Bahumatrik Logo
১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

গন্তব্য কুয়াকাটা


১৩ এপ্রিল ২০১৪ রবিবার, ০৩:১৮  পিএম

সোহেল রানা

বহুমাত্রিক.কম


গন্তব্য কুয়াকাটা

ঢাকা: রুমমেটের এক বড় ভাই ব্রিটিশ রেডক্রসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে বরগুনায় চাকরি করেন। নাম সরকার পাশা। তারই আমন্ত্রণে ৭ মার্চ ঢাকার টেকনিক্যাল মোড় থেকে ৮ টার সাকুরা পরিবহনে রওয়ানা দিলাম বরগুনায়। রাতভর বাস চলল। ৪টি ফেরি পার হয়ে অবশেষে সকাল ৬.৩০ পৌঁছালাম বরগুনাতে। প্রথমে গেলাম পাশা ভাইয়ের বাসায়।

সেখান থেকে গোসল-নাশতা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য কুয়াকাটা। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির দুটি ফিল্ড পরিদর্শন শেষ করে যাব কুয়াকাটা। যাত্রা শুরু হলো পাশা ভাইয়ের মোটরসাইকেলে। বরগুনা সদর পার হয়ে আমতলী যেতে মাঝখানে পড়ল পায়রা নদী। পারাপারে ফেরি চললেও গাড়ি না থাকায় নৌকায় পার হতে হতে অনেকটা সময় লেগে গেল। পায়রা নদীর প্রবাহ, নদীকেন্দ্রিক স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা আমাকে মোহিত করল।Kua


আমতলী পার হয়ে বাইক ছুটছে কলাপাড়ার দিকে। ছুটছে তো ছুটছেই। কলাপাড়া থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে কুয়াকাটা যেতে আরো ৩টি ফেরি পার হতে হলো। পাশা ভাই বিকল্প সড়কে কুয়াকাটা যাবার কথা বললেন। এই পথে শুধু বালিয়াতলী নদীর ফেরি পার হতে হয়।

আমরা কলাপাড়া থেকে বাম দিকের নদীর পাড় হয়ে মূল সড়ক ধরে এগিয়ে চললাম। যাত্রাপথে অনেক খাল-নালা চোখে পড়ল। খালের কোলঘেঁসে রয়েছে গোলপাতা, কেওড়াসহ ম্যানগ্রোভ বনের নানা প্রজাতির উদ্ভিদ। অঞ্চল আমার কাছে নতুন। তাই চলার পথে থেমে থেমে ক্লিক...ক্লিক করে ছবি তুলতে লাগলাম। চলতে চলতে উপকুলঘেঁষা গ্রাম পশুরবুনিয়া ও বিবির হাওলায় এসে থামলাম।

এখানে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্থানীয় প্রকল্প পরিদর্শন শেষে গেলাম সদ্য ঘোষিত পায়রা সমুদ্র বন্দর এলাকার রামনাবাদ নদী চ্যানেলের পাড়ে। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেল, এই চ্যানেল দিয়েই জাহাজ বন্দর জেটিতে ভিড়বে। বন্দর উন্নয়নে চলছে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ। নদী থেকে বেশকিছু খাল গ্রামের ভেতর ঢুকে গেছে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে এগুলোতে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়।

Khalএকদিকে যেমন জেলেদের জীবনযাত্রা চোখে পড়ল অন্যদিকে চোখে পড়ল প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলে-মেয়েদের দল বেঁধে স্কুলে যাওয়ার চিত্র। ভালো লাগল এই ভেবে যে আমাদের প্রজন্ম এগিয়ে চলছে। নাওয়াপাড়ার আরেকটা প্রকল্প ঘুরে এবার সোজা কুয়াকাটার দিকে এগিয়ে চলল আমাদের বাইক। পথের দুপাশের পরিবেশ আর প্রকৃতি দেখে শুধু মুগ্ধ হবার পালা। পথের পাশে গোলপাতার বড় একটা বন দেখে নেমে ঘোরাঘুরির লোভটা সামলাতে পারলাম না। মোটর সাইকেল থেকে নেমে পড়লাম। ক্লিক..ক্লিক.. করে বেশকিছু ছবি তুলে নিলাম।

