Bahumatrik Logo
১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:৪০ অপরাহ্ণ

নজরুলের বিদ্রোহ : সদর্থকতা ও সমগ্রতা


০৩ জুন ২০১৪ মঙ্গলবার, ০১:০৮  পিএম

যতীন সরকার

বহুমাত্রিক.কম


নজরুলের বিদ্রোহ : সদর্থকতা ও সমগ্রতা

ঢাকা: “বিদ্রোহী’ পড়লুম ছাপার অক্ষরে মাসিক পত্রে- মনে হলো, এমন কখনো পড়ি নি। অসহযোগের অগ্নিদীক্ষার পরে সমস্ত মনপ্রাণ যা কামনা করেছিলো, এ যেন তা-ই; দেশব্যাপী উদ্দীপনার এই যেন বাণী।”

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পড়ার বিমুগ্ধ স্মৃতি বন্ধুদেব বসু এভাবেই তুলে ধরেছেন ১৯৪৪ সনে লেখা তাঁর ‘নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক প্রবন্ধে। যদিও এর আট বছর পরে, ১৯৫২ সনে, ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’ প্রবন্ধে নজরুলকে একজন ‘স্বভাব কবি’ আখ্যা দিয়ে লিখেছিলেন যে ‘ছেলেমানুষি তাঁর [নজরুলের] লেখার আষ্টেপৃষ্ঠে’ জড়িয়ে আছে’ এবং তাঁর কবিতা ‘অসংযত, অসংবৃত, প্রগল্ভ; তাতে পরিণতির দিকে প্রবণতা নেই; আগাগোড়াই তিনি প্রতিভাবান বালকের মতো লিখে গেছেন, তাঁর নিজের মধ্যে কোনো বদল ঘটে নি কখনো’ ইত্যাদি ইত্যাদি, তবু বাংলা কাব্যে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির গুরুত্ব তখনো তিনি অস্বীকার করতে পারেন নি। এই প্রবন্ধটিতে তিনি লিখেছেন,-

“কৈশোরকালে আমিও জেনেছি রবীন্দ্রনাথের সম্মোহন, যা থেকে বেরোবার ইচ্ছেটাকেও অন্যায় মনে হতো- যেন রাজদ্রোহের শামিল; আর সত্যেন্দ্রনাথের তন্দ্রাভরা নেশা, তাঁর বেলোয়ারি আওয়াজের আকর্ষণ-তাও আমি জেনেছি। আর এই নিয়েই বছরের পর বছর কেটে গেল বাংলা কবিতার; আর অন্য কিছু চাইলো না কেউ, অন্য কিছু সম্ভব বলেও ভাবতে পারলো না-যতদিন না ‘বিদ্রোহী’ কবিতার নিশেন উড়িয়ে হৈ-হৈ করে নজরুল ইসলাম এসে পৌঁছালেন। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙলো।”

শুধু বন্ধুদেব বসু নন, বঙ্গীয় সারস্বত সমাজের কেউই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে উপেক্ষা করতে পারেন নি। মোহিতলাল মজুমদার যখন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন, সজনীকান্ত দাস ‘বিদ্রোহী’র প্যারডি রচনা করে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের তুফান ছোটান, কিংবা গোলাম মোস্তফা ‘বিদ্রোহী’র বদলে ‘নিয়ন্ত্রিত’ হওয়ার জন্য নজরুলকে নসিহত করেন, তখনো এঁরা তো আসলে ‘বিদ্রোহী’র প্রচণ্ড শক্তি ও সার্থকতাকেই স্বীকৃতি জানান।

এভাবে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সূত্রেই ‘বিদ্রোহী কবি’ কথাটি যেন নজরুলের নামের সঙ্গে অনপনেয় সূত্রে গ্রথিত হয়ে যায়। সুভাষ চন্দ্র বসুর মতে দেশ বরেণ্য দেশপ্রেমিক নেতাও বলেন, - “নজরুলকে ‘বিদ্রোহী’ কবি বলা হয় এটা সত্যকথা। তাঁর অন্তরটা যে বিদ্রোহী, তা স্পষ্টই বোঝা যায়। আমরা যখন যুদ্ধে যাবো, তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাবো, তখনও তাঁর গান গাইবো।”

শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নয়, নজরুলের সমস্ত সৃষ্টিই তো বিদ্রোহের বাণীরূপ। সে- কারণেই তাঁর জন্য ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধাটি-যে অসংগত হয় নি, সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবে, নজরুলের সমসাময়িক পাঠক ও রসগ্রাহীগণের কাছে তাঁর বিদ্রোহের স্বরূপ প্রকৃতিটি যে স্পষ্ট উপলব্ধ হয় নি, সে কথাও অস্বীকার করা যায় না। তাঁর বিদ্রোহকে অনেকেই দেখেছেন একমাত্রিক রূপে, এর বহুমাত্রিকতা প্রায় সকলেরই নজর এড়িয়ে গেছে। এ-কারণেই নজরুল নিজে ‘বিদ্রোহী কবি’ আখ্যাটি খুব খুশি মনে মেনে নিতে পারেন নি। ১৯২৯ সনে কলকাতার এলবার্ট হলে তাঁকে যে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছিল, সেই সংবর্ধনার ‘প্রতিভাষণ’ এর একস্থানে তিনি বলেছিলেন-

“আমাকে ‘বিদ্রোহী’ বলে খামাখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এ নিরীহ জাতিটাকে আঁচড়ে কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়োবার ইচ্ছা আমার কোনো দিনই নেই। তাড়া যারা খেয়েছে, অনেক আগে থেকেই মরণ তাদের তাড়া করে নিয়ে ফিরছে। আমি তাতে এক-আধটু সাহায্য করেছি মাত্র।

এ-কথা স্বীকার করতে আজ আমার লজ্জা নেই যে, আমি শক্তিসুন্দর রূপ-সুন্দরকে ছাড়িয়ে আজও উঠতে পারি নি। সুন্দরের ধেয়ানী দুলাল কীটসের মতো আমারও মন্ত্র- `Beauty is truth, truth is beauty.`

তিনি যে কেবল বিদ্রোহের জন্যই বিদ্রোহের কথা বলেন নি, তাঁর বিদ্রোহ যে কেবল পুরোনোকে ভাঙার জন্য নয়, নতুনের সৃষ্টিই যে তাঁর মূল লক্ষ্য- এ কথার স্পষ্ট অভিব্যক্তি তো তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেই আছে-

‘আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্বে অবহেলে নবসৃষ্টির মহানন্দে।’ এ-রকম নবসৃষ্টির মহানন্দ বা সৃষ্টি সুখের উল্লাসের বাণীরূপ ধারণ করেই তিনি বিদ্রোহী। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি তাঁর যে কাব্যের অন্তর্গত, সেই ‘অগ্নিবীণা’র প্রথম কবিতা ‘প্রলয়োল্লাসে’-এরও তো একই বাণী-

“ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন বেদন!
আসছে নবীন- জীবন-হারা অসুন্দরে করতে ছেদন!
তাই সে এমন কেশে বেশে
প্রলয় বয়েও আসছে হেসে-
মধুর হেসে।
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির সুন্দর।”
ভাঙা ও গড়ার, ধ্বংস ও সৃষ্টির দ্বান্দ্বিকতার ধারক বলেই তো তাঁর উচ্চারণ-
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতুর্য্য।’
‘বিদ্রোহী’ হয়েও তিনি যে ‘শক্তি-সুন্দর রূপ-সুন্দর’-এর উত্তর সাধক, সে-কথার প্রমাণ তো বিধৃত হয়ে আছে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতারই অনেকগুলো ছত্রে-
“আমি বন্ধন হারা কুমারীর বেণী, তন্বী নয়ে ব‎হ্নি
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দ্যাম, আমি ধন্যি।
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরণ-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের!
আমি অভিমানী-চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যাথা সুনিবিড়,
চিত চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর।
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল ক`রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তাঁর কাকন-চুড়ির-কন-কন্।
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর।
আমি যৌবন ভীতু পল্লী বালার আচঁড় কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক কবির গভীর রাগিণী বেণু-বীণে গান গাওয়া।”

এই ছত্রগুলো একটি প্রেমের কবিতাও হতে পারে না? কিংবা এই ছত্রগুলোকেই একটি নিটোল প্রেমের কবিতা বলে গণ্য করা যায় না কি?

