Bahumatrik Logo
১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

‘মামার কাছে আগে ছিল দেশ, তারপর তাঁর সন্তানরা’


০৮ জানুয়ারি ২০১৬ শুক্রবার, ১১:১৭  এএম

অপূর্ব ধ্রুবচারী

বহুমাত্রিক.কম


‘মামার কাছে আগে ছিল দেশ, তারপর তাঁর সন্তানরা’

ঢাকা : আফসানা ইয়াসমীন অর্থী। পেশায় শিশু মনোবিদ। একই সঙ্গে কাজ করেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও জাসদের শীর্ষ নেতা শহীদ কাজী আরেফ আহমেদের ভাগনী তিনি।

১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কালিদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় চরমপন্থীদের ব্রাশফায়ারে তিনিসহ প্রাণ হারান কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, স্থানীয় জাসদ নেতা ইসরাইল হোসেন ও সমশের মন্ডল।

হত্যাকান্ডের ৫ বছর পর ২০০৪ সালের ৩০ আগস্ট কুষ্টিয়া জেলা জজ আদালত এ হত্যা মামলায় ১০ জনের ফাঁসি ও ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন।

আলোচিত ওই হত্যাকান্ডের তিন আসামির মৃত্যুদন্ডের রায় কার্যকর হয়েছে বৃহস্পতিার রাতে। রায় কার্যকরের প্রাক্কালে বহুমাত্রিক.কম এর সঙ্গে কথা বলেছেন কাজী আরেফ আহমেদ-এর ভাগনী আফসানা ইয়াসমীন অর্থী।

জানিয়েছেন স্বজন হারানোর বিচার নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া। মামার আদর্শ ও দেশপ্রেমের কথা যেমন জানিয়েছেন, তেমনি জানিয়েছেন মামার সঙ্গে মধুর স্মৃতিকথাও।

শুক্রবার প্রকাশিত হচ্ছে সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব -

বহুমাত্রিক.কম: বর্বর সেই হত্যাকান্ডের দিনটার কথা কতটুকু মনে আছে আপনার, যখন আপনার মামার খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হচ্ছে-

আফসানা ইয়াসমীন অর্থী: ১৯৯৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মামার সাথে আমার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল। ওইদিন রাতেই মামার ফ্লাইট ছিল, তিনি যশোর চলে যান। মামীও ছিলেন যশোরে। সেদিন তিন-চারটা প্রোগ্রাম ছিল মামার। কালিদাসপুরের স্কুলের প্রোগ্রামের আগেও ২টা প্রোগ্রামে অংশ নেন মামা। দৌলতপুরে কাজী আরেফ সড়ক উদ্বোধন করেন। তারপরই ওই প্রোগ্রামটাতে যান, যেখানে মামাকে মেরে ফেলা হয়েছে।

সেদিন আমার মামাতো ভাই রিমন এসে বললো মামাকে গুলি করা হয়েছে, সবাই যাতে তাড়াতাড়ি নানুবাড়ি যাই। আমরা দ্রুত যেয়ে দেখি বাড়িতে অনেক সাংবাদিকরা এসেছেন। অরূপ ভাইয়া আর জুলি আপু তো (কাজী আরেফ আহমেদের ছেলে-মেয়ে) কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কারণ এর আগে মামাকে তিন চারবার মারার জন্য প্ল্যান হয়েছিল, তিনি সন্ত্রাসীদের তালিকাভূক্তও ছিলেন। কিন্তু ওই দিনই যে এই ঘটনা ঘটবে তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না।

আমরা মামার সন্তানদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। ওখান থেকে প্রথম ফোনটা করা হয়, যিনি ওই ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। আমার মামার রক্ত লেগে ছিল তার গায়ে। বেদনাদায়ক ব্যাপার হচ্ছে-যারা ওইদিন সন্ত্রাসীরদের ব্রাশফায়ারে মারা যান তাদের প্রত্যেকের গায়ে খোঁচা দিয়ে দিয়ে দিয়ে চেক করে খুনিরা যে আসলেই সবাই মারা গেছেন কিনা। সবচেয়ে অদ্ভূত ব্যাপার হচ্ছে খুনিরা নিজেরাও জানতো না কাজী আরেফ আহমেদ কে?

