Bahumatrik Logo
২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৩:০৯ পূর্বাহ্ণ

বেগম রোকেয়া আজো কেন প্রাসঙ্গিক?


১৯ মার্চ ২০১৫ বৃহস্পতিবার, ০১:২৪  এএম

তারাপদ আচার্য্য, উপদেষ্টা সম্পাদক

বহুমাত্রিক.কম


বেগম রোকেয়া আজো কেন প্রাসঙ্গিক?

ঢাকা: বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। বাঙালি নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত। এই মহিয়সী নারী জীবদ্দশায় সৃজনশীল ও বৈপ্লবিক লেখনীর মাধ্যমে নারীর সামাজিক ও আইনগত মর্যাদা উন্নয়নের যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন দীর্ঘ সময় পরেও তা এখনও প্রাসঙ্গিক।

‘মেয়েদের লেখাপড়া শিখে কী হবে?’-এটাই ছিল বেগম রোকেয়ার সময়ের পুরুষশাসিত সমাজের কথা। পুরুষদের ধারণা ছিল-‘নারীর জন্ম গৃহকোণে কাজ করার জন্য’। এই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করার জন্য বেগম রোকেয়া তাঁর লেখনীর মাধ্যমে নারী সমাজকে জাগিয়ে তুলে পুরুষদের বুঝাতে চেয়েছেন পুরুষের মতো নারীরও সবকিছুতেই সমান অধিকার আছে।

আমাদের অর্থাৎ বাঙালিদের ইতিহাস বলে, মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে তাঁদের মানসিক বিকাশ ঘটানোর রীতি জোরালো ছিল না কোন কালেই। তদানীন্তন সমাজে তাদের কলঙ্ক আড়াল করার জন্য দু’একজন মহীয়সী নারীর নাম উল্লেখ করা হয় ঠিকই; কিন্তু তাঁরা দু’চারজন নিতান্তই ব্যতিক্রম।

মেয়েরা লেখাপড়া শিখে চাকুরি করবে, বাইরের মানুষের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান হবে ইদানিং আমাদের দেশসহ অনেক দেশে তা চায় না। এই না চাওয়ার পেছনেও রয়েছে পুরানো দিনের কুসংস্কার। মেয়েরা গুরুত্বপূর্ণ কোন অর্থনৈতিক অথবা সামাজিক কাজে মুখ্য ভূমিকা রাখবে বা পালন করবে এটা যেন আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ এখনও মেনে নিতে পারে না।

আমরা একটু পেছনের দিকে তাকালে দেখতে পাই ব্রিটিশ যুগের আগে পুরুষদের লেখাপড়ার হার খুব বেশি ছিল তা নয়। আর তখনকার সময়ে এ দেশ তথা ভারতবর্ষে যে লেখাপড়া প্রচলিত ছিল, তা প্রায় একচেটিয়া ব্রাহ্মণ, কায়স্থ আর বৈদ্যদের মধ্যে। তবে মুসলমানদের ভেতরে, লেখাপড়ার হার ছিল নগণ্য।

বেগম রোকেয়ার জন্ম রাস সুন্দরীর (বাংলায় প্রথম জীবনী লেখিকা) সত্তর বছর পরে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সমাজের মহিলাদের যে শোচনীয় অবস্থা ছিল, বেগম রোকেয়া তার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। কেবল স্ত্রী শিক্ষার তীব্র বিরোধিতা এবং কঠোর অবরোধ প্রথার নয়, সবকিছুতেই পুরুষের তুলনায় সমাজে মহিলাদের অধিকার কত কম ছিল, তার বিবরণ ও বিশ্লেষণ পাই তাঁর লেখা থেকে।

সেই সঙ্গে লক্ষ্য করি তিনি মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য কীভাবে অন্তহীন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু বেগম রোকেয়ার জন্মের এক দশক আগে রাসসুন্দরী দেবী যখন তাঁর অত্মজীবনী লেখেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে, সমাজে মেয়েদের স্থান তাঁর বাল্যকালের তুলনায় অনেকটা উন্নত হয়েছিল। তাঁর বিবেচনায়, মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে সমাজের মনোভাবে তখন কোন বিরোধিতা নাকি আর লক্ষ্য করা যাচ্ছিল না। রাসসুন্দরী আর বেগম রোকেয়ার মধ্যে কার কথা বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করবো?