আবার এই ছত্রগুলোতেই কবির প্রেমিক সত্তার সঙ্গে বিদ্রোহী সত্তাও যে জড়িত- মিশ্রিত হয়ে রয়েছে, তাও তো অস্বীকার করতে পারি না। বিষধর বুকের ‘ক্রন্দন শ্বাস’ কিংবা ‘অবমানিতের মরম-বেদনা’ ঘোচাতে না পারলে নর-নারীর প্রেম কোনো মতেই সার্থকতার স্পর্শমন্ডিত হতে পারে না, এবং সে কারণেই প্রেমিককেও বিদ্রোহী হয়ে উঠতে হয়, বিদ্রোহী হয়েই বাস্তব পরিপার্শ্বকে প্রেম-সাধনার উপযোগী করে তুলতে হয়। যখন ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’ এবং ‘অত্যাচরীর খড়গ কৃপাণ ভীমরণভূতে রণিবে না’, তখনকার সেই ‘শান্ত উদার’ ‘নিঃক্ষত্রিয়’ বিশ্বেই রচিত হবে প্রেমিক-প্রেমিকার কাক্সিক্ষত মিলনকুঞ্জ। ‘চির উন্নত শির’ ‘চির-বিদ্রোহী বীর’ প্রেমিক তখন আপন প্রেমিকাকেই ‘বিজয়িনী’ বলে ঘোষণা করে বলতে পারবে,-

হে মোর রাণী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে। আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ তলে এসে।
এবং
বিদ্রোহীর এই রক্তরথের চূড়ে
বিজয়িনী! নীলাম্বরীর আঁচল তোমার উড়ে

বিদ্রোহী কবির প্রেম-ভাবনা যে প্রেমের কবিতাতেও বিত্রোহ-চেতনার সঞ্চার ঘটিয়ে তাকে অন্যরকম করে তুলেছে, তার অনন্য উদাহরণ ‘অ-নামিকা’ কবিতাটি। ‘অ-নামিকা’র প্রেমিক পুরুষটি যেন এক বিদ্রোহী কালাপাহাড়। কোনো বিশেষ প্রেমিকা এই প্রেমিকের উদ্দিষ্টা নয়, নৈর্ব্যক্তিক প্রেমেরই জয়-ঘোষণা তাব কণ্ঠে-

প্রেম সত্য, প্রেম-পাত্র বহু-অগণন,
তাই-চাই, বুকে পাই, তবু কেন কেঁদে ওঠে মন।
মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়,
যে পাত্রে ঢালিয়া খাও সেই নেশা হয়!

এমন নৈর্ব্যক্তিক ও সর্বাত্মক প্রেম তো সেই কবির ভাবনাতেই স্থান পেতে পারে যিনি জীবনের বহুমাত্রিকতা ও সমগ্রতার সাধক, সকল ক্লেদ ও কালিমা থেকে মুক্ত করে জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করার জন্যই যিনি বিদ্রোহী, যাঁর চেতনায় আছে অন্ন ও পুষ্পের সহবস্থান। ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন’ - এমন কট্টর বাস্তবাদী ভাবনা যে কবি, যে কবি অনায়াসে ঘোষণা করতে পারেন -‘প্রার্থনা করো-যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,/ যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ’, সেই কবি কাজী নজরুল ইসলামের চোখেই তো ধরা পড়ে জীবন-বাস্তবের উল্টো পিঠের ছবিও। খাদ্যের ক্ষুধা মেটানোর সঙ্গে সঙ্গেই যে মানুষের নান্দনিক ক্ষুধার পরিতৃপ্তি ঘটাতে হবে, সে-বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন ছিলেন বলেই সমগ্রতার সাধক এই কবি লিখলেন, - “মানুষ পেট ভরে খেয়ে, গা ভরা বস্ত্র পেয়ে সন্তুষ্ট হয় না, সে চায় প্রেম, আনন্দ, গান, ফুলের গন্ধ, চাঁদের জ্যোৎস্না যদি শোকে সান্ত্বনা দিতে না পারেন, কলহ-বিদ্বেষ দূর করে সাম্য আনতে না পারেন, আত্মঘাতী লোভ থেকে জনগণকে রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে তিনি অগ্র নায়ক নন।”

সারস্বত সাধনায় এই অগ্র-নায়কের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন বলেই নজরুলকে ‘বিদ্রোহী’ হতে হয়েছে। মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার পথে বাধার পাহাড় তৈরি করে রেখেছে যে-বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা, সেই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধেই তাঁর বিদ্রোহ। সেই সমাজব্যবস্থার ধারক যারা, সেই শাসক-শোষক জমিদার-মহাজন মোল্লা-পুরুত-সকলের বিরুদ্ধেই তাঁর বিদ্রোহ। তাঁর পুরো সৃষ্টির পরতে পরতে বিধৃত হয়ে আছে জীবনের সমগ্রতার ধারক সদর্থক বিদ্রোহ-চেতনা। তার এই বিদ্রোহের স্বরূপ ব্যাখ্যা করে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ-র কাছে লেখা সেই বিখ্যাত পত্রটিতে নিজেই তিনি জানিয়েছিলেন,-