মামা-তো সাহসী ব্যক্তি ছিলেন, তিনি খুনিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমরা কী চাও, আমাদের মারছো কেন?-এসব আমাদের বলেছেন যিনি ওইদিন বেঁচে যান।

বেঁচে যাওয়া ওই ছেলেটার ভাষ্য এরকম ছিল, ‘‘আমি আসলে কাজী আরেফের কারণে বেঁচে গেছি, কারণ ওনার শরীরের রক্ত আমার গায়ে লেগেছিল। ওই রক্ত থেকেই আমি প্রাণে বেঁচে গেছি। এজন্য আমি কাজী আরেফের কাছে কৃতজ্ঞ।’’

ওই ছেলেটাই কোনরকমে উঠে এসে ফোন করে বলেন, মামার গায়ে গুলি লাগছে, তিনি হসপিটালে আছেন। মামার প্রাণটা চলে যায় ওখানেই যখন মাইক্রোবাসে তোলা হয় তাকে।
জুলি আপুর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘‘ওই সময় হয়তো বাবা ভেবেছেন আমি যে চলে যাচ্ছি, আমার দেশের কী হবে? দ্বিতীয়ত হয়তো চিন্তা করেছেন আমাদের কথা।’’

কারণ আগে আমার মামার কাছে আগে ছিল দেশ, তারপর তাঁর সন্তানরা। মামাকে আমরা দেখছি, পকেটে যদি ২শ’ টাকাও থাকছে সেই ২শ’ টাকাই অসহায়দের দিয়ে দিতে। দরকার হয়েছে ধার করেও মানুষের জন্য করেছেন।

বহুমাত্রিক.কম: দীর্ঘ ১৬ বছর পর আপনার মামার তিনি খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর হচ্ছে। স্বজন হারানোর এই বিচার নিয়ে আপনারা কতখানি সন্তুষ্ট?

আফসানা ইয়াসমীন অর্থী: সরকারের কাছে অবশ্যই কৃতজ্ঞ। এজন্য যে আমাদের এতো কষ্টের (আবেগপ্রকবণ হয়ে) ...

প্রথম ফাঁসির রায়টা যেদিন বের হয়, আমার খালা কাজী সালেহা বলেছিলেন, ‘‘বিহাইন্ড দ্য সিন যারা আছে তারা কোথায়? হত্যাকান্ডে যে ১৮ কোটি টাকা দেয়া হলো, টাকাটা দিল কারা ?’’

হত্যাকারীদের ফাঁসি হচ্ছে আমরা খুশি, কিন্তু যারা নেপথ্যে, এখনো পলাতক তারা কোথায়? তাদেরকেও দেখতে চাই। তাদেরও ফাঁসি চাই আমরা।

বহুমাত্রিক.কম: আপনার মামার হত্যাকান্ডের সময় আপনি ছোট ছিলেন। বর্তমানে পরিণত বয়েসে এসে ব্যক্তি কাজী আরেফ আহমেদকে কিভাবে দেখেন-

আফসানা ইয়াসমীন অর্থী: মামা এমন একটা মানুষ ছিলেন, তিনি বলে দিতে পারতেন ১০ বছর পরে বাংলাদেশ কোথায় যাবে। উনি প্রচুর লিখতেন, প্রচুর পড়তেন। ঘর ভর্তি ছিল বই। মামার ব্যক্তিত্ব এতো অসাধারণ ছিল যে মামাকে বাঘের মতো ভয় পেতাম। ভয়টা ছিল সম্মানের। এখনো তার গলার ভয়েস কানে ভেসে আসে।

বহুমাত্রিক.কম: আপনার মামার সঙ্গে সর্বশেষ স্মৃতি নিয়ে বলুন-

আফসানা ইয়াসমীন অর্থী: ১৪ ফেব্রুয়ারি (১৯৯৯) যেদিন তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল, সেদিন আমার বড় মামার বড় ছেলে কাজী চেনি ভাইয়ার বৌ-ভাত ছিল। আমার মামনি (কাজী হাবিবা খাতুন) আর ছোট বোন চলে গিয়েছিলেন। মামা আমার জন্য খাবার রেখে দিয়েছিলেন। আমাকে ডেকে মামা জিজ্ঞেস করেন, ‘তুই খেয়েছিস, বললাম না। উনি বললেন তোর জন্য খাবার রেখে দিয়েছি ডাইনিংয়ে, খেয়ে নে।’

ওদিনটার পর যে মামার সঙ্গে আর দেখা হবে না এটা চিন্তাও করতে পারি না। পরবর্তীতে যে আমি তার লাশ দেখবো এটা কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারি নাই।

নানুর বাসা হচ্ছে ১৪/৩ অভিদাস লেন। ৫ম তলার ওই বাড়িতে গেলেই দোতালায় মামার ঘরে একটা উকি দিতাম। মামা বা মামী আছেন কিনা? ওই ঘটনার পর থেকে দোতালায় গেলেই ওই স্মৃতিগুলো চোখে ভাসে।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।