Bahumatrik Logo
১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ণ

বাংলার সাধুগুরুদের গানের ধারা

জ্ঞান চর্চার ঐতিহ্যিক পরম্পরা


২৬ মার্চ ২০১৪ বুধবার, ০৭:২০  পিএম

সাইমন জাকারিয়া

বহুমাত্রিক.কম


জ্ঞান চর্চার ঐতিহ্যিক পরম্পরা

ঢাকা (প্রথম পর্ব): এখানে সাধুগুরু হিসেবে যাদের পরিচয় দিতে চাইছি-তাঁরা হলেন প্রাচীন বাংলার চর্যাসংস্কৃতির চর্চাকারী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের উত্তরাধিকার, মধ্যযুগের জ্ঞানসাধক পরিম-লের যোগী তথা নাথসাধকদের উত্তরাধিকার। 

এমনকি তাঁরা সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত বিস্তৃত ‘লৌকিক ইসলাম’ তথা সুফিসাধক ও বৈষ্ণব মোহন্তদের উত্তরাধিকার। সামাজিক পরিচয়ে কোথাও  তাঁদের উপাধি বা বিশেষণ জুটেছে ‘বাউল’ নামে, কোথাও ‘ফকির’ নামে, কোথাও ‘পাগল’, ‘ক্ষ্যাপা,  ‘পীর,  ‘মুরশিদ, ‘সাধু, ‘সাধক, ‘গুরু  ইত্যাদি নামে। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত পণ্ডিতদের অধিকাংশ গবেষণাকর্মে   ‘বাউল’ নামটি বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু সাধক পরিমণ্ডলে ‘সাধুগুরু’ শব্দবন্ধটি অধিক প্রচলিত। তাই এখানে আমরা ‘সাধুগুরু’ শব্দবন্ধটি গ্রহণ করেছি।

বাংলার সাধুগুরুরা বিশ্বাস করেন-মানব জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অন্তত তিনজন গুরুর প্রয়োজন পড়ে, যার মধ্যে প্রথমজন হন- ‘শিক্ষা গুরু’,’ দ্বিতীয়জন’ ‘দীক্ষা গুরু’ আর তৃতীয়জন হন- ‘ভাবের গুরু’।  অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধনসঙ্গিনীকে চতুর্থ গুরু তথা ‘চেতন গুরু’ বলে উল্লেখ করে থাকেন।  গুরু পরম্পরার এই সিঁড়ি ভিন্ন সাধুগুরুরা জ্ঞানের পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারেন না, তাই সম্ভবত বলা হয়ে থাকে-
“গুরু কর শত শত মন্ত্র কর সার
যে ঘোচাবে মনের আন্ধার দোহাই দাও তার ॥”১

সাধুগুরুদের এই গুরুপরম্পরার জ্ঞান চর্চার ঐতিহ্য সুদূর অতীত চর্যার কাল থেকে চলে আসছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। একদিকে গুরুপরম্পরা ঐতিহ্য, অন্যদিকে সাধুসঙ্গ ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণের ব্যাপারে সাধুগুরুরা উদার দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী। এ সম্পর্কে জানা যায় যে, “নবী হজরত মহাম্মদ আল্লার সঙ্গে মে’রাজ মিলনে নব্বই হাজার জ্ঞানমূলক বাক্য পেয়েছিলেন। তার তিরিশ হাজার সর্বজনের জন্য কোরাণে লিপিবদ্ধ; তিরিশ হাজার যোগ্য শিষ্যদের জানিয়েছিলেন; বাকি তিরিশ হাজার তার ‘সিনায়’ (হৃদয়ে) ছিল।

