Bahumatrik Logo
১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:৪৪ অপরাহ্ণ

‘নজরুলের নির্বাক জীবন রসূলের কাছে ফেরারই সোপান’


২৫ মে ২০১৪ রবিবার, ১২:৪৭  এএম

আশরাফুল ইসলাম

বহুমাত্রিক.কম


‘নজরুলের নির্বাক জীবন রসূলের কাছে ফেরারই সোপান’
মুস্তাফা জামান আব্বাসী/ছবি: বহুমাত্রিক.কম

ঢাকা: কাজী নজরুল ইসলাম। চিরবিদ্রোহী, সাম্যবাদী, প্রেমিক, সবকিছু ছাপিয়ে মানবতাবাদী এক কবি। জীবনভর অন্বেষণ করেছেন সত্যসুন্দরের স্বরূপ, বলতে চেয়েছেন শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কথা। চিরবিদ্রোহী-প্রেমিক এই কবি পরিণত জীবনের সুদীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন নির্বাক হয়ে। তিন দশকরেও বেশি সময় কবির এই নির্বাক জীবন প্রকৃত অর্থে রসূল মোহাম্মদ (সঃ)-এর কাছে ফেরারই সোপান। 

কবির ১১৬ তম জন্মদিনের প্রাক্কালে গুলশানের নিজ বাসায় বহুমাত্রিক.কম-কে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানিয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী, লেখক ও গবেষক মুস্তাফা জামান আব্বাসী

তিনি মনে করেন, মহান আল্লাহ ও তাঁর পয়গম্বর মোহাম্মদ-কে নিবেদন করা কাজী নজরুল ইসলামের যেই চার শতাধিক প্রেমসঙ্গীত রয়েছে, তা গোটাবিশ্ব মুসলিমের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়। পারস্যের জালালউদ্দিন রুমির পরে একমাত্র নজরুলের রচনায়-সঙ্গীতেই রসূলপ্রেমের সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।

একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, নজরুলের প্রতি আমাদের পরিপূর্ণ দৃষ্টি দেওয়া উচিৎ। স্বদেশে তো বটেই বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া উচিৎ কবির বিদ্রোহী-মানবদরদীসহ বহুমাত্রিক রূপ। কেননা কবির প্রয়াণের কয়েক যুগ অতিক্রান্ত হলেও এখনো নজরুল সমান ভাবেই প্রাসঙ্গিক। যাদের জন্য কবির ক্ষুরধার লেখনি গর্জে উঠেছিলো আজও তারা বঞ্চিত-অবহেলিত।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী। ব্যক্তিগত ও বৃহত্তর জীবনে রয়েছে বহুমূখি পরিচয় । বাংলা লোকসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের কনিষ্টপুত্র। সঙ্গীতভূবনে পিতার বিপুল-বিরাট যশখ্যাতির ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে পুত্র মুস্তাফা জামান আব্বাসীও লোকসঙ্গীতকেই বেছে নেন জীবনের একান্ত ব্রত হিসেবে। প্রায় ৫ যুগধরে তিনি লোকসঙ্গীতের শিল্পী হিসেবে মাতিয়ে রেখেছেন আমাদের সঙ্গীতভূবন।

Zamanমুস্তাফা জামান আব্বাসীর জন্ম ১৯৩৭ সালের ৮ ডিসেম্বর। ওস্তাদ মুহাম্মদ হোসেন খসরু, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খানসহ বিখ্যাত অনেক সঙ্গীতগুরুর কাছ থেকে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নেন তিনি। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার সব পর‌্যায়ে মেধার পরিচয় দেন মুস্তাফা। স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে।

আব্দুল আলীম, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, বেদারউদ্দীন প্রমুখের পরে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর কণ্ঠেই বিশেষ ব্যঞ্জনা লাভ করে আবহমান বাংলা শেকড়সঙ্গীত সমূহ। এসবের মধ্যে রয়েছে ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদী, চটকা, মারফতী, বাউল, হাসনসঙ্গীতসহ প্রত্যন্ত বাংলার মাঠেঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানাঢঙের লোকগীতি।

সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে দীর্ঘ সময়কালে নজরুলসঙ্গীতের কল্যাণে মুস্তাফা জামান আব্বাসী উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলছেন। কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী ও লোকধারার গান সমূহ সংগৃহীত এবং জনপ্রিয় করতে তাঁর প্রচেষ্টা অত্যন্ত আন্তরিক ও ব্যাপক। কেবল নজরুল সঙ্গীতের প্রসারেই নয়, নজরুল-কে সামগ্রিক ভাবে জানতে, মুস্তাফা জামান আব্বাসীর গবেষণার বিরল সব তথ্যউপাত্ত জানতে সহায়তা করেছে আমাদের।

সঙ্গীতশিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন শিল্পসংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে। দীর্ঘ ৫ যুগ নিরবচ্ছিন্ন অন্বেষনে কাটিয়ে এখনো তিনি এসবের চর্চায় সমানভাবেই নিরলস-স্বতঃস্ফূর্ত।

দীর্ঘসময় ধরে তিনি দেশীয় সঙ্গীতের বিচিত্র বৈভব-বৈচিত্র্য অন্বেষণ করেছেন। নিষ্ঠাবান গবেষক হিসেবে বাংলা সঙ্গীতের হাজারো বৈচিত্র্য উদঘাটন যেমন করেছেন, তেমনি গবেষণা নিবন্ধ আকারে তা উপস্থাপন করেছেন আন্তর্জাতিক সঙ্গীত সম্মিলনীতে।

পিতার মতোই মুসলিম জাতিসত্ত্বার প্রকৃত সাংস্কৃতিক পরিচয় সৃষ্টিতে মুস্তাফা জামান আব্বাসী রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। সুসম্বৃদ্ধ পারস্য সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে উপাদান সংগ্রহ করে সেসবরে অন্যন্য উপস্থাপন সার্থকভাবেই করতে পেরেছেন তিনি।

জগতবিখ্যাত সূফি সাধক জালালউদ্দীন রুমির সৃষ্টিকর্মের সরল অনুবাদ করেছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। মহান পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রকৃতস্বরূপ উদঘাটনে পৃথিবীর দেশে দেশে রুমির বাণী আজ কোটি মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষই গ্রহণ করছে।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী একই ভাবে ইসলাম, মুহম্মদ ও আল্লাহ’কে নিবেদিত কাজী নজরুল ইসলামের চার শতাধিক প্রেমসঙ্গীত এবং অন্যান্য সৃষ্টিকর্ম-দর্শন নিয়ে যেতে চান পৃথিবীজুড়ে, যেখানেই মুসলিম রয়েছে কিংবা রয়েছে মানবতাবাদী অন্যধর্মের অনুসারীরাও।

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ইসলাম নিয়ে নজরুলের যতো আহ্বান, তা যথাযথভাবে বিশ্বমুসলিমের কাছে পৌছে দেওয়া গেলে রুমির মতোই নজরুল সাড়ম্বরে সমাদৃত হবেন। নজরুলের প্রকৃত চেতনা পুস্তক আকারে পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বশীল ভাষাসমূহে রূপান্তরেও কাজ করছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী।

