Bahumatrik Logo
২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৮:৩৯ অপরাহ্ণ

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা


১৫ জুন ২০১৪ রবিবার, ০২:৫১  পিএম

মুকিত মজুমদার বাবু

বহুমাত্রিক.কম


গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা

ঢাকা: 

“মেঘ-যামিনী অতি ঘন আন্ধিয়ার।

ঐছে সময়ে ধনি করু অভিসার ॥

ঝলকত দামিনী দশ দিশ আপি।
নীল বসনে ধনি সব তনু ঝাঁপি ॥”

কিংবা,

“দেখ ময়নামতী প্রথম আষাঢ়
চৌদিকে অম্বর সাজে গম্ভীর।
শ্যামল অম্বর শ্যামল খেত-খেতি।
শ্যামল লখি দশ দিশ দিবসক যুতি।”

বৈষ্ণব পদাবলি থেকে মধ্যযুগের দৌলত কাজী, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কে না এঁকেছেন বর্ষার ছবি! তবে কবি কালিদাসের কথা না বললেই নয়। মহাকবি তার ‘মেঘদূত’ মহাকাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহ কাতর যক্ষ মেঘ’কে দূত করে কৈলাশে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। যক্ষের সে বিরহ বারতা মেঘদূত যেন সঞ্চারিত করে চলেছে প্রতিটি বিরহ কাতর বাঙালির চিত্তে, যুগ হতে যুগান্তরে। বর্ষার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে সাহিত্য সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে চলমান রয়েছে বর্ষা-সাহিত্য। সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার।

বর্ষা বিরহের ঋতু। বর্ষা মিলনের ঋতু। বর্ষাতেই পূর্ণতা পায় প্রকৃতি, ফিরে পায় যৌবনের স্বাদ। গ্রীষ্মের প্রচ- দাবদাহ পেরিয়ে দুয়ারে দাঁড়িয়ে আজ বর্ষা। ঋতু পরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতিতে দ্বিতীয় ঋতু বর্ষা অর্থাৎ আষাঢ়-শ্রাবণ। আর আজ আষাঢ়ের প্রথম দিন।

বর্ষা মানেই চারদিক কুয়াশার মতো অস্পষ্টতা নিয়ে ঝুম বৃষ্টি। দিনে-দুপুরেও সৃষ্টি হয় রাতে আবহ। একটানা বৃষ্টির শো শো শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। পথ-ঘাট প্রায় ফাঁকা থাকে। জরুরি কোনো কাজ না থাকলে কেউ বাইরে বেরোয় না। আকাশভাঙা বারিধারায় কানায় কানায় ভরে ওঠে তলাফাটা নদ-নদী, পুকুর-নালা, হাওর-বাঁওড়সহ ছোট-বড় জলাশয়। বয়ে চলে স্রোতধারা। ফিরে পায় যৌবনের দুর্দমনীয় স্বাদ। গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া মহীরুহ বৃষ্টির পানিতে স্নান করে ফিরে পায় গাঢ় সবুজের স্নিগ্ধতা, হয়ে ওঠে রূপ-মাধুর্যে অনন্যা লাবণ্যময়ী রূপসী।

ঝুম বৃষ্টিতে প্রায়ই দেখা যায় গাছের ডালে জুবুথুবু হয়ে বসে থাকা কাক। বৃষ্টিকে উপভোগ করে মনে-প্রাণে। ওর ভেতর কোনো তাড়া থাকে না। খাবার খোঁজার কোনো বেগ থাকে না। বাসায় ফেরার কোনো উদ্বেগ থাকে না। মাছ ধরার আশায় ধ্যানী বকের মতো কাকও বৃষ্টিসুধায় মনের ক্ষুধা মেটায়। আসলে ওকে পেয়ে বসে বৃষ্টিবিলাসে।

এই দিনে মনে পড়ে ছোটবেলার কথা, ফেলা আসা দিনগুলোর কথা- বৃষ্টিবিলাসী মন ছিল আমার। বৃষ্টি নামলেই মহল্লার ছেলেরা মিলে দল বেঁধে বৃষ্টিতে ভিজতাম। কখনো কখনো ফুটবল খেলতাম কাদা-পানিতে মাখামাখি মাঠে গিয়ে। দৌড়াতে গিয়ে আছাড় খেয়ে সরাৎ করে চলে যেতাম চার পাঁচ হাত দূরে। কেটে যেত শরীরের কোনো কোনো জায়গায়। সেদিকে কোনো খেয়ালই থাকত না। মনে হতো কিচ্ছু হয়নি। আবার বলের পেছনে ছুটতাম। সে এক অন্যরকম অনুভূতি!