আবার ছুট। থেমে গেলাম বিজয় রামা বৌদ্ধ মন্দির দেখতে। কথা হলো অধ্যক্ষের সাথে। দেখা হলো পাশের রাখাইন পল্লী। শেষে আবার শুরু হয় পথচলা। murti

আলীপুর বাজারে পৌঁছে ভরপেট খেয়ে নিলাম দুপুরের খাবার। তারপর কুয়াকাটা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমদ্রসৈকত। খ্যাতি রয়েছে সাগরকন্যা হিসেবে। বরিশাল বিভাগের শেষ মাথায় পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের সর্ব দক্ষিণে ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সমদ্রসৈকত। প্রথমেই আমরা দেখতে গেলাম ঐতিহাসিক কুয়া (কূপ), বৌদ্ধ মন্দির ও প্রাচীন নৌকা।

তারপর সৈকজুড়ে বাইকে কয়েকবার চক্কর দিলাম। সৈকতের এক প্রান্ত দিয়ে আন্ধার মানিক অন্য প্রান্ত দিয়ে রামনাবাদ নদী সাগরে ঢুকেছে। প্রকৃতিকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে অনেকটা সময় পার করে দিলাম দু’ মোহনার পাশে। দেখা হয়ে গেল শত শত লাল কাঁকড়ার সাথে। দূর থেকে এদের দেখলে লাগল গালিচা বলে ভ্রম হতে পারে। কি দারুণ দেখতে এরা! কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, সৈকতের পাশ দিয়ে আলাদা কোনো রাস্তা না থাকায় শত শত মোটর সাইকেল চলছে সৈকতের ওপর দিয়ে। চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে লাল কাঁকড়ার দল।


sutkiস্থানীয় শুঁটকি পল্লীও ঘুরে ঘুরে দেখলাম। গন্ধটা ছাড়া সবই ভালো লাগল। শেষে সাগরের সাথে আলিঙ্গন করতে নেমে পড়লাম জলে। তারপর জল নিয়ে খেলা। ছিটাছিটি। বাঁধভাঙা উল্লাস। মনের সব গ্লানি যেন ধুয়েমুছে গেল নীল সাগরের জলে। গোসল সেরে ঝাউ ও নারিকেল বনে বেশকিছুটা সময় কাটালাম। তারপর ঘুরে দেখলাম কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান। কুয়াকাটাই দেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়।


রাতে ঢাকা ফেরার তাড়া থাকায় শেষ বিকালে সৈকত ছেড়ে আমতলীর উদ্যেশে রওয়ানা দিলাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিরছি আরেক দিকের পথ দিয়ে। এ পথে ৩টি নদী পার হতে হলো। সৈকতের সূর্যাস্ত মিস করলেও আন্ধারমানিক নদীতে সূর্যাস্তটা কিন্তু মিস করলাম না।

সড়ক আর ফেরি শেষে আমতলীতে যখন এসে পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা ৬.৩০ টা বাজে। পাশা ভাই আগেই আমার ফেরার টিকেট করে রেখেছিলেন। বাজারে জয়নালের দোকানে ভাত খেলাম। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তালতলী এলাকার কর্মকর্তা রুহুল আমিন লিটনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে পাশা ভাই বরগুনায় চলে গেলেন। লিটন ভাইয়ের সাথে কথা বলতে বলতে কাউন্টারে বাস এসে হাজির হলো। পরবর্তীতে ফাতরার বন দেখতে আসার প্রতয় ব্যক্ত করে বিদায় নিলাম লিটন ভাইয়ের কাছ থেকে।

সোহেল রানা: লেখক, পরিভ্রাজক

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।