লোকসংস্কৃতি, ইসলামী দর্শন, লোকসঙ্গীত, বিশ্বসঙ্গীত, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, লোকসঙ্গীতের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী আব্বাসউদ্দীন ও সমাজ-ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে এ পর‌্যন্ত অর্ধশত গ্রন্থ লিখেছেন তিনি। পাঠক, গবেষক ও শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে এসব গ্রন্থ সাদরে গৃহীত হয়েছে।

বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে এর উৎকর্ষ সাধনে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর। সুচনা থেকেই রাষ্ট্রীয় এই দুটি প্রচারমাধ্যমে সঙ্গীত ও সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে অসংখ্য অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন তিনি। এক্ষেত্রে তাঁর বোন সঙ্গীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমান এর নামও সমানভাবে উল্লেখ্য।

সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে। দীর্ঘ ১১ বছর তিনি দেশের জাতীয় সঙ্গীত কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ছিলেন ফোক মিউজিক রিসার্চ গ্রুপের পরিচালক।

রোটারী ক্লাব, ঢাকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিশ্বে অসংখ্য দেশে অনুষ্ঠিত রোটারি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। দেশে-বিদেশে অসংখ্য সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও সম্মিলনীর সভ্য তিনি।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী একাধারে বাংলা একাডেমীর সম্মানিত ফেলো, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি’র জীবন সদস্য, বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান, ঢাকা ও গুলশান ক্লাবের সম্মানিত সদস্য, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আজীবন সদস্য, ইন্টারন্যাশন কাউন্সিল অব ট্রাডিশনাল মিউজিক, ইউএসএ-এর সদস্য।

বর্তমানে তিনি ইনিডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ স্কলার ও ডায়ালগ অব কালচারাল পলিসি’র চেয়ারম্যান।
সঙ্গীত, গবেষণাসহ সমাজ-সংস্কৃতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মুস্তাফা জামান আব্বাসী ভূষিত হয়েছেন অসংখ্য সম্মাননায়।

সঙ্গীতে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মুস্তাফা জামান আব্বাসী লাভ করেন একুশে পদক (১৯৯৫)। এছাড়াও তিনি লাভ করেছেন, চ্যানেল আই-রবি আজীবন সম্মাননা(২০১১), লালন পরিষদ অ্যাওয়ার্ড, সিলেট মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, নজরুল একাডেমি অ্যাওয়ার্ড, মানিক মিয়া অ্যাওয়ার্ড, আব্বাসউদ্দীন স্বর্ণপদক(চট্টগ্রাম), বেঙ্গল স্যানিটারি অ্যওয়ার্ড, নাট্যসভা অ্যাওয়ার্ড।

সঙ্গীতসাধনা, গবেষণা, লেখালেখিসহ বৃহত্তর জীবনের নানাদিক নিয়ে বহুমাত্রিক.কম-এর সঙ্গে কথা বলেছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। বিশেষ করে কথা বলেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পিতা কালজয়ী লোকসঙ্গীত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও আমাদের লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে।

দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ দুইপর্বে পাঠকের কাছে তুলে ধরা হলো। কথা বলেছেন বহুমাত্রিক.কম-এর সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম। ছবি তুলেছেন বিশেষ প্রতিবেদক সুরেশ বড়ুয়া। Mustafa

বহুমাত্রিক.কম: নজরুল গবেষক হিসেবে সমকালে নজরুলচর্চা কতখানি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন? যখন আমাদের চারদিকে এতো সংকট, হানাহানি-বিগ্রহ চলছে, ঠিক এই রকম একটি সময়ে দাঁড়িয়ে-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: এটা খুবই সঙ্গত প্রশ্ন যে নজরুল কতখানি প্রাসঙ্গিক? নজরুল তো ছিলেন সেই সময়ের যখন আমরা ইংরেজদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে যুক্ত ছিলাম। নজরুল নিজেও জেল খেটেছিলেন এবং আমরা এও জানি যে, ব্রিটিশরা নজরুলকে জেলের মধ্যে হত্যা করতে চেয়েছিলো, দু’বার তাঁর কারা প্রকোষ্ঠে সাপও পাওয়া গিয়েছিলো, যা তখনকার কাগজে এসেছিলো।

এখন প্রাসঙ্গিক এই জন্য বলবো যে, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি অনেক দিন হলো, সেই ৪৭-এ ব্রিটিশদের কাছ থেকে, আবার ৭১-এ আমরা পাকিস্তানীদের কাছ থেকে আমরা নিস্কৃতি পেলাম। দু’ধরনের শৃঙ্খল মুক্ত করেছি, সবাই জানেন যে এই দুই সময়ই নজরুলের গান আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে।

এখন কেউ যদি বলেন স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও নজরুল প্রাসঙ্গিক কিনা? তার উত্তরে এই বলা যায় যে, যদি মনেকরে থাকি আমরা পুরোপুরি স্বাধীনতা পেয়ে গেছি, সেটা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, কিংবা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, কিংবা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের স্বাধীনতা, তাহলে প্রাসঙ্গিক হয়তো অনেকখানি নয়।

অন্যদিকে, যারা মনে করেন আমরা পুরোপুরি অর্থনৈতিক মুক্তি পাইনি এবং যাদের জন্য নজরুল লিখেছিলেন, যাদের জন্য নজরুলের ক্ষুরধার লেখনি গর্জে উঠেছিলো, সেইসব অবহেলিত মানুষ-মুসলমান, যারা স্বাধীনতা হয়তো পেয়েছে কিন্তু তার সুফল ভোগ করতে পারেনি।

আমি মনেকরি নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা শুধু আছে তাই নয় বরং আরো বেড়েছে। তিনি ছিলেন মুসলমানদের প্রথম কবিকণ্ঠ, এর সঙ্গে বলতে হয় যার কণ্ঠে নজরুলের গান স্ফূর্তি পেয়েছিলো তিনি আব্বাসউদ্দীন।

আজকে এই ভাবে বলতে হচ্ছে এই জন্য যে, যদিও পাকিস্তান শব্দটি এখন আর নেই, মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল অর্থ্যাৎ মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে যে অঞ্চলের গোড়াপত্তন হয়েছিলো তা ব্যর্থ হয়ে গেছে বলে আমি মনেকরি না। যদিও পাকিস্তান কনসেপ্ট হিসেবে এখন আর আমরা ভাবিনা। মুসলমানদের নিজস্ব শিক্ষা-সংস্কৃতির যে জায়গা তৈরি হয়েছিলো তা ব্যর্থ হয়ে গেছে সেটাও আমি মনেকরি না।

সেইদিক থেকে নজরুলের যে প্রয়োজনীয়তা তা ভেবে দেখতে হবে। তিনি কেন আমাদের প্রথম কবি, জাতীয় কবি? অন্য কবিকেও তো আমরা জাতীয় কবি বলতে পারি। কিন্তু এই জন্য যে নজরুল মুসলমানদের কবি। তিনি রসূলকে চিনেছেন। যে কবি আমাদের রসূলকে চিনেন না তিনি আমাদের জাতীয় কবি হতে পারেন না। যে আমাদের ধর্মের কিছুই জানেনা তিনিও আমাদের জাতীয় কবি হতে পারেন না।