১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে বেগম রোকেয়ার জন্ম হয়। তাঁর পিতা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী সাবের ছিলেন জমিদার। বেগম রোকেয়ার ছিলেন দুই ভাই-ইবরাহিম সাবের ও খলিল সাবের। তিন বোনের মধ্যে করিমুন্নেসা (১৮৫৫-১৯২৬) বেগম রোকেয়া ও হোমায়রা।

বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয় সে যুগের তুলনায় বেশ পরিণত বয়সে-ষোল বছরে। (একটা অসমর্থিত সূত্র অনুযায়ী আঠারো বছরে) কিন্তু পাত্র বিলেত ফেরত এক অবাঙালি দোজবরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। আপাতদৃষ্টিতে যতটা দুর্ভাগ্যজনক মনে হচ্ছে, বাস্তবে বিয়েটা বেগম রোকেয়ার জন্য তেমন শোচনীয় ছিল না বরং বিয়েই হঠাৎ বেগম রোকেয়াকে মুক্তি দেয় পৈতৃক পরিবারের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে, যেখানে তাঁর সত্যিকার অর্থে কোন স্বাধীনতা ছিল না।

পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সাখাওয়াত হোসেন নারীমুক্তির আদর্শ প্রত্যক্ষ করেন। বেগম রোকেয়াকে তিনি পেয়েছিলেন উৎসুক এবং আগ্রহী শিষ্যা হিসেবে। মতিচুর-এর (দ্বিতীয় খণ্ড) উৎসর্গে করিমুন্নেসাকে উদ্দেশ্য করে বেগম রোকেয়া লিখেন-তিনিই তাঁকে বর্ণপরিচয় পড়তে শিখিয়েছিলেন। ভাগলপুরে উর্দুভাষী পরিবারের স্ত্রী হিসেবে চৌদ্দ বছর এবং কলকাতায় উর্দু স্কুলের পরিচালিকা হিসেবে নিরন্তর উর্দু বলেও তিনি যে বাংলা ভাষার চর্চা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছেন, সে কেবল করিমুন্নেসার অনুপ্রেরণা ও আর্শীবাদে।

বিয়ের পরই বেগম রোকেয়ার গুণাবলী এবং চিন্তাধারা সাখাওয়াত হোসেনকে প্রভাবিত করে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মিলে মুসলমান মেয়েদের কুসংস্কার ও অজ্ঞতা সম্পর্কে আলোচনা করতেন। উদারচেতা সাখাওয়াত হোসেন বেগম রোকেয়ার সাথে আলাপ আলোচনায় উপলব্ধি করেন যে, মুসলিম নারী সমাজে শিক্ষা বিস্তার ব্যতীত মুসলমান সমাজের উন্নতি কোন প্রকারেই সম্ভব নয়। শিক্ষা সম্পর্কে বেগম রোকেয়ার মধ্যে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা বিরাজ করছে, তাও তিনি অনুভব করেছিলেন।

পদ্মরাগ উপন্যাসটি তিনি উৎসর্গ করেন ইবরাহিম সাবেরকে। এতে তিনি বলেন-পিতা, গুরু ইত্যাদি কেমন তিনি জানেননি, জেনেছেন কেবল ভাইকে এবং সেই ভাই-ই তাঁকে আপন হাতে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু এই দুই উক্তি সত্ত্বেও, মনে হয়, তাঁর উচ্চ শিক্ষিত এবং স্নেহশীল স্বামীই অনুক্ষণ তাঁকে লেখাপড়া করতে উৎসাহ দেন।

সাখাওয়াত হোসেন উর্দুভাষী ছিলেন, তাঁর বাড়িতে বাংলা বলা হত না। স্বামীর বাড়িতে বেগম রোকেয়া যে কখনও বাংলা বলার সুযোগ পাননি, নিজেই তা বলেছেন “মতিচুরে”। কিন্তু সাখাওয়াত হোসেন তবু তাঁকে বাংলা লিখতে এবং তা পত্রিকায় প্রকাশ করতে উৎসাহিত করেন, এ অনুমান সমীচীন। অন্তত Sultana`s Dream পড়ে সাখাওয়াত হোসেন যে উৎসাহিত হন, বেগম রোকেয়ায় তা উল্লেখিত আছে।

