Bahumatrik Logo
২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৩:১৬ পূর্বাহ্ণ

জীবন্ত কিংবদন্তি

পৃত্থিমপাশা জমিদার বাড়ি


২৭ মার্চ ২০১৪ বৃহস্পতিবার, ০৪:৫৫  এএম

হাসান ইমাম চৌধুরী

বহুমাত্রিক.কম


পৃত্থিমপাশা জমিদার বাড়ি

ঢাকা: ’’পৃত্থিমপাশা জমিদার বাড়ির মতো জীবন্ত জমিদার বাড়ি আর নেই’’-কথাটা আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছিল সেখান থেকে ফিরে এসে।

তখন থেকেই মনটা আনচান করছিল যাওয়ার জন্য। কিন্তু নানান ঝামেলায় সময় করে উঠতে পারছিলাম না। একদিন হাজারো কাজ রেখে আমার দল নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম পৃত্থিমপাশা জমিদার বাড়ি দেখার উদ্দেশ্যে। ফকিরাপুল থেকে রাতের বাসে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার রওনা দিলাম। প্রায় ৫ ঘণ্টা লেগে গেল কুলাউড়া পৌঁছাতে। সেখান থেকে অন্যবাসে পৌঁছালাম রবির বাজার। এখান থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ হলো জমিদার বাড়ি।

মৌলভীবাজার। বাংলাদেশের এক সবুজে ঘেরা প্রকৃতির লীলাভূমি। এ জেলাকে দু’টি পাতা একটি কুড়ির জেলাও বলা হয়ে থাকে। কেননা, দেশের মোট ১৬১টি চা বাগানের মধ্যে ৯৮টি চা বাগান রয়েছে এ জেলাতে।

মৌলভীবাজারের আয়তন ২৭৯৯ বর্গ কিলোমিটার, জনসংখ্যা ১৬ লাখ ১২ হাজার ৩শ’৭৪জন, উপজেলা রয়েছে ৭টি, রয়েছে ৫টি পৌরসভা, ইউনিয়ন ৬৭টি এবং গ্রাম রয়েছে ২১৩৪টি। এ জেলার শিক্ষার হার ৪২.০৬%। (পুরুষ-৪৫.৫৯% এবং মহিলা-৩৮.৪৫%)। মুক্তিযুদ্ধে জেলাটি ছিল ৪নং সেক্টরের অংশ।

জমিদার বাড়ির চিত্র চোখের সামনে ফুটে উঠতেই মনে হয় অনেক অনেক দিন আগের ভাঙাচোরা পলেস্তার খসে যাওয়া দেওয়াল, কোনো লোকের বাস নেই, দেওয়ালের গা বেয়ে গজিয়ে উঠেছে বটগাছ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু পৃত্থিমপাশা জমিদার বাড়ি পুরানো হলেও আজও বাড়িটি সাজানো গোছানো।

প্রায় দু’শ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পৃথি¦মপাশা জমিদার বাড়ি। বাড়ির কারুকার্যময় আসবাবপত্র, মসজিদের ফুলেল নকশা, ইমামবাড়া, সুবিশাল দীঘি যেকোনো ভ্রমণপিপাসুকে কাছে ডাকবে। তবে জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এখানকার ইমামবাড়া।

পৃত্থিমপাশার জমিদার পরিবার ছিল শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। তাই মসজিদের পাশেই রয়েছে ইমামবারা। ইমামবারা শব্দের অর্থ ইমামের বাসভবন। ভারত উপমহাদেশে ইমামবারাকে শিয়া সম্প্রদায়ের মহররমের অনুষ্ঠান উদযাপনের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নবাব আলী আমজাদ খাঁ এই ইমামবারাটি প্রতিষ্ঠা করেন। মহররমের দিন ইমামবারাকে কেন্দ্র করে কারবালার কাহিনী বর্ণনা, মর্শিয়া আবৃতি, শোক মিছিল ও মাতম চলে। এখানে  ১০ মহররম আশুরা আগে থেকেই জাঁকজমকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
জমিদারদের বর্তমান প্রজন্ম এখনও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মহররম উপলক্ষে তাজিয়া মিছিল বের করে আশুরা পালন করে। আর এ সময় ১০ দিন ধরে চলে মেলা।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, এলাকাটি এক সময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানকার শ্বাপদ সংকুল বন-বনানী ঘেরা পাহাড়ি এলাকায় নওগা কুকি উপজাতিদের দোর্দ- প্রতাপ ছিল। শ্রীহট্ট (সিলেট) সদরে সেই সময় মোহাম্মদ আলী নামে একজন কাজী ছিলেন।