কারণ আমাদের মুসলমান সত্ত্বা হচ্ছে আমাদের জাতিস্বত্ত্বার সঙ্গে অঙ্গীভূত। যদি এই প্রশ্ন তোলা হয় যে, মুসলমান বেশি না বাঙ্গালি বেশি, কোনটা বেশি কোনটা কম-সেটা অবশ্য তর্কের বিষয়। এক্ষেত্রে শুধু নজরুল-ই নন, ফজলুল হকও আমাদের আদের্শ। তিনি যতোখানি মুসলমান ছিলেন ততোখানি বঙ্গালি, আব্বাসউদ্দীনও তাই। অর্থ্যাৎ একটির সঙ্গে অন্যটি ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত।

যদি নজরুলকে ছুলেছুলে ধরা হয় যে তিনি শুধু প্রেমের কবি, শুধু বিদ্রোহের কবি, তাহলে তাঁর এক রূপ। আর যদি বলি যে না তিনি আমাদের কবি, আমরা যতোটুকু মুসলমান ততোটুকু কবি। নজরুল এমনি কবি যিনি মুসলমান হয়েও সমস্ত হিন্দু ধর্মকেও আত্মসাত করেছিলেন।

নজরুল একমাত্র কবি যিনি হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতিকে এক করতে চেয়েছিলেন। এখানে কোনো সাম্প্রদয়িকতার প্রশ্ন তোলা সঠিক হবেনা। নজরুল ছিলেন এইসবের অনেক উর্ধ্বে।

আমরা যারা কিছুটা সাম্প্রদায়িক, তথাকথিত ধর্মনিরেপেক্ষ, তথাকথিত এইজন্য বলছি-কারণ এইগুলোর কনসেপ্ট এখনো খোলাসা হয়নি। একেক জনের কাছে এক এক রকম, যার সুবিধা যেভাবে। নজরুল এইসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিলেন।
যদি তা না হতেন, তাহলে তিনি প্রমীলাকে বিয়ে করতেন না। এই বিয়েটা তার ভালবাসার জয়গান। প্রমীলাকে তিনি তার ধর্ম পালন করতে দিয়েছিলেন। প্রমীলাও নজরুলকে তার ধর্ম পালন করতে দিয়েছিলেন। সেজন্য তার যে সন্তান হয়েছে তারা হিন্দু না মুসলমান তা নিয়ে সংকট হয়েছে সত্যি কিন্তু কালের বিচারে তা কিছু না।

নজরুল মানবতার পূজারি ছিলেন। মানবতার যে ধর্ম সেটা সত্যের ধর্ম। সে ধর্মকে নজরুল ধারণ করেছেন। এইসব কারণেই নজরুলচর্চা এখনো প্রাসঙ্গিক, তার জীবনদর্শন সব যুগেই সমান ভাবে প্রযোজ্য।

এতোখানি প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান থাকার পরেও সমকালে নজরুলচর্চা যতোখানি প্রবল হওয়ার কথা ছিলো তা হয়নি। নজরুল একাডেমি, নজরুল ইন্সিটিটিউট ছাড়াও নজরুলের নামে রয়েছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠান থাকার পরও নজরুলচর্চা কাঙ্খিত ভাবে হচ্ছে না। ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল-আব্বাসউদ্দীন সেন্টার করেছে, যেখানে আমি কর্মরত।

আমি আশা করছি, এই সেন্টার নজরুলকে পূর্ণাঙ্গ ভাবে তুলে ধরতে ভালো কিছু কাজ করবে। নতুন প্রজন্মের গবেষক, শিক্ষার্থীসহ নজরুলপ্রেমীদের মাঝে কবির পঠন-পাঠন ও গবেষণা ত্বরান্নিত করবে।

বহুমাত্রিক.কম: নজরুলের সাহিত্যকর্ম-সঙ্গীত নিয়ে আন্তর্জাতিক ভাবে যেভাবে আলোচনা-মুল্যায়ন হওয়ার কথা ছিলো সেইভাবে হয়নি, এটি ঠিক কেন?

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: আমিও বিষয়ে একমত, এইজন্য যে নজরুলকে আমরা যে সম্মানের আসনে বসিয়েছি, সে জন্য আমি গর্বিত, আনন্দিত। কিন্তু জাতীয় জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও আমরা অনেক এগিয়ে পিছিয়েছি, পিছিয়ে এগিয়েছি। নজরুলের ক্ষেত্রে আমরা একেবারে বসে আছি তা না। তবে আমরা তাঁকে নিয়ে আর্ন্তজাতিক ভাবে যে পরিমাণে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো, সেটা সেই পরিমাণে হয়নি।

এক্ষেত্রে একটি ভালো কথা উইনস্টন ল্যাংলি নামে পাশ্চাত্যের একজন বড় স্কলার-লেখক রয়েছেন, যিনি নজরুল কে নিয়ে একটি বড় বই লিখেছেন।

আমরা যে বইটি লিখেছি তার নাম হল ‘‘কাজী নজরুল ইসলাম: ম্যান অ্যান্ড পোয়েট”। আমি বলব এটা ইংরেজিতে এক ধরনের নতুন কাজ, যা নজরুলকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার বড় রকমের প্রচেষ্টা । সে প্রচেষ্টার মধ্যে আছে নজরুলের নানা রূপ। তাঁর মধ্যে একটি রূপ খেলা করছে, তা তো নয়! তাঁর অসাম্প্রদায়িক রূপ, মানবদরদী রূপ, বিদ্রোহী রূপ। ঠিক তেমনি তিনি যে একজন প্রেমিক ছিলেন, বিশেষ করে রসুল (সাঃ) এর প্রেমিক ছিলেন, এটা অনেকের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে বলে আমার ধারনা।

Mustafa_Zamanআমি জালাল উদ্দিন রুমি সম্পর্কে পড়াশুনা করেছি। রুমির জন্মের আটশ’ বছর উপলক্ষে যে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় আন্তর্জাতিক ভাবে সেরকম কয়েকটি সম্মেলনে আমার যওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে।

রুমিকে নিয়ে এখন বিশ্ব মেতেছে। বলা হয়েছে যে তিনি এমন একজন কবি, যার মহোত্তম গ্রন্থ মসনবীতে পাওয়া গেছে প্রেমের মূল স্বরূপটি। যদিও কিছু কিছু আমেরিকান স্কলার রসূল (সাঃ) কে বাদ দিয়ে কিছু পাওয়া যায় কিনা, সেরকম বই অনেক রচনা করেছেন।

আটশ’ বছরের শতবার্ষিকীর সম্মিলনে শত শত স্কলার যোগ দিয়েছিলেন, তাদের লেখা বইগুলো আমি সংগ্রহ করেছি। সেখানে আমি গবেষণা নিবন্ধও পাঠ করার সুযোগ পেয়েছি। এসব কিছুর মধ্যে মূল প্রতিপাদ্য যেটি পাওয়া গিয়েছিল তা হচ্ছে রসূল (সাঃ) প্রতি রুমির ভক্তি ও ভালবাসা। সেখানে আমরা দেখেছি যে সমস্ত পৃথিবীতে তারা রুমিকে সনাক্ত করেছিলেন, এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানবকে ভালবেসে ছিলেন।

নজরুলকে আমি সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছি। তার যে মরুভাস্কর- যেটা ছিল রাসুল (সাঃ) জীবনীর প্রথমখণ্ড, যা তিনি পরিপুর্ণ করে যেতে পারেনি নানা কারণে। কারণ তাকে আঘাত করা হয়েছিলো, তার শিরদাড়ায় আঘাত করা হয়েছিলো।
সে দিন থেকেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, সেই তারিখটিও আমি শনাক্ত করতে পেরেছি। এরপর মাত্র কিছু দিন তিনি কথা বলতে পেরেছিলেন। পরে তাঁকে রাঁচীতে, ভিয়েনাসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। যার ফলে তিনি যে দিকে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন সেটা তার হওয়া হয়নি।