মাঝে মাঝে একা একা বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগত। ঝুম বৃষ্টিতে কোনো নির্জন সবুজ ঘাসের মাঠে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে ভালো লাগত। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সূঁচের মতো মুখে-গায়ে এসে মিলিয়ে যেত। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম সুতা বেয়ে বৃষ্টি নেমে আসার অলৌকিত দৃশ্য। ঠোঁটের ভেতর দিয়ে গালের ভেতর ভরে উঠত বৃষ্টির জল। মনের ভেতর বৃষ্টির ঢেউ এমনভাবে দোলা দিত যে মাঝে মাঝে একা একা গলা ছেড়ে চিৎকার করতাম। উচ্ছ্বসিত দেহ-মন অপূর্ব এক ভালোলাগায় ভরে উঠত।

জীবনানন্দ দাশেরও ভালো লেগেছিল বৃষ্টির রুপালি জল। তাই তিনি লিখেছিলেন
“এই জল ভালো লাগে- বৃষ্টির রুপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ- বুলায়ে দিয়েছে চুল- চোখের উপরে
তার শান্ত স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে- আবেগের ভরে
ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চ’লে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে;
এই জল ভালো লাগে- নীলপাতা মৃদু ঘাস রৌদ্রের দেশে
ফিঙা যেমন তার দিনগুলো ভালোবাসে- বনের ভিতর
বার বার উড়ে যায়- তেমনি গোপন প্রেমে এই জল ঝরে
আমার দেহের ’পরে আমার চোখের ’পরে ধানের আবেশে...”

ছোটবেলায় সবচেয়ে বেশি শুনেছি টিনের চালে জলনূপুরের গান। মুগ্ধ হয়ে চোখ বন্ধ করে হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছি বৃষ্টির সেই সুর, ছন্দ, তাল। মনে মনে বার বার উচ্চারণ করেছি-
“বিষ্টি নামে রিমঝিমিয়ে
রিমঝিমিয়ে রিমঝিমিয়ে,
টিনের চালে, গাছের ডালে
বিষ্টি ঝরে হাওয়ার তালে,
হাওয়ার তালে গাছের ডালে
বিষ্টি ঝরে তালে তালে
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর,
বিষ্টি নামে মিষ্টি মধুর,...”

ছোটবেলার সেই ভালো লাগা বড় হয়ে অনেকবার অনুভব করার চেষ্টা করেছি। ছোটবেলার সে বৃষ্টিকাব্য কোনোভাবেই মেলেনি বড়বেলার জীবনকাব্যের সাথে। বার বার খেই হারিয়ে ফেলেছি। যে দিনগুলো যায় তা আর কোনোদিন ফিরে আসে না। বর্ষাঘেরা এ দিনগুলোয় নিজের ভেতরটাকে রোমন্থন করে ফেরে মানুষ।
“এ সখি হামারি দুখের নাহিক ওর।
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।”

বর্ষা মানেই চারদিক আলোয় আলোকিত করে চকচকে রোদ্দুরে ভেসে ওঠে পৃথিবী। পরক্ষণেই মেঘের কালো ছায়া সূর্যকে গিলে খেয়ে কাঁদতে শুরু করে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে। এই রোদ, এই বৃষ্টি, ক্ষণে ক্ষণে মেঘের রঙ বদলানো ছদ্মবেশ, গুড়গুড় গর্জনে কেঁপে কেঁপে ওঠা ধরিত্রী, নামে অঝোর ধারায় বৃষ্টি.... সবমিলে প্রকৃতির লুকোচুরি খেলার ঋতু হলো বর্ষা।

বর্ষায় অপূর্ণ প্রকৃতি ফিরে পেয়েছে পূর্ণতা। দিগন্ত বিস্তীর্ণ আউশ আর পাটের ক্ষেত যেন বাংলার প্রকৃতিকে করে তুলেছে চিত্রকরের পরিপাটি কোনো নিসর্গের ছবি। সে ছবিকে আরও উদ্ভাসিত করে তুলেছে কদম, কামিনী, কেয়া, টগর, জুঁই, পদ্ম, মালতী, পিত্তরাজ, কেয়া, রজনীগন্ধসহ আরও কয়েক প্রজাতির গুল্ম ও ফুলবতী বৃক্ষ।

আনারস, আমড়া, পেয়ারা, গাব, ডুমুর সফেদাসহ নানা দেশি ফলে ভরে উঠেছে গৃহস্থের স্যাঁতসেঁতে বৃষ্টিস্নাত আঙিনা।
বর্ষায় প্রসবিনী হয়েছে চিত্রা ও মায়া হরিণ। ছানার জন্য মনের সুখে নীড় বাঁধছে কাঠঠোকরা, পানকৌড়ি, জলপিপি, ডাহুক, ডুবুরি, গোবরে শালিক, ভাত শালিক, কালেম, বড়বক, কানাবক, কোড়া, কাঠশালিক, দাঁড়কাক, পাতিকাক, ময়না, ময়ূর, বুলবুলি, ঘুঘু, সারসসহ আরও অনেক পাখি।

অবাধ জলের স্রোতধারায় পোনা ফোটায় ইলিশ, কালিবাউশ, কালো বুজুরী, পোয়া, পাঙ্গাস, বাচা, বাটা, বাতাসি, বেলে, বোয়াল, মৃগেল, রুই, ঘনিয়া, পাবদা, গজার খলিসা ইত্যাদি মাছ।

ঋতুবৈচিত্র্যের সোনার বাংলায় বর্ষা আসে। সাথে নিয়ে আসে অবিরল বারিধারা। প্রকৃতি সাজে রঙবাহারি সাজে। বর্ষার অপরূপ সাজ যেমন আছে তেমনি আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দানবীয় নৃত্য। অতিবৃষ্টি, বন্যা, ফসলহানি ও পাহাড় ধসের মতো প্রকৃতির অভিশাপে সর্বশান্ত হয়ে যায় মানুষ। তারপরও ঋতুবৈচিত্র্যে বর্ষা আসে প্রকৃতির এক অনন্য ঋতু হয়ে।

Babuলেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।