬ মার্চ ২০১৪ বুধবার, ০৭:৪৫  পিএম

ড. নিয়াজ পাশা

বহুমাত্রিক.কম


“আমি পাঞ্জাবি মারুম”
ছবি-সংগৃহীত

ঢাকা: আমি একজন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক। মননে, চিন্তায়, কর্মে সর্বক্ষণ সাংবাদিকতায় বিভোর। কৃষি, পরিবেশ, মুক্তিযুদ্ধ, হাওর কিংবা জীবন যুদ্ধ সব বিষয়ই সংবাদের উৎসের পেছনে ঘুরি। পত্রিকা পড়া এবং সাংবাদিকতা একটা নেশায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরে কর্মরত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আলোকচিত্রী নাইব উদ্দিন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে রাইফেলের পরিবর্তে কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। ক্যাম্পাস ও আাশে পাশের এলাকার মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাসমূহের তিনি একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। তাঁর তোলা মুক্তিযুদ্ধকালীন অসংখ্য ছবি বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের দলিল দস্তাবেজ ও বিভিন্নভাবে প্রদর্শিত ও ব্যবহৃত হচ্ছে। খুব ভালো লাগে।

স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি বলেন, ’৭১ মুক্তিযুদ্ধের সময় ময়মনসিংহের দায়িত্বে ছিলেন খাজা শাহাবুদ্দিনের জামাতা বিগ্রেডিয়ার নুরুদ্দিন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে ক্যাপ্টেন আঞ্জুম। অবাঙালিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বিভিন্ন বাড়ি ঘর লুট করে। সে সময় আমার দুই ছেলে নিতুন ও নিপুন। ছোট ছেলে নিপুনের বয়স মাত্র পাঁচ বছর।

কিন্তু সেই বয়সেই সে দেখেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলায় নিহতদের লাশ। মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে দেখেছে গভীর রাতে আগুনের লেলিহান শিখা, আর শুনেছে মানুষের করুণ আর্তনাদ। ছোট শিশুর মনে এর যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে তা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি।

নাইব উদ্দিন আহমেদকে নির্দেশ দেওয়া হলো মধুপুর জঙ্গলে চেক পোস্টের কিছু ছবি তোলার। পথে যেতে যেতে দেখতে পেলেন-এখানে-সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাজার পুড়িয়ে দিচ্ছে। দোকান, বাড়িঘর লুট করছে।  ছবি তোলা দেখে মেজর রেগে উর্দুতে বললেন, “যখন বলবো তখন ছবি তুলবে-তার আগে নয়।” বাজারের যে অংশ জনশুন্য, লুট করার কিছুই নেই তার ছবি তোলার নির্দেশ দিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাজারে আগুন দেওয়ার কটা ছবিও সুযোগ পেয়ে তুলে ফেললেন তিনি।

জিপে ফিরে আসার সময় মেজর কাইযুম জানান, তাঁর শখের ক্যামেরাটা কাজ করছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডার্ক রুমে গিয়ে ফিল্ম রেখে নতুন ফিল্ম দিয়ে লক খুলে দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমার ক্যামেরা ঠিক হয়েছে” মেজর তো মহাখুশি। উল্লেখ্য যে, মধুপুরে পাকবাহিনী কর্তৃক বাড়ি ঘরে এবং বাজারে আগুন দেওয়ার ওই ছবিগুলোর একটা ছবি মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় পাঠালে সেটি ছাপা হয়। বাংলাদেশে যে মুক্তিযুদ্ধো হচ্ছে তার প্রমাণ স্বরুপ এটি বিশ্বের দরবারে প্রথম ছবি ছিল।