নজরুলকে আর্ন্তজাতিক তুলে ধরার কথা প্রসঙ্গে আপনি যে প্রশ্ন করেছেন, আমার বইতে তা লেখার চেষ্টা করেছি। আমি অবশ্যই লিখেছি নজরুলের সঙ্গে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বিশ্বের অন্য যেসব কবিরা রয়েছেন তাদের কথাও আমি লিখেছি। পাবলো নেরুদার কথাও লিখেছি।

বহুমাত্রিক.কম: নজরুল বিশ্বনাগরিক ছিলেন, তাঁর একটি বিশ্বসত্ত্বা রয়েছে, লেখনিতে-সঙ্গীতে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। এমন বিবেচনায় নজরুলকে আন্তর্জাতিক ভাবে তুলে ধরতে কেবল বইপুস্তকেই কেন সীমাবদ্ধ থাকবে তাঁকে তুলে ধরার চেষ্টা? কেন আমরা বিশ্ব সাহিত্য-সঙ্গীতসভায় তাকে উজ্জ্বল ভাবে তুলে ধরতে পারবো না-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সেটাই হচ্ছে আমাদের মননের প্রতি আমাদের প্রশ্ন। প্রশ্ন তো আসলে কাউকে সেভাবে করা যায় না। যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, আপনি মুস্তাফা জামান আব্বাসী, আব্বাসউদ্দীনের ছেলে-আপনি কী করেছেন।
আমি এটার উত্তর নিশ্চয়ই দিতে পারবো-আমি অত্যন্ত অভাজন ব্যক্তি তাঁর (কাজী নজরুল ইসলাম) কোলে বসে গান শেখার সুযোগ পাইনি, এটা আমার একটি আক্ষেপ। কিন্তু আমার সেই অধিকার ছিলো তাঁর কোলে বসে গান শেখার-তাঁর স্নেহচুম্বন পাওয়ার। কিন্তু সেই স্নেহচুম্বন না পাওয়ার প্রতিশোধ আমি নিয়েছি ৩ ভাবে।

একটি হলো, বাংলা ভাষা একটি বড় ভাষা। এই ভাষায় ১শ’ থেকে ২শ’ বড় সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক রয়েছেন। কিন্তু আমার মতো একজন ক্ষুদ্র ব্যক্তি তাঁকে (নজরুল) নিয়ে উপন্যাস রচনা করেছি। উপন্যাসের নাম ‘পুড়িব একাকি’, ৫শ’ পৃষ্ঠার বই। এগুলো উপাদান ইথার থেকে সংগ্রহ করে। উপন্যাসে ব্যবহৃত সমস্ত বাচন সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি এই কারণে যে আমার পিতা ছিলেন তাঁর সবেচ’ নিকটবর্তী।

লেখনিতে আমাকে আমার পিতার সঙ্গে বসিয়েছি। সেখানে সংলাপগুলো বসিয়েছি। নজরুলকে নিয়ে যে ৫শ’টি বই বেরিয়েছে, সেগুলো আমি সংগ্রহ করেছি। আমার কাছে যে সংগ্রহ সেটি নজরুলকে নিয়ে সবচে’ বড় সংগ্রহ বলতে পারি। সে সংগ্রহ সাজিয়ে রাখার জন্য নয়। ইনডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় সেটি আমাকে দিয়েছে, সেখানে নজরুলকে নিয়ে সবচে’ বিরল বইগুলো সংগ্রহ করেছি।

নজরুলকে নিয়ে যে প্রথম উপন্যাস সেটি হচ্ছে ‘পুড়িব একাকী’। আপনারা নিশ্চয়ই এ কবিতাটি পড়েছেন, ‘‘তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না/ সারা দিনমান কোলাহল করি কারো ধ্যান ভাঙ্গিব না/ নিশ্চল নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিধূর ধুপ’’

৩৪ বছর নজরুল নিজেকে নিজে পুড়েছেন। ‘পুড়িব একাকী’ যখন লেখা শেষ করলাম আমি হাজির হলাম হুমায়ুন আহমেদের (প্রয়াত কথাসাহিত্যিক) কাছে। কারণ আমিও ওনাকে সমর্থন করতাম, তিনিও আমাকে সমর্থন করতেন।

হুমায়ুন অভিভূত হলেন, আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বললেন, এটি আমাদের করার কথা, ঔপন্যাসিদের কাজ এটি। তিনি ওনার বইয়ের অন্যতম প্রকাশক অন্যপ্রকাশের মাযহারুল ইসলামকে ডেকে বললেন, বইটি সুন্দর করে ছাপাবে। বইটি ছাপা হয়েছে এবং সব কপি নিঃশেষ হয়ে গেছে। এই বইটি যারা পড়বেন তারা জানবেন, এই বইটি আমি কেন লিখেছি। নজরুলের প্রতি জাতির ঋণশোধ করার জন্য আমি এগিয়ে এসেছি।

এই বইটি যে শ্রেষ্ঠ বই আমি তা বলবো না। বইটিতে আমি সেইসব দুর্লভ প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছি। কবির সঙ্গে সেই কল্লোল যুগের সাহিত্যিকরা এসে বসেছেন তাতে। কবির নিকটবন্ধু যারা-হাতেম আলী নওরোজী এসেছেন, মঈনুদ্দিন এসে বসেছেন। জুলফিকার হায়দার বসেছেন, আব্বাসউদ্দীন বসেছেন। শৈলজানন্দকে নিয়ে এসেছি সেখানে।

ওরা কী বলেন, সেই ডায়ালগ গুলো দিয়েছি। কেন তিনি প্রমীলাকে ভালোবেসে ছিলেন। প্রমীলার কী দেখে তিনি আকৃষ্ঠ হয়েছিলেন? প্রমীলার দুটি বড় বড় চোখ ‘ডাগর নয়ন’। ভালোবাসার সবচে’ বড় স্বাক্ষর হলো আঁখি।
আরো দু’তিন জন মাহিলার সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছিলো কবির, সেগুলো তার গজলে এসেছে। আমি সেসবের বিভিন্ন আঙ্গিক তুলে ধরেছি। জানতে আগ্রহী হয়েছিলেন হিন্দু ধর্মের প্রতি, বন্ধু দীলিপকে বলেছিলেন তুমি আমাকে অরবিন্দের কাছে নিয়ে যাও। কিন্তু তিনি তাকে নেন নি। একজন যোগীর কাছে গিয়েছিলেন নজরুল হিন্দু ধর্মের কিছু বিষয়ে দীক্ষা নিয়েছিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দের ছেলে নরেনের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক ছিলো। এইগুলো অভেদম বলে তিনি ভেবেছিলেন সমস্ত ধর্মের একটি অভেদ করা যায় কিনা। কিন্তু এটা আল্লাহ’র ইচ্ছা না, আল্লাহ’র যদি ইচ্ছা থাকতো তিনিই অভেদম করে দিতেন। আমরা সবাই আলাদা আলাদা।