এগুলো নবীর নূরে জাত সাধু-ফকিরদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এ সমাজে গুরু শিষ্যের এক কানে মন্ত্র দেন অন্য কানটি ফাঁকা রাখেন; মানুষের কাছ থেকে, সাধুসঙ্গ করে ছড়িয়ে থাকা গুপ্ত জ্ঞান সংগ্রহ করে শিষ্যবর্গ।”২ মৌলবাদী অন্ধতা ও অনড় সাম্প্রদায়িকতা এ কারণেই সাধুগুরুদের মতবাদে নেই। জ্ঞানরাজ্যে তাঁর সদা অপূর্ণতা, যে কোনো মানুষের কাছ থেকে সে সংগ্রহে ও গ্রহণে প্রস্তুত। এমনই উদার ও যুক্তিনিষ্ঠ অবস্থানে দাঁড়িয়ে তাই তো খুব নিশ্চিতে নেত্রকোনার জালাল উদ্দিন খাঁ স্পষ্ট করেই গাইতে পারেন-
“মানুষ থুইয়া খোদা ভজ, এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে
মানুষ ভজ কোরান খোঁজ, পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে ॥”৩

এই গানের ভেতর দিয়ে যে মেরাজে আল্লাহ-নবীর সেই মহামিলন এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান আবার লোকসমাজের ভেতর থেকে আরহণ করারই ইঙ্গিত রয়েছে।
এবারে সাধুগুরুদের জ্ঞান চর্চার অন্যতম আশ্রয় সাধুসঙ্গ সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক। কেননা, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সাধুগুরুই তাদের আখড়াবাড়িতে একটি করে সাধুসঙ্গের আয়োজন করে থাকেন।

সাধুসঙ্গ মূলত এক ধরনের সাধু সমাবেশ বা সাধুদের মিলনক্ষেত্র। সাধুসঙ্গে সাধারণত সাধুগুরুদের রচিত গানের চর্চা যেমন প্রত্যক্ষ করা যায়, তেমনি তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিত্রও প্রত্যক্ষ করা যায়। সাধুগুরুরা সাধুসঙ্গে একত্রিত হলে শিষ্যভক্তদের মধ্যে পারষ্পারিক প্রেম ও ভক্তি ভাব সৃষ্টি হয়। সাধুসঙ্গে শিষ্যদের পাশাপাশি গুরুরা মিলিতভাবে তাঁদের সাধনার অনুসঙ্গ বিভিন্ন পর্বের গান পরিবেশন করেন এবং গানের অন্তর্নিহিত অর্থের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ তাতে নির্দেশিত জীবনপদ্ধতির প্রতি শিষ্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ পর্যায়ে লালনপন্থী সাধুগুরুদের সাধুসঙ্গ হতে প্রাপ্ত দুটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছি।

সাধুসঙ্গে লালন সাঁইজির গানের পাঠ
লালনপন্থী ফকির-সাধুদের সাধনার একটি অনিবার্য ও আবশ্যিক অঙ্গ হলো সাধুসঙ্গ। সাধুসঙ্গে লালনপন্থী সাধুগুরুরা একত্রিত সাঁইজির নির্দেশনাগুলো পালন করেন, গান করেন এবং গুরু-শিষ্যের মধ্যে সেবা গ্রহণ-প্রদান, গুরুকর্ম ইত্যাদি অনুষঙ্গ থাকে। প্রতিটি গুরুর বাড়িতে বাৎসরিক সাধুসঙ্গের আয়োজন হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিষ্যরাও গুরুর সম্মানে সাধুসঙ্গ করেন।