১৯০৪ সালে, মাত্র ২৪ বছর বয়সে বেগম রোকেয়া লিখেছিলেন-“পুরুষশাসিত সমাজে কেবল গায়ের জোরে মেয়েদের বঞ্চিত করা হয়েছে সকল ন্যায্য অধিকার থেকে। প্রবল বাধা অগ্রাহ্য করে যখনই কোন ভগ্নী মস্তক উত্তোলন করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন রূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে।.....আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্যে পুরুষগণ এই ধর্মগ্রন্থগুলি ঈশ্বরের আদেশ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। ....এইধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষরচিত বিধি-ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। মুনিদের বিধানে যে কথা শুনিতে পান, কোন স্ত্রী মুনির বিধানে হয়তো তাহার বিপরীত দেখিতে পাইতেন.. ধর্ম আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে; ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন।”
সত্য কথা এমন সরল অথচ বলিষ্ঠ কণ্ঠে সেকালে আর কোন বাঙালি মহিলা বলেছেন বলে আমার জানা নেই।

অবরোধের দারুণ যন্ত্রণা ব্যক্তিগত জীবনেই বেগম রোকেয়া উপলদ্ধি করেছিলেন। অবশ্য করিমুন্নেসা এবং সেকালের লক্ষ লক্ষ মহিলাও তা করেছিলেন। কিন্তু অবরোধ মোচন করতে হবে, তার চেয়েও বড় কথা নারী সমাজকে মুক্ত করতে হবে বহু শতাব্দীর দৃঢ়মূল বন্ধন থেকে; এ চেতনা তিনি কোথায় পান, তা বলা শক্ত।

অসাধারণ আর এক প্রভাব বেগম রোকেয়ার ওপর, সেটি বিজ্ঞানের। সেকালের কোন বাঙালি নারীর রচনায় পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়ন সর্ম্পকিত তথ্য তথা সাধারণভাবে বিজ্ঞান বিষয়ক সাধারণ জ্ঞানের এমন সরল প্রকাশ এবং তার প্রতি কৌতূহল, এক কথায়, বিজ্ঞান মনষ্কতা লক্ষ্য করিনি। হয়তো বিলেতে কৃষিবিদ্যায় প্রশিক্ষিত স্বামীর সাহচর্যেই বিজ্ঞানে বেগম রোকেয়ার হাতেখড়ি হয়েছিল। কিন্তু হাতেখড়িতেই তা সমাপ্ত হয়নি। বিজ্ঞান বিষয়ক গভীর আগ্রহ এবং সাধারণজ্ঞান তাঁর চিন্তাকে সমুজ্জ্বল করেছিল। বিজ্ঞানের সুস্পষ্ট ছাপ মুদ্রিত দেখা যায় বিশেষ করে তাঁর রচিত গ্রন্থ “সুলতানার স্বপ্নে”।

বিগত যুগের যে-সব ধারণা নারীকে পুরুষের কৃপার পাত্রী করে রেখেছিল সেগুলো আজ নারীমুক্তি আন্দোলনের নেত্রীদের প্রধান আক্রমণ-লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। লক্ষ্য হয়ে উঠেছে নৈতিকতার প্রশ্নে পুরুষদের বিশেষ অধিকার। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও নারীর সংকুচিত ভূমিকা এক বিরাট বৈষম্য প্রাচীর রচনা করেছে যা অযৌক্তিক।

পুরুষের কাছ থেকে নারীর মুক্ত হওয়াকে “চেতনার উন্নয়ন” আখ্যা দেওয়া হয়েছে। নারীর এই চেতনা শক্তিকে তার জীবনের সব জায়গায় প্রয়োগ করতে দেওয়া হোক-আজ নারীমুক্তি আন্দোলনের এটাই মুখ্য দাবি। আর এ আন্দোলনে একজন বেগম রোকেয়া-ই আমাদের প্রেরণা। 

tarapada

tpacharjee@yahoo.com

 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।