আপনার চেহারা আলাদা, ধর্ম আলাদা, কৃষ্টি আলাদা, ভাষা আলাদা। এই আলাদার মধ্যে যে ঐক্য-মানবধর্ম, সেই ঐক্যই আল্লাহ পছন্দ করেন। সেই জন্যই নজরুল শেষ পর্যন্ত আল্লাহ’র কাছেই ফিরে এসেছিলেন, যেখান থেকে তাঁর শুরু। চুরুলিয়া-যে গ্রামে তাঁর জন্ম হয়েছিলো। আমার লেখাতে আমি তাই তুলে ধরেছি।

এ উপন্যাসটি নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। হয়তো হবে পরে। যখন গৌতম ঘোষ ছবি করবেন। গৌতম ঘোষ অবশ্য আশ্বাস না দিলেও বলেছেন, দু’একবছর পর তিনি আমার বইটি নিয়ে বসবেন। চ্যানেল আই-এর কর্ণধার আমার পুত্রসম ফরিদুর রেজা সাগরও বলেছেন, আমারা বইটি নিয়ে বসবো এবং সম্ভবত: এ নিয়ে আমরা কাজ করবো।

আমি নজরুলকে যেই ভাবে উপস্থাপন করেছি, সম্ভবতঃ অনেকেই তা করবেন না। বইটিতে আমি নজরুলের সত্যিকারের রূপ-সামগ্রিক রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যেখানে রসূলের প্রতি যেমন ভালোবাসা আছে, আবার অভেদমমের প্রতিও আকর্ষণ আছে। হিন্দু ধর্মের যে নির্যাস তারসঙ্গেও তার একটা সাযুজ্য আছে।

আমি যেটা দেখাবার চেষ্টা করেছি, তা হচ্ছে-নজরুল শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছিলেন রসূলের কাছেই। এই যে তাঁর ৩৪ বছরের নির্বাক জীবন-এটা রসূলের কাছে ফিরে যাওয়ারই সোপান।

বহুমাত্রিক.কম: জীবদ্দশায় অসুস্থ নজরুলকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন আপনি। কী রূপ দেখতে পেয়েছেন তাঁর মাঝে? কম্পিতরূপে তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন বলে আপনি মনে করেন?

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সেই সৌভাগ্য হয়েছে আমার । পূর্বেই বলেছি নজরুল তার শেষ জীবন কাটিয়েছেন আল্লাহ-রসূলের সান্নিধ্যে । জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি বিশৃঙ্খল জীবনযাপন করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরে এসেছিলেন রসূলের কাছেই । এই যে তাঁর ৩৪ বছরের নির্বাক জীবন, এই নির্বাক জীবনটা তিনি কাটিয়েছেন তাঁর স্বজনদের নিয়ে আল্লাহ্‌ রসূলের সান্নিধ্যে । নির্বাক হয়ে যাওয়াটা তাঁর জন্য একটা সোপান ছিল নবীরসুলকে পাওয়ার।

আর নির্বাক নজরুল কম্পিতস্বরে কী বলতে চেয়েছিলেন তা আমার বইতে সেভাবে বলার চেষ্টা করি নি । এই জন্যেই করি নি যে সেটা আমার উত্তরের বাইরে । আমি ওনার সৃষ্টিকর্ম গুলো বিশ্লেষণ করেছি ।

প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটা পর্যায় আসে যখন মানুষ নিশ্চুপ হয়ে যায় । নজরুল যখন সুস্থ্য ছিলেন তখনও তিনি সপ্তাহে একদিন চুপ থাকতেন । দিনটি হলো বৃহস্পতিবার । এটা অনেকেই জানেন না । আর এভাবেই তিনি চেষ্টা করেছেন কি ভাবে নিশ্চুপ হয়ে আল্লাহ’র সান্নিধ্যে যাওয়া যায় ।

কাজী নজরুল ইসলাম আল মানিরের কাছে গিয়েছিলেন । আল মানির হচ্ছেন নাম করা একজন সুফি সাধক । আজমির শরিফের মাইনুদ্দিন চিশতীর সঙ্গেও তাঁর আত্মিক যোগাযোগ ছিলো বলেই আমার ধারণা।
নজরুলের ৩৪ বছরের দীর্ঘ যে নির্বাক জীবন, এর রহস্য নিশ্চয় কেউ না কেউ বের করবেন, কিন্তু আমি সেই ব্যক্তি নই; যে এই বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ করতে পারি। আমি শুধু কল্পনায় আমার পিতার সঙ্গে নজরুলের সংলাপ লেখনিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা (‘পুড়িব একাকী’ গ্রন্থে) করেছি মাত্র, হয়তো সেটা সত্যি হবে।

আমি সেখানে একজন তরুণকে সেখানে নিয়ে এসেছি যার সঙ্গে নজরুলের সংলাপ। ‘পুড়িব একাকী’ বইটি পড়লেই কেবল কেউ এবিষয়ে আমার কাছে জানতে চাইতে পারেন, আপনি কোথা থেকে এইসব সংলাপ এনেছেন। শুধু এইটুকু বলতে চাই, নজরুল একজন অনেক বড় কবি ছিলেন । আমাদের ভাবনা-কল্পনার চেয়েও বিশাল। Mustafa

বহুমাত্রিক.কম: নজরুলের বিশ্ববীক্ষা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই-বিশ্বসাহিত্য প্রবন্ধে নজরুল পৃথিবীকে স্বর্গে রূপান্তরের আকাঙ্খা পোষণ করেছেন-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: নজরুল কেবল টালমাটাল যুদ্ধের সময়ের জন্যই আসেন নি। তিনি এসেছেন আরও পরে, যখন লোকে এ সমস্ত টালমাটাল ভুলে যাবে । যখন মানুষের মধ্যে ছোট ছোট বিভেদগুলো কমে যাবে।
এখন যেমন ইউরোপে আমরা বিসমার্ককে চিনেছি, গারিবোল্দিকে চিনেছি, ১০০ বছর পরে যখন তাদের ইতিহাস জানতে গিয়েছি দেখি কোনো বেড়া(দেয়াল) নেই।

আমি কয়েক মাস আগে স্পেনে, পর্তুগালে গিয়েছিলাম। সেখানে কোনো পাসপোর্টই আমাদের চেক হয়নি। কোনো ভিসাই চেক হয়নি। কেউ আমাদের দিকে তাকায়নি, আমাদের গাড়ি শো শো করে চলে গেছে। এক ইউরো মুদ্রায় ঘুরে এসেছি সমস্ত ইউরোপ।

যখন সব জায়গায় এরকম ছোট ছোট ভেদবুদ্ধি কমে যাবে, তখন দেখা যাবে আমরা আফগানিস্থান থেকে পাকিস্তানে চলে এসেছি। পাকিস্তান থেকে ভারত, ভারত থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছি । বাংলাদেশ থেকে বার্মা চলে গেছি, বার্মা থেকে কুয়ালালামপুর চলে গেছি । এটা হচ্ছে আমাদের স্বপ্নের দেশ। কাজী নজরুল ইসলাম হচ্ছেন সেই স্বপ্নের উদগাতা যিনি ৫শ বছর আগের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা ছিলেন।

