Bahumatrik Logo
২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, বুধবার ০৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ৪:৩৩ অপরাহ্ণ

কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদের ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ বিএফডিসি


৩০ মে ২০১৬ সোমবার, ০২:১৭  এএম

মো. মোস্তফা কামাল, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

বহুমাত্রিক.কম


কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদের ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ বিএফডিসি

রাঙ্গামাটি : কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি)-এই অভিযোগ করেছেন কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য ব্যবসায় এর সাথে জড়িত বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দদের অভিযোগ, বারবার বয়েলটি বাড়িয়ে রয়েলটি আদায়ের পরিমান বাড়ানো হলেও হ্রদের মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির সুষ্ঠ পরিকল্পনা নাই বিএফডিসির। রয়েলটি বাবদ অর্জিত রাজস্ব আয় এর একটি রাম মাএ অংশ হ্রদের উন্নয়নে ব্যয় করা হলেও সিংহভাগ অর্থ বিএফডিসির কাজেই ব্যয়িত হয়।

৭২৫ বর্গ কিলোমিটারের দেশের সর্ববৃহৎ কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির পর ১৯৬৪ সালে। হ্রদের মৎস্য সম্পদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয় মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনকে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে মধ্যম সারির এই হ্রদে বার্ষিক মৎস্য উৎপাদন হতে পারে ১৫ হাজার মেট্রিক টন। প্রায় ৭৫ প্রজাতির মৎস্য প্রজাতির মধ্যে এই হ্রদ হতে বর্তমানে আহরিত করা মাছের প্রজাতির সচরাচর দেখা যায় ৪০ হতে ৪৫ প্রজাতির সুস্বাদু মাছের।

ইতিমধ্যে হ্রদ হতে বিলুপ্তি হয়েছে একাধিক প্রজাতির সুস্বাদু মাছের আরো একাধিক প্রজাতির মাছের অস্বিস্ত হুমকির মুখে। র্কাপ জাতীয় মাছের জন্য সুপরিচিত এই কাপ্তাই হ্রদে র্কাপ জাতীয় মাছের উৎপাদন ও আশংকাজনক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। মূলত বিভিন্ন ছোট ছোট প্রজাতির মাছ, বিদেশী একাধিক প্রজাতির মাছই এখন এই হ্রদের মূল ভরসা।

কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, হ্রদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ হ্রদের মৎস্য সম্পদের উন্নয়নে তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। হ্রদের মৎস্য ব্যবসায়ীরা লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেও বর্তমানে আশাতীত মুনাফা অর্জন করতে পারছে না। অথচ বিএফডিসি প্রতিনিয়ত রয়েলটির পরিমাণ বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন।

বিএফডিসির রয়েলটির পুরো অংশের যোগান দাতা হ্রদের মৎস্য ব্যবসায়ীরা হলেও মৎস্য ব্যবসায়ীদের জন্য কোন রকম ইতিবাচক পদক্ষেপ নেই কর্তৃপক্ষের। পাশাপাশি বিএফডিসির কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাগামহীন দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগের কারণে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন এবং বিএফডিসিও রয়েলটি হারাচ্ছে।

মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দের অভিযোগ বিএফডিসির যে সব মৎস্য অবতরণ ঘাট রয়েছে সেখানে অবতরনকৃত মাছ হতে রয়েলটি আদায়ের ব্যাপারে ভিন্ন নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে। এর ফলে কাপ্তাই মৎস্য অবতরন ঘাটে ল্যান্ডিং করা মাছের রয়েলটি আদায়ের সাথে রাঙ্গামাটি মৎস্য অবতরণ ঘাটে ল্যান্ডিংকৃত মাছের রয়েলটি আদায়েও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিএফডিসির এই দ্বৈন নীতির কারনে এখানকার মৎস্য ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও বিএফডিসির কিছু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধ উপায়ে সম্পদশালী হয়ে উঠছে।

বিএফডিসি রাঙ্গামাটি মৎস্য অবতরন ঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ীরা বিএফডিসির শ্রমিক সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি বলে অভিযোহ করে বলেছেন এখানকার মৎস্য ব্যবসায়