Bahumatrik Logo
২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৮:৪১ অপরাহ্ণ

চুকনগর গণহত্যা দিবসে ১০ হাজার মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের কর্মসূচি


১৯ মে ২০১৬ বৃহস্পতিবার, ০৫:১৭  পিএম

শেখ হেদায়েতুল্লাহ, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


চুকনগর গণহত্যা দিবসে ১০ হাজার মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের কর্মসূচি
ছবি-বহুমাত্রিক.কম

খুলনা : ২০ মে বেদনাবিদূর চুকনগর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১’র এইদিনে খুলনার চুকনগরে ঘটে নারকীয় হত্যাকান্ড। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিরক্ষা পরিষদ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ২০ মে শুক্রবার গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভে সন্ধ্যা ৬টায় ১০ হাজার মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হবে। এছাড়া অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

চুকনগর ছিল প্রকৃতপক্ষে পলায়নপর মানুষের ট্রানজিট। খুলনা-যশোর-সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী ভদ্রা নদীর কোলঘেঁষা চুকনগরেই হাজার হাজার পরিবার মে মাসের ১৯ তারিখে রাত কাটায়। পরদিন (২০ মে) সকালে ঘটে নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞ।

খুলনা জেলার তৎকালীন ডুমুরিয়া থানাধীন এই চুকনগরেই পরদিন ২০ মে ঘটেছিল সম্ভবতঃ পৃথিবীর ইতিহাসে একক বৃহত্তম নর হত্যাযজ্ঞ। বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ শুরু হওয়া এই বর্বরতম হত্যাকান্ডটি ঘটে প্রায় সন্ধ্যা অবধি। গুলি-বেয়নেটের আঘাত ও নদীপথে নৌকাযোগে পলায়নরত নর-নারী-শিশুর সলিল সমাধিতে কতো মানুষের যে মৃত্যু হয়েছে তার সঠিক হিসাব কেউ বলতে পারে না।

একাত্তরের ২০ মে চুকনগরের গণহত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা আজও সেই যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন। স্বজন হারানোর ব্যথা তাঁদের বুকেই চেপে আছে। এই দিনটি এলে তাঁরা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। ঘৃণায় বুক বেঁকে ওঠে। পাকি হায়েনাদের গালি দেন।

জানা যায়, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, বাগেরহাট, পিরোজপুর, মংলা, মোড়েলগঞ্জ প্রভৃতি এলাকা থেকে প্রাণভয়ে পালানো ভীতসন্ত্রস্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা বেশীরভাগ নদীপথে নৌকাযোগে, কেউ সড়ক পথে ছুটছিল ভারতের দিকে। একারণে এখানকার হত্যাযজ্ঞে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরাই শহীদি মৃত্যুর শিকার হন। সেদিনের চুকনগর আর আজকের চুকনগর থেকে অনেক পার্থক্য। তখন তিনদিকে ছিল নদী। নদীপথেই আসা মানুষেরা এখানকার পাতাখোলা বিলসহ গোটা এলাকায় বিশ্রাম নেয়। নদীর পাশে ছিল মন্দির। তার পাশে ছিল বিশাল বটগাছ। পাশে বাজার। গোটা এলাকা জুড়েই ছিল মানুষ।

পাকি সেনাদের ওপর তেড়ে যাওয়া চুকনগরের চিকন মোড়লকে হত্যা করে এখানকার হত্যাযজ্ঞ শুরু। শহীদের ছেলে এরশাদ আলী মোড়ল আজও সেইদিনের কথা মনে হলে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

তিনি বলেন, ‘ওরা (পাকি সেনারা) মানুষ না, মানুষ কোনদিন মানুষরি এইভাবে মারতি পারে! জানের (প্রাণের) মায়ায় যারা পালায় যাচ্ছিল, সেই সব মানুষরি ওরা পাখির মত গুলি কইরে মারলো। গাছে চইড়ে (উঠে) , পানিতি নাইমে মানুষ বাঁচতি পারিনি।’

আজ দীর্ঘ বছর পর হলেও সেই অত্যাচারী, হত্যাকারী, ধর্ষণকারীদের বিচার হচ্ছে। শাস্তি হচ্ছে তাই মৃত্যুও আগে মনে শান্তি ফিরে পাচ্ছি-বলেন এরশাদ আলী মোড়ল। 

সেই সময়ের কিশোর প্রত্যক্ষদর্শী, চুকনগর কলেজের অধ্যক্ষ এবিএম শফিকুল ইসলাম এই সংখ্যা কোনো দশ হাজারের কম নয়, বরং বেশী বলে মনে করেন। সেই হত্যাকান্ডের লাশ ফেলেছিলেন চারজন। এরা হলেন কাওসার আলী, দলিল উদ্দীন, আনসার সরদার ও ইনছান সরদার।

তিনি বলেন, এলাকার ওহাব মোল্লা তাদেরকে লাশগুলো ভদ্রা নদীতে ফেলার কথা বলে। পাকিরা আদেশ জারি করেছিল, সব লাশ নদীতে ফেলে গ্রাম সাফ-সুতরো করতে হবে। বাঁশের মাঝে লাশ রেখে দুইজন টেনে আবার লাশের পা ধরে টেনে-হিচড়ে নদীতে ফেলা হয়।

লাশের সংখ্যা দশ-বারো হাজারের কম হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের একজন বিয়াল্লিশ শ’ পর্যন্ত লাশ গুণেছিলেন। আর গুণতে পারেনি। লাশের গন্ধে নদীর পানিতে দুর্গন্ধ হয়। অনেক লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আশে-পাশের বিলে। চুকনগর কলেজ প্রতিষ্ঠার সময়ও সেখানে হাড়গোড় পাওয়া গেছে চুকনগর গণহত্যাস্থলে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হলেরও এখনও পূর্ণাঙ্গতা পায়নি এ জন্য তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিফাত মেহনাজ বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গণহত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে এই চুকনগরে বলে বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে। ২০ মে সেই নারকীয় গণহত্যাটি ঘটে।

দিবসটি উপলক্ষ্যে এবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ওইদিন সন্ধ্যায় গণহত্যার শিকার নারী, পুরুষ,শিশুদেও স্মরণে স্মৃতি স্তম্ভে ১০ হাজার মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হবে। এছাড়া আয়োজন করা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এ সকল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।