এখন যেভাবে আমরা দেখছি একজন কবিকে, যেমন একটু আগেই বলছিলাম রুমির কথা, আটশ বছর পরে যাকে পুরো পৃথিবী নিয়েছেন। জালাউদ্দিন রুমি পুরো পৃথিবীর প্রেমিক । নজরুলও তাই।
পৃথিবীতে হিন্দু-মুসলিম সব মানুষই সমান । সবার রক্তের রঙ-ই লাল । সব এক কিন্তু কোথায় যেন একটা ভিন্নতা । যখন আমরা আলাদা হয়ে যাই–যখন দুই ভাই মুস্তফা জামান আব্বাসী, মোস্তফা কামাল আলাদা হয়ে যাবো তখন কিন্তু এই পরিবার আর এক পরিবার নয় ।

যখন আমরা যুক্তবঙ্গ ছিলাম। ১৯০৫ সালে যখন বঙ্গভঙ্গ হয় তখন মুসলমানরা একে সমর্থন করেছিলেন, কিন্তু কেন ? কারণ আমরা ছিলাম অবহেলিত, আমরা ছিলাম নিচের দিকে, আমারা ছিলাম চাষা, জমিদাররা আমাদের উপর অত্যাচার করেছিলো যার ফলে বঙ্গভঙ্গ হয়।

তখন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেব চেষ্টা করেছিলেন দুই বাংলাকে এক করতে, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।
যদি তা হতো তাহলে আমরা এখন পর্যন্ত যা কিছু অর্জন করেছি এগুলো কি হতো? যদি বলেন হতো তাহলে আপনি ঠিক, যদি বলেন হতো না তা হলেও আপনি ঠিক । এটার বিচার করে আমার কোনও লাভ নেই । কি হতো কি হতো না এটা জেনে আমার কোন দরকার নেই ।

শুধু বলতে চাই, বেড়া দেওয়ার প্রয়োজন আছে, তাই বলে সারা জীবন বেড়া তা তো নয়। যখন তরকারিগুলো বড় হয়ে যায় তখন আর বেড়া দরকার নেই। ইউরোপ কী ভাবে বড় হলো। সমস্ত পৃথিবীর ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে বড় হয়েছে ইউরোপ। আপনি হল্যান্ডে যান, ডেনমার্কে যান, জার্মানিতে যান, ইতালিতে যান-সবখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বঞ্চিত মানুষের ঘাম ঝরানো অর্থসম্পদের অভিশাপ। তারা এখন বড় বড় কথা বলছে। ইউরোপ এখন এমনি হয়ে গেছে, তারা বলছে ধর্মের প্রয়োজন নাই। কয়েকটি দেশ বাদে ইউরোপ এখন ধর্মহীন দেশে পরিণত হয়েছে।

যখন আমাদের আর কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হবে না, যখন আমরা নিজে থেকেই সব কিছু করতে পারবো-তখন আমরা আমাদের গুরুজনদেরকে ভুলে যাব । আল্লাহ্‌ স্বয়ং আল– কোরানে বলেছেন , ‘যখন আমি তোমাদেরকে সকল ধনসম্পদ দিয়ে দেবো তখন তোমরা আর আমাকে চাইবে না’।

যখন বেড়ার প্রয়োজন যখন হবে বেড়া দিতে হবে, প্রয়োজন যখন থাকবে না তখন তা থাকবে না। যখন আমারা শিক্ষিত হয়ে যাবো, আমাদের অন্তরের ঐশ্বর্য যখন অনেক হয়ে যাবে, তখন আরো সুন্দর ভাবে আমরা প্রবাহিত হতে পারবো। এটা আমাদের সবার আশা , আমার পিতারও এই আশা ছিল, নজরুলেরও একই আশা ছিলো । কিন্তু এটাকে সংকীর্ণ ভাবে কেউ যদি দেখেন, তারা ভুল করবেন।

বহুমাত্রিক.কম: নজরুল-আব্বাসউদ্দীন সেন্টারের সম্পর্কে বলুন,

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: ইনডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল-আব্বাস উদ্দীন সেন্টারের উদ্যোগে ‘‘নজরুল ইসলাম: ম্যান অ্যন্ড পোয়েট’’ ও ‘‘আব্বাস উদ্দীন: ম্যান অ্যান্ড মিউজিশিয়ান” রচনায় কাজ করছি। শুরুতে এটি বাংলাতেই প্রকাশ হবে, পরবর্তীতে ইংরেজি সংস্করণ হবে। Abbasi

এছাড়া নিয়মিত জার্নালও প্রকাশ করছি। এই সেন্টারের উদ্যোগে নজরুলের ১২৫ টি বিরাট ছবির প্রদর্শনী করেছি, যা ব্যয়বহুল কাজ। নজরুল একাডেমী যা ৫০ বছরে করতে পারেনি তা আমি এক বছরে করেছি।

বহুমাত্রিক.কম: নজরুল ইন্সটিটিউট, নজরুল একাডেমিসহ নজরুলের নামে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কবির সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গবেষণা ও প্রকাশনার নানা কাজ করছে। কাজ করছে নজরুল সঙ্গীতের প্রসারেও। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নজরুল সঙ্গীতের পরিবেশনায় আগের মতো আবেদন জাগায় না। আন্দোলন সৃষ্টি করে না। বলা যায় প্রকৃত বাণী ও সুরের ব্যত্যয় ঘটছে। এর ব্যর্থতা কার?

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: এই বিষয়ে দ্বিমত হওয়ার সুযোগ তো নেই। একমত পোষণ করি যে, আমরা ব্যর্থ হচ্ছি নজরুল সঙ্গীতকে ধরে রাখতে । নজরুল যখন নির্বাক হয়ে যান তখন থেকে আমরা চেষ্টা করেছি, তাঁর গান রেকর্ডিং করেছি, অনেক কিছুই করেছি কিন্তু সেই দিনটা তো শেষ । অনেক টানাপড়েনের মধ্যে আমারা নজরুলকে পেয়েছি । তখন পশ্চিম বঙ্গেও একটা উত্তাল সময় ছিল এইখানেও উত্তাল সময় ছিল, কাজেই যেভাবে এগুলো সংরক্ষণ করা উচিৎ ছিলো সেভাবে হয়নি।

রবীন্দ্র সঙ্গীতের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হয়েছিলো কারণ রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর মতো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন। তারা তার সৃষ্টিকর্মকে সুরক্ষা দিয়েছেন। ১২৫ বছরে যা কিছু হয়েছে, তার মূল কারণ হচ্ছে বিশ্বভারতী ছিলো বলে। কিন্তু নজরুলের গান-সৃষ্টিকর্ম তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো।

নজরুল সঙ্গীত গাইতে হলে কণ্ঠটি খাসা হতে হবে । কণ্ঠশীলন যে করবে না নজরুলের গান তার জন্য নয় । নজরুলের গান হচ্ছে রাগ সর্বস্ব । নজরুলের গান গাইতে হলে রাগ সঙ্গীত শিখতে হবে । তার বেশিভাগ গানই হচ্ছে রাগসর্বস্ব । উনি নিজে গান শিখেছিলেন উস্তাদ জহির উদ্দীন খানের কাছে । আমার আব্বা ও শিখেছলেন তাঁর কাছ থেকে।

যে কথাটি জোর দিয়ে বলতে চাই-তা হচ্ছে, বেজড শিখতে হবে। শচীন দেব বর্মণ, নিলুফার, ফেরদৌসী রহমান-গান কেন ভালো লেগেছিলো, কারণ তারা রাগ বেজড ছিলেন। এখন কিছু অনুষ্ঠান হচ্ছে-বাংলাদেশ খোঁজছে ইত্যাদি শিরোনামে। আসলে বিষয়টি তা নয়। ওই রেশ একদিন দুদিন থাকে কিন্তু স্থায়ী হয় না। এখন কথা হচ্ছে, শুদ্ধ সঙ্গীতের চর্চা হলে শুদ্ধ নজরুল ফিরে আসবে। যেসব বাচ্চারা গান শিখছে, তারা যদি নিশ্চিত ভাবে রাগ না শিখে তা হলে নিশ্চিত ভাবে গান শিখতে পারবে না।

বহুমাত্রিক.কম: প্রচারমাধ্যমের কী ভূমিকা রয়েছে এক্ষত্রে?