“ ‘বিদ্রোহী’র জয়-তিলক আমার ললাটে অক্ষয় হয়ে গেল আমার তরুণ বন্ধুদের ভালোবাসায়। একে অনেকেই কলঙ্ক তিলক বলে ভুল করেছে, কিন্তু আমি করিনি। বেদনা-সুন্দরের গান গেয়েছি বলেই কি আমি সত্য সুন্দরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি? আমি বিদ্রোহ করেছি-বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে- যা মিথ্যা, কলুষিত, পুরাতন-পচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে। হয়তো আমি সব কথা মোলায়েম করে বলতে পারিনি, তলোয়ার লুকিয়ে তার রূপার খাপের ঝক্মকানিটাকেই দেখাইনি- এই তো আমার অপরাধ। এরই জন্য তো আমি বিদ্রোহী। আমি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, সমাজের সকল কিছু কুসংস্কারের বিধি- নিষেধের বেড়া অকুতোভয়ে ডিঙিয়ে গেছি, এর দরকার ছিল মনে করেই।”

নজরুল রচনাবলির যেকোনো মনযোগী পাঠকই উপলব্ধি করবেন যে নজরুলের বিদ্রোহের প্রকাশ তাঁর বক্তব্যে ও বিষয়ে যেমন, তেমনই আঙ্গিকে ও প্রকরণে। আরবি-ফারসি শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত ও দেশজ শব্দের সুষম বিন্যাস ঘটিয়ে- এবং হিন্দু ও ইসলামি পুরাণের নবায়ন ও যুগোপযোগী তাৎপর্য উদঘাটন করে বাংলা কবিতার আঙ্গিকে ও প্রকরণেও তিনি রেখেছেন অচিন্তিতপূর্ব বিদ্রোহের স্বাক্ষর।

কিন্তু বুদ্ধদেব বসু যখন আচমকা বলে বসেন যে, নজরুলের ‘রচনায় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিদ্রোহ আছে, কিন্তু সাহিত্যিক বিদ্রোহ নেই’, তখন আমাদের বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয় বৈকি! ‘সাহিত্যিক বিদ্রোহ’ বলতে কী বোঝেন এই বিদগ্ধ কবি, সমালোচক ও সাহিত্যতাত্ত্বিক? নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে বিপুলভাবে নন্দিত হয়েছিল, সে কি শুধু ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক বিদ্রোহে’র জন্যই? প্রচুর ও গভীর বিদ্রোহকে ধারণ করেই কি তাঁর কবিতা অনন্য হয়ে ওঠে নি?

তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় সামাজিক-রাজনৈতিক বিদ্রোহের আধেয় যে-আধারে ধৃত হয়েছে, সেই সাহিত্যিক আধারটিতেও তো প্রচলিত কবিতার ‘যত বন্ধন, যত নিয়ম-কানুন শৃঙ্খল’ সব কিছুকে ভেঙে চুরে সাহিত্যিক বিদ্রোহের পরাকাষ্ঠই প্রদর্শন করেছেন। যে-ছন্দে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচিত সেই ‘মাত্রাবৃত্ত ছন্দে মুক্তবন্ধ কবিতা দেখা যায় না’- প্রখ্যাত ছন্দশাস্ত্রী প্রবোধ চন্দ্র সেনও সে-কথা জানতেন। অথচ তিনিই দেখলেন, “বাংলা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে মুক্তবন্ধ কবিতার অতি উৎকৃষ্ট নিদর্শন স্বরূপ বাংলার উদীয়মান কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ নামক কবিতাটি উল্লেখযোগ্য।”