গত প্রায় বিশ বছর ধরে সে রকম সাধুসঙ্গে ঘুরি ফিরি। সাধু-গুরুদের গান শুনি। সাধুরা বলেন-যে গানে চেতনার বোধন ঘটে না তা কোনো গান নয়, আর গানকে তাঁরা যেভাবে দেখেন, গেয়ে থাকেন, এমনকি গানের বিবেচনা করে থাকেন, তাতে আমার খুব মনে হয়-‘গান’শব্দটিকে সাধু-গুরুরা আসলে ‘জ্ঞানে’র আঞ্চলিক ও প্রতীকায়িত শব্দ বলেই মনে করেন। সাধু-গুরুদের ভাষ্য অনুযায়ী গানের আরেক নাম ‘কালাম’, যেমন- লালন সাঁইজির গানকে তাঁরা বলেন- ‘সাঁইজির কালাম’ অর্থাৎ সাঁইজির দিকনির্দেশনা বলে থাকেন। সাধুসঙ্গে ঘুরে ফিরে বুঝি সাঁইজির যে দিকনির্দেশনায় যখনকার কথা বলা হয়েছে তখনই তা গাইতে হয়, যেমন- গোষ্ঠলীলার গানকে সকালেই গাইতে শুনেছি, আবার রাসলীলার গানকে কখনোই রাতে গাইতেও শুনিনি।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামে যে মাটিতে লালন সাঁইজি শায়িত- সেখানকার শিশু থেকে সাধারণ পর্যন্ত সবাই একটা কথা জানে ও মানে- ‘রাতে গোষ্ঠ দিনে রাস যে গাই তার সর্বনাশ।’

এমন সুসঙ্গবদ্ধ নিয়মের কারণে সাঁইজির গানের বাণীকে যখন তখন গাইতে শোনা যায় না। তাই সাঁইজি দিকনির্দেশনামূলক বহু গানই সাধারণ শ্রোতাদের শ্রুতির অগোচরেই থেকে যায়, কেননা তা সময়ের বিধান মেনে সুনির্দিষ্ট সময়েই গীত হয় এবং তা সচারাচার সাধুসঙ্গেই গীত হয়। আজ আমরা সে আলোচনায় যাচ্ছি না, আজ শুধু একটা বিষয়ের অবতারণা করছি, তা হলো সাধুসঙ্গে লালন সাঁইজির গানের পাঠ নিয়ে।

সাধু-গুরুদের গান তো মৌখিক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। অধিকাংশক্ষেত্রে তার লিখিত পাঠ পাওয়া ভার, ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু গানের বাণীর লিখিত পাঠ পাওয়া যায়, এক্ষেত্রেও সমস্যা হয় একই গানের একাধিক লিখিত পাঠ পেলে, আবার লিখিত পাঠ প্রথমবার আবি®কৃত হবার পর আকষ্মিকভাবে তা হারিয়ে গেলে এবং কোনো হারানো লিখিত পাঠ নতুনভাবে পুনরায় আবি®কৃত হলে, কিংবা লিখিত পাঠের সঙ্গে সাধু-ভক্তদের গাওয়া বা শহুরে শিক্ষিত শিল্পীদের গাওয়া পাঠের মিল-অমিল নিয়েও কখনও কখনও বির্তক ওঠে।

বহু দিন ধরেই দেখে আসছি, সাধু-গুরুদের গানের পাঠ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষক, এমনকি শিল্পীদের মধ্যেও গবেষণা, বির্তক বা ঝগড়া-ঝাটির অন্ত নেই। অথচ, এই ঝগড়া-ঝাটি ও বির্তকের মধ্যে কখনোই প্রায় আলোচনা হতে দেখিনি-গবেষকদের মতো গানের বাণীর পাঠ নিয়ে বির্তক কিন্তু সাধু-গুরুদের সাধুসঙ্গেও নিত্যই হয়ে থাকে। যেখানে গুরুর উপস্থিতিতে শিষ্য গান পরিবেশন করেন সেখানে শিষ্যকে যেমন গানের উত্তর ব্যাখ্যান করতে হয় তেমনি গানের পাঠের ভিন্নতা নিয়েও জবাব দিতে হয়।

বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, দৌলতপুর, খলিসাকু-, মিরপুর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা অঞ্চলে সাধুসঙ্গে গিয়ে লালন সাঁইজির বিভিন্ন গানের বাণীর পাঠ নিয়ে সাধু-গুরুদের বির্তক দেখার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে।