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: প্রচার মাধ্যম তো ফিনিস প্রোডাক্ট প্রচার করবে। আপনি রুনা লায়লা-ফেরদৌসী রহমান হয়ে গেছেন, মিডিয়া আপনাকে দেখাবে। আপনি গান শিখছেন সেটা মিডিয়ার দেখানোর বিষয় নয়।
যখন আপনি কোনো কাগজবের করবেন, সেখানে নবীনদের জন্য সাহিত্যপাতা বলে কিছু নেই। যে লিখতে পারবে, সেই লিখবে।

রুনা লায়লার গান ১০ লাখে শুনতে চায়, কারো টা তো ১০০ টাকতাতেও শুনতে চায় না। ২০টি রেডিও ২০টি টিভি চ্যানেল ২০টি করে গানের স্কুল খুলুক, খুললে আমি খুশি হবো কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়। তারা যদি একটি করে কনফারেন্স করে তা ভালো। প্রচার মাধ্যম ফিনিস প্রোডাক্ট দেখাবে এটাই স্বাভাবিক।

মাছরাঙা টেলিভিশন ও বেঙ্গল ফাউণ্ডেশন মিলে সেরকম আয়োজন করেছে অজয় চক্রবর্তীর সহযোগীতায়। কেউ কেউ বলছে, তাহলে তো আমাদের ভাত মারা যাচ্ছে। কলকাতার সব শিল্পীরা যদি এখানে এসে বসে থাকে তাহলে আমাদের শিল্পীরা মারা যাবে। এটি একটি পয়েন্ট, পয়েন্টলেস নয়।

আবার আমাদের বেস্ট আর্টিস্টরা যদি কলকাতার মার্কেট দখল করে, তাহলে ওরা কাঁদবে। রথীন্দ্রনাথ, মোস্তফা জামান আব্বাসীরা যদি কলকাতার সব অনুষ্ঠানে গান গেয়ে যায়, টাকা যদিও না নেয় তবুও তারা কাঁদবে।
সর্বোপরি যেটি বলছি, নজরুলের গানের যে বৈচিত্র্য আছে, তার দিকে তাকাতে হবে। এতো বৈচিত্র্য কিন্তু অন্য কোথাও নেই।

নজরুল সঙ্গীত হচ্ছে বাংলা সঙ্গীতের অণুবিশ্ব। আমার বইতেও আমি লিখেছি, একমাত্র আমির খসরুর পরে বিগত চারশ’ বছরে বাংলা সঙ্গীতের বেস্ট কম্পোজার যদি কেউ থাকেন তিনি কাজী নজরুল ইসলাম।

অন্যদিকে, বিকৃতির শিকার এই জন্য যে যখন কম বুদ্ধির লোক দায়িত্বে আসবে তখনি এমনটা ঘটে। নজরুল সঙ্গীতের শিল্পী হতে হলে তাঁর গান জানতে হবে। জানতে হবে তাঁর গান কী ভাবে কোন রাগ থেকে এসেছে। আঙুরবালা থেকে থেকে বিখ্যাত সব শিল্পী-যারা নজরুল সঙ্গীত করেছেন, তাদের স্বরলিপি গুলো দেখতে হবে। এখন যারা গান করছেন, তারা দ্রুত শিল্পী হতে চান, স্বরলিপি দেখতে চান না। এভাবে তো শুদ্ধ সঙ্গীতের চর্চা হবে না।

তবে আশার কথা হচ্ছে, যারা সত্যিকারের গান শুনতে চাইবেন, তারা বার বার আব্বাসউদ্দীনের, শচীন দেববর্মদের রেকর্ড খোঁজে বের করবেন। আমার বইতেও আমি তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে, কখন কোন গান রেকর্ড হয়েছে, কারা গেয়েছেন।

বহুমাত্রিক.কম: নজরুল সঙ্গীতের একটি নিজস্ব স্টাইল আছে। প্রয়াত সোহরাব হোসেনের কণ্ঠে আমরা সে রকমটা দেখতে পেতাম- এখন এরকমটা খোঁজে পাওয়া দুষ্কর-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: নিশ্চয়ই নজরুলগীতির একটি নিজস্ব ঢঙ রয়েছে। নজরুলগীতির যে কয়েকজন ভালো শিল্পী রয়েছেন, তাদের রেকর্ড, তাদের স্টাইল রয়েছে। এখন যারা নজরুল সঙ্গীত শিখতে চান তাদের উচিত সেগুলো রপ্ত করা, যদি তাদের কোনো নিজস্ব স্টাইল থাকে সে অন্য কথা।

এক্ষেত্রে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে চাই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২৫ জন্মবার্ষিকী যখন হলো, তখন অজয় চত্রবর্তী একটি রেকর্ড করলেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের। সেটি যারা শুনেছেন তারা বলতে পারবেন, তাঁর গলা হচ্ছে চার সপ্তকের। বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে যারা গাইছেন, অনেক কষ্টে তারা দুই আড়াই সপ্তক পর্যন্ত পৌছাতে পারেন। অজয় চক্রবর্তী গাইলেন চার সপ্তকে ‘‘সুদূর তুমি বাজাও ব্যাকুল বাঁশের বাঁশরি’’। এটা আর কেউ গাইতে পারবেন না।

আমি রবীন্দ্র সঙ্গীতের চর্চা করেছি। আমি ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক কনফরেন্সের প্রেসিডেন্ট ছিলাম ঢাকা চ্যাপ্টারের। ৫০টি বই আমি লিখেছি, একেটার একেক দিক। ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক এরিণাতে নজরুলের অনুপ্রবেশকিভাবে হবে সেটিও আমি আমার বইতে একটি চার্ট করে দিয়েছি।

খলিল জিবরান নামে একজন নামকরা লেখক ছিলেন, যার প্রধান সৃষ্টি হচ্ছে-প্রফেট। আর জালালউদ্দীন রুমির মসনবী। এগুলো নিয়ে এখন বিশ্ব মেতেছে। বিশ্বে ১শ কোটি মুসলমান রয়েছে। নজরুলেরও মূল হচ্ছে রসুলের প্রেম। কবির ৪ শতাধিক হামদ ও নাত রয়েছে। যেগুলো নিয়ে পুরো বিশ্বে যাওয়া যায়। বিশ্ব মুসলিম তাকে নিয়ে নিশ্চয়ই আগ্রহী হবেন।

আরো কথা হচ্ছে, নজরুলের এই যে ৪শ’ হামদ-নাত তার আবার ভিন্ন ভিন্ন ঢঙ। এগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি।
আমি যখন আন্তর্জাতিক সঙ্গীত সম্মিলনীতে গিয়ে পেপার পড়েছি, সেখানে আমি বলার চেষ্টা করেছি, জালাল উদ্দিন রুমি যেভাবে রসুলকে দেখেছেন, নজরুলও কম নন। আমি সেটি দেখিয়েছি বিশ্ব পরিমণ্ডলে।