সাহিত্যিক বিদ্রোহের নিদর্শন রূপেই মাত্রাবৃত্ত ছন্দ নজরুলের হাতে হয়ে গেল মুক্তবন্ধ তথা ‘নৃত্যপাগল ছন্দ’, এবং ছন্দেও যেমন অলংকারে উপমায়-উৎপ্রেক্ষায়ও নজরুল তেমনই বিদ্রোহী ‘মুক্ত জীবনানন্দ’। ‘ঈশান-বিষাণে ওল্কার’- এর সঙ্গে সমান মর্যাদায় ‘ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার`কে বিদ্রোহের দৃষ্টান্ত রূপে হাজির করা, কিংবা একই সঙ্গে ‘বাসুকির ফণা’ ও ‘স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা’ জাপটে ও সাপটে ধরার মতো সাহিত্যিক বিদ্রোহের কথা আধুনিক কালের বাংলা কবিতায় নজরুলের কবিতায় সাহিত্যিক বিদ্রোহের এ-রকম অচিন্তিত পূর্বতার বিষয়টি অনেক রসগ্রাহীর চেতনাতেই ধরা পড়েছিল। ১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যা ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ‘অগ্নিবীণা’র অন্তর্ভূক্ত ‘কামালপাশা’ কবিতাটি প্রসঙ্গে লেখা হয়েছিল,
“তুর্কীর নব-সৌভাগ্যের প্রতিষ্ঠাতা কামাল পাশার নামে যে কবিতাটি রচিত হইয়াছে সেটি বঙ্গসাহিত্যে অপূর্ব সৃষ্টি।

গদ্যপদ্যময় কবিতার সংস্কৃত নাম ‘চম্পূ’; সে হিসাবে এই কবিতাটিকে চম্পূ বলিলে ইহার বিশেষত্ব বুঝান যায় না, কারণ ইহাতে যে উদ্দীপনা আছে প্রাচীন চম্পূতে তাহা পাই না। যুদ্ধের অভিযানে জয়ডঙ্কার তালে তালে যোদ্ধাদের যে জয়োল্লাস এই ‘কামালপাশা’ কবিতাটির পাই - তাহা এদেশের সাহিত্যে নতূন। কবির ছন্দে ও ভাষায় আমরা মুগ্ধ হইয়াছি; ইরাণ ও ভারতের এমন অপূর্ব মিলন, মোগল সম্রাটদের আমলের নামজাদা হিন্দী-সাহিত্যেও দেখি নাই। বঙ্গের কবিসমাজে নজরুল ইসলামের স্থান অতি উচ্চে।”

কোনো সন্দেহ নেই : বিদ্রোহই বঙ্গের কবি সমাজে নজরুলের উচ্চস্থান লাভের আসল হেতু। সে-বিদ্রোহ একই সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক। এক কথায়-সামগ্রিক।

তবে, এ-রকম সর্বাত্মক ও সদর্থক বিদ্রোহ কেবল বিদ্রোহই নয়, প্রকৃতপক্ষে তা বিপ্লব। বিদ্রোহ তো নিতান্ত খণ্ডিত, নঞর্থক ও দায়িত্বহীনও হতে পারে। একান্ত অপরিণামদর্শী মানুষও কোনো বিষয়ে আশুফল লাভের আশায় বিদ্রোহের আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু বিপ্লব সে রকম হতে পারে না। বিপ্লবের জন্য যে বিদ্রোহ, সে বিদ্রোহের ধারককে অবশ্যই হতে হয় অখণ্ড জীবনদৃষ্টিসম্পন্ন; হতে হয় সদর্থক, দায়িত্ববান ও পরিণামদর্শী। নজরুলের জীবন চেতনায় ও শিল্প চেতনায় এ-রকম সকল ইতিবাচক উপাদানের উপস্থিতি ছিল বলেই তাঁর সকল বিদ্রোহ ছিল বিপ্লবাভিমুখী।

বিপ্লবচেতনাকে তার সমগ্রতার ধারণ ও প্রকাশ করতে পারেন যে-শিল্পী, তিনিই মহৎ শিল্পী। মহৎ শিল্পীদের প্রসঙ্গে সোভিয়েত বিপ্লবের মহানায়ক লেনিনও বলেছিলেন যে, প্রকৃত মহৎ শিল্পীর সৃষ্টিতে কোনো-না-কোনো ভাবে, অতি সামান্য পরিমাণে হলেও, বিপ্লবের অপরিহার্য মর্মসত্যের প্রকাশ ঘটবেই। নজরুলের সৃষ্টিতে তো সামান্য পরিমাণে নয়, বিপুল পরিমাণে ও গভীরভাবেই প্রকাশ ঘটেছে বিপ্লবের মর্ম সত্যের। বলা যেতে পারে, তাঁর সমগ্র সৃষ্টিই বিপ্লবের মর্মবাণীর ধারক। তাই, ‘বিদ্রোহী কবি’- অভিধায়-অভিহিত কাজী নজরুল ইসলাম তো আসলে ‘বিপ্লবী কবি’।

jatinযতীন সরকার: বরেণ্য শিক্ষাবিদ, প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও লেখক

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।