মহা আনন্দে মেজর ক্যামেরাটি নিয়ে তাকে বললেন, ‘চলো, তোমার বাসায় যাব।’ বাসায় মেজরকে আনতে হলো। সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন ড. এস. এ. কাদের ও ড. তালুকদার।  স্ত্রীকে চা বিস্কুটের কথা বলতেই সে রাগে গরগর করে পেছনে দরজা দিয়ে তিনি অন্য বাসায় চলে গেলেন। কাজের ছোট মেয়েটাই অতিথিদের চা-নাস্তর ব্যবস্থা করল।

ঘরের পর্দার আড়াল থেকে উৎসুক দৃষ্টিতে নিপুন মেজরকে দেখছিল। মেজর ডেকে নিয়ে পাঁচ বছরের নিপুনের সঙ্গে বাংলা-উর্দু মিশিয়ে আলাপ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। এমন সময় নিপুনের হাতে কাইয়ুমের গুলি ভর্তি রিভলবার। মেজর তখন আদর করে নিপুনকে বলছেন, “কেয়া করেগা ইয়া রিভলবার লেকে?”

জবাব এলো, “পাঞ্জাবি মারুম”।

গুলি চালিয়ে দিল সে।

সবার মেরুদণ্ড বেয়ে তখন শীতল রাতে বয়ে যাচ্ছে। নির্বিকার নিপুন পিস্তলটি নেড়েচেড়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। মেজর পিস্তলটি নিলেন। সবার মনে তখন একটি প্রশ্ন- ক্রোধে উন্মত্ত লোকটি শেষ পর্যন্ত ওকে গুলি করবে নাকি! বিন্তু সবাইকে অবাক কের দিয়ে মেজর কিছু না করে বাসা থেকে হন হন করে বেরিয়ে যেতে যেত বললেন, “এই-ই- যখন বাঙাল মুলুকের অবস্থা তখন তোমরা যে আলাদা হয়ে যাবে এ কথাটা এখুনি বলা যায়।”

নিপুন জানতো না কি অসাধারণ একটি কাজ সে করেছে। কৃষিবিদ নওশের আহমেদ নিপুন বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগও প্রকাশনা বিভাগের উপ-পরিচালক। এখন সে জানে, যা সেদিন বলেছিল তা শুধু তাঁর একার কথা নয়, কিছু বিশ্বাসঘাতক বাঙালি বাদে সবার মনের আকাক্সক্ষাই ছিল সেটা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ মোড়ের নিপুনের ভাড়া বাসায় বসে শুনছিলাম অবসরপ্রাপ্ত নাইব উদ্দিন আহমদের দেশপ্রেমের সংগ্রামী ইতিহাস।

আরেকদিনের ঘটনা। নাইব উদ্দিন আহমেদের তোলা ময়মনসিংহ এলাকার ছবি যখন বিদেশি পত্রিকায় ছাপা হতে লাগল, পাকবাহিনী এ জন্যে তাঁকেই সন্দেহ করে বাসা তল্লাসী করতে এলো। কাগজপত্র তছনছ করার সময় একটি পত্রিকা কাটিং দেখে ক্যাপ্টেন থমকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেন, এ ছবি কার?

নাইব উদ্দিন সাহেব জবাব দিলেন, “আমার বাবার।”

পত্রিকা কাটিং এ ছবিসহ খান বাহাদুর নাজিব উদ্দিন আহমেদের মৃত্যু সংবাদ লেখা ছিল। যিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য ’খান বাহাদুর’ উপাধি পেয়েছিলেন।

ক্যাপ্টেন রাগে দুঃখে বলেন, যে পাকিস্তান তোমাদের বাপ দাদারা সৃষ্টি করেছে, তা যদি তোমরা না চাও, সে পাকিস্তান গোল্লায় যাক।” বলে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন।

দেশ আজ স্বাধীন। আজকের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধকে দেখছে ও জানছে, সেলুলয়েডে ধরে রাখা সেইসব দলিল দেখে। অথচ কেউ মনে রাখেনি এসব আলোকচিত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের।

লেখক: সাংবাদিক, কৃষিবিদ ও হাওর আন্দোলনের নেতা

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।