জালাল উদ্দিন রুমির মসনবী, খলিল জিবরানের প্রফেট বিশ্বে কে না পড়েছে। আমি চাই, নজরুলকে যদি আমরা অনুবাদ করে সবার কাছে নিয়ে যেতে পারি।

যার যেখানে যেটা দরকার। যেমন মুসলমানদের কাছে নজরুলের রসুল সম্পর্কিত সৃষ্টি যেমন নিয়ে যেতে পারি, তেমনি যারা বিগ্রহের কথা শুনতে চাই, সেখানে নজরুলের বিগ্রহের স্পিরিট নিয়ে যেতে পারি। ভালোবাসার যে জয়গান তিনি গেয়েছেন, সেটা আমরা তুলে ধরতে পারি।

এরকম অসংখ্য কাজ করতে হবে। একা কেউ পারবেন না। রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ যেমন ৫ শ’ জন করেছেন। ইংরেজি, জার্মানি, জাপান, ফ্রেঞ্চ-সব ভাষায় রবীন্দ্রনাথ অনূদিত। নজরুল মাত্র ২/৩টি ভাষায় অনূদিত।
আমাদের উচিত হবে প্রথমে নজরুলকে ভালোবাসা। আমাদের টেলিভিশনসমূহে নজরুল অপাক্তেয়। আপনি যদি আওয়ার হিসেবে করেন, কতক্ষণ নজরুলের জন্য আর অন্য কবির জন্য কতক্ষণ। অন্য কবিকেও আনেন, তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু আমাদের কবির জন্য কতক্ষণ। তার কোন দিকগুলো তুলে ধরছি, এটা একটি প্রশ্ন।

আমাদের কথা যদি আমরা না বলি তাহলে কে বলবে। আমি আব্বাসউদ্দীনের সন্তান। তাকে নিয়ে ২০টি বই হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তারা আমার বাবাকে নিয়ে ১০টি বই লিখেছে। নজরুলকে নিয়ে আমরা ৪০০ বই লিখেছি। পশ্চিম বঙ্গে ১০০ বই লিখিত হয়েছে। এতে বোঝা যায় তিনি আমাদের। আমাদের-তোমাদের ব্যাপারটা এসেই যাবে।
আমাদের উচিত নজরুলের প্রতি আরো পরিপূর্ণ দৃষ্টি দেওয়া।

বহুমাত্রিক.কম: নজরুলকে নিয়ে লেখা ‘পুড়িব একাকী’ উপন্যাস নিয়ে আপনার অভিব্যক্তি জানতে চাই-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: নজরুল নিয়ে লিখতে যেয়ে আমি কেঁদেছি আর কেঁদেছি। আমি কোনো কথা মিথ্যে লিখি নি তাঁর সম্পর্কে। নজরুল-প্রমীলার যে সংলাপ তা নিয়ে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন না। আমার লেখাতে আমি লিখেছি, সবার আগে শেফালি নামের এক মেয়েকে নজরুল ভালোবেসে ছিলেন, কেউই হয়তো বিষয়টি জানেন না। কিভাবে প্রমীলাকে ভালোবেসে ছিলেন, কিভাবে নার্গিসকে ভালোবেসে ছিলেন এবং লিখেছি ফজিলাতুন্নেছা নামের এক নারীর কথাও।

আমার আব্বার সঙ্গে নজরুলের যে সম্পর্ক তা অনেকেই জানেন না। নজরুল যদি কুচবিহার থেকে আব্বাকে কলকাতায় নিয়ে না আসতেন তাহলে আব্বাসউদ্দীন নামে কাউকে মানুষ চিনতেন না। আব্বা যখন মৃত্যুশয্যায় তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, বাবা তুমি জানো আমার শরীরের প্রতিটি লোমকোপ তাঁর (নজরুল) কাছে ঋণী।

নজরুলের কাছে আমার বাবার ঋণ আমি শোধ করছি। সেজন্যই কেউ আমার লেখাতে নজরুলের বিরুদ্ধে একটি শব্দও কে বের করতে পারবে না। আমি তো তাঁর পুত্রের মতো। আমি কী তাঁর ক্রিটিক হতে পারি।
মোতাহার হোসেন-নজরুল দুজনই এক সঙ্গে ফজিলাতুন্নেছার প্রেমে পড়েছেন। বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক নিয়েও অনেক মজা করেছি। যিনি এই বইটি পড়বেন, তিনি আমার সঙ্গে একাত্ম হবেন।
আমার বাবাকে নিয়ে এরপর যে বইটি আমি লিখবো তা নজরুলের গ্রামে গিয়ে লিখবো।

বহুমাত্রিক.কম: কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাস উদ্দীন আহমদ। এই দুই কালপুরুষের যুগসূত্রকে কী ভাবে ব্যাখা করবেন।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দীন আহমেদ বাঙালি মুসলিম জাগরনের অগ্রদূত। তাঁদের যুগ্ম ভূমিকা জাতি ভুলবে কেমন করে? পিছিয়ে পড়া ঘুমিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমান বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে জেগে উঠেছিলেন যে দু’জনের হাত ধরে, তার প্রথম কবিকণ্ঠ কাজী নজরুল, প্রথম গীতকণ্ঠ আববাসউদ্দিন।

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’। গেয়েছিলেন আববাসউদ্দিন তার দরদী কণ্ঠে। সেই গান সবার কানে চিরদিনের জন্যে অক্ষয় হয়ে রয়েছে। চারশত হামদ ও নাত লিখেছেন নজরুল। গেয়েছেন : আববাসউদ্দিন, কে. মল্লিক , বেদারউদ্দিন, গিরীন চক্রবর্তী, ধীরেন দাশ, আরও শত শিল্পী। অথচ সে গানগুলোকে আমরা অনায়াসে অবহেলা করলাম, এই বলে যে আল্লাহ্‌ ও রসুলকে পরিত্যাগ করলেও চলবে, আধুনিকতাকে পরিত্যাগ করা যাবে না। তারা বুঝলেন না,

Zamanআধুনিকতার উপাদান একমাত্র আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসুল। নজরুল আমাদের জাতীয় কবি এই কারণে যে তিনি আল্লাহ্‌ ও রসুলকে চিনেছেন। তা না হলে শত প্রেমের কবিতাও কাজে আসত না। আববাসউদ্দিন-এর ক্ষেত্রেও তাই। তিনি এ দেশের প্রথম জাতীয় কণ্ঠশিল্পী। তার স্বীকৃতি জাতি দিয়েছে, সরকারের প্রয়োজন হয়নি।

আজ না হোক কাল, এ স্বীকৃতি তাকে দিতেই হবে। হয়ত একশ’ বছর পরে, তাহলেও দিতে হবে। এই জমিনে যতদিন মুসলমান বাস করবে, ততদিন তারা আববাসউদ্দিনকে এই স্বীকৃতি দেবেই। নজরুল ও আববাসউদ্দিন বাঙালির জন্যে অপরিহার্য। কে না জানে, বাঁচতে হলে প্রতিদিনের নিঃশ্বাসে প্রয়োজন আল্লাহ্‌ ও রসুল।”

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।