আজকের আলোচনায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখ চুয়াডাঙ্গা জেলার বেলগাছি ইউনিয়নের অন্তর্গত ফরিদপুর গ্রামে রইসউদ্দিন শাহ’র বাড়িতে অনুষ্ঠিত একটি সাধুসঙ্গে কীভাবে লালন সাঁইজির একটি গানের পাঠ নিয়ে বির্তক উঠেছিল তা উপস্থাপন করছি।

সে সাধুসঙ্গে পূর্ণসেবার আগে গানের অনুষ্ঠানে শব্দগান বা ভাবগানের শিল্পী সানোয়ার হোসেন (২৭) তাঁর ভাঙা দোতরা বাজিয়ে বেশ সুরেলাকণ্ঠে লালন সাঁইজির যে গানটি গাইলেন, তা হলোÑ
“জাত গেল জাত গেল বলে
একি আজব কারখানা
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সব দেখি তা না না না ॥

যখন তুমি ভবে এলে
তখন তুমি কী জাত ছিলে
যাবার বেলায় কী জাত নিলে
এ-কথাটি বলো না ॥

ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল চামার-মুচি
একই জলে সব হয় শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি
যমে তো কাউকে ছাড়বে না ॥

গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়
লালন বলে জাত কারে কয়
এই ভ্রমও তো গেল না ॥”

গানটি গাওয়া শেষ হতেই সাধুসঙ্গে উপস্থিত বাউলগুরু দিদার শাহ (৮৪) বললেন- “গান তো ভালই গাইলে, কিন্তু কথা হলো-ওইখানে কি বললেন-‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি! এটা কি ঠিক?”
সানোয়ার উত্তর করলো,  “আপনারা আমাদের গুরুজন। আমরা যেটা শুনেছি তাই গেয়েছি। ভুল হলে শুধরে দেবার জন্যে আপনাদের মুখ চেয়ে আছি।”

দিদার শাহ বললেন,“সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’ এটা বলার অধিকার তোমার কে দিয়েছে! দুনিয়ায় কতজন সত্য কাজে রাজি আছে। আর তুমি বলছো ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’। সাঁইজি দুনিয়ার লোককে নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না, আমাদের জানার বাইরে বহু লোক আছে যারা সত্য কাজে রাজি আছে। আসলে কথাটা হবে ‘সত্য কাজে মন নয় রাজি’। আমার মন রাজি নেই, অনেকের মনও হয়তো রাজি নেই, তাই কথাটা হওয়া উচিত ‘সত্য কাজে মন নয় রাজি/সব দেখি তা না না না।’ আর একটা কথা বললেÑ ‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়’। এ কথাটাও ঠিক নেই। কারণ, কি জানো?”
সানোয়ার মন্ত্রমুগ্ধের মতো গুরু দিদার শাহের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘কি গুরু?’ (চলবে)

সাইমন জাকারিয়া সম্পর্কে:

বাংলাদেশের সংগীত, নাটক, নৃত্য, কৃত্য ইত্যাদি বিষয়ক সাংস্কৃতিক গবেষণায় নতুন কিংবদন্তীর জন্ম দিয়েছেন। বর্তমানে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো-র ভিজিটিং স্কলার। বক্তৃতা প্রদান করেছেন শিকাগো ও ওয়াসিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাথনোমিউজিকোলজি বিভাগে। অর্জন করেছেন-সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১২, প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার ১৪১৫, কালি ও কলম-এইচএসবিসি তরুণ লেখক পুরস্কার ২০০৮ ও বাংলাদেশ টেলিভিশন দর্শক ফোরাম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার পদক ২০০৪।

সাইমন জাকারিয়া পেশাগত জীবনে বিগত নয় বছর ধরে বাংলা একাডেমীর সাথে যুক্ত। বাংলা একাডেমীতে তিনি প্রথমে পান্ডুলিপি সম্পাদক পদে এবং বর্তমানে সহপরিচালক পদে কর্মরত।
জন্ম : ৩ ডিসেম্বর ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার জুঙ্গলি গ্রামে।

বাংলাদেশ সময়: ১২১১ ঘণ্টা, মার্চ ২৬, ২০১৪ 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।