১৭৯২ খৃস্টাব্দে ইংরেজ শাসকদের কর্তৃক নওগা কুকিদের বিদ্রোহ দমনে মোহাম্মদ আলী বলিষ্ট ভূমিকা রাখেন। ইংরেজ সরকার এতে খুশি হয়ে মোহাম্মদ আলীর পুত্র গাউছ আলী খাঁনকে ১২০০ হাল বা ১৪,৪০০ বিঘা নিষ্কর জমি দান করেন।
সে সময়ে বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে সবচেয়ে স্বনামধন্য এবং প্রভাবশালী অন্যতম জমিদার ছিলেন গাউস খাঁর পৌত্র নবাব আলী আমজাদ খাঁন। তিনি সমাজসেবক, দানশীল পরোপকারী জমিদার হিসেবে সারা বাংলা এবং আসামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।

সিলেটের বিখ্যাত আলী আমজাদের ঘড়ি ও সুরমা নদীর তীরে চাঁদনীঘাটের সিঁড়ি সমাজসেবায় তার একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত। তাঁর সময় এই জমিদার বাড়িতে ত্রিপুরার মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্য বাহাদুরসহ বহু ইংরেজ ভ্রমণ করে গেছেন।

এমনকি ইরানের রাজা পর্যন্ত। পরবর্তীতে জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখতে আলী আমজাদ খাঁন মৌলভীবাজার ও কুলাউড়ায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজ এবং সুপেয় পানির জন্য দীঘি খনন করেন।
২৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত সাজানো-গোছানো পৃত্থিমপাশা জমিদার বাড়িটি ঘুরে দেখার রয়েছে অনেক কিছু। বাড়িতে ঢুকতেই হাতের বামপাশে রয়েছে বিশাল একটি দীঘি। দীঘির পানি টলটলে যা দেখলে খরাপ মনটাও ভালো হয়ে যায়।

তিনটি ছোট-বড় শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে দীঘিতে। পশ্চিম পাড়ে জমিদারের সারিবদ্ধ স্থাপনা আর পূর্বপাড়ে পরলোকগত পৃত্থিমপাশার সব জমিদার ও পরিবারের সদস্যদের কবরস্থান। এই দীঘির দু’পাড়ে হাজি খাঁ এবং শাহ ডিঙ্গির মাজার রয়েছে যা দেখতে অন্যান্য মাজারের চেয়ে আলাদা।

পৃত্থিমপাশায় রয়েছে দু’টি জমিদার বাড়ি। এই বাড়ির ভেতর আপনি যখন যাবেন তখন পুরানো আমলের কারুকাজ খচিত সবকিছু মনে হলেও সেগুলো পরিষ্কার ঝকঝকে তকতকে দেখতে পাবেন। জমিদারদের ব্যবহার করা অনেক জিনিসপত্র রয়েছে এ বাড়িতে। রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য এখানে লোক রয়েছে।
জমিদারদের জমিদারী প্রথা আজ আর নেই। তবে রয়ে গেছে সুবিশাল বাড়ি এবং তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। যারা দূর-দূরান্ত থেকে আসেন তাদের প্রত্যাশা ইতিহাস সমৃদ্ধ বাড়িটি একদিন হতে পারে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়াতে আপনি দেখতে পারেন ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী রঙ্গিরকুল আশ্রম, মুড়ইছড়া ঝরনা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি, গাজীপুর চা বাগান, গগন টিলা, কালা পাহাড় ও দেওয়ান মামন্দ মনসুরের বাড়ি।

পৃত্থিমপাশা জমিদার বাড়ির আশেপাশে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। আপনাকে থাকতে হলে চলে আসেত হবে উপজেলা সদরে। এখানে রয়েছে সরকারি ডাকবাংলো ও মোটামুটি মানের হোটেল। ভাড়াও খুব একটা বেশি না।  

(লেখক: পরিভ্রাজক, ভ্রমণ-ইতিহাস গবেষক, লেখক)

বাংলাদেশ সময়: ২১৩৩ ঘণ্টা, মার্চ ২৬, ২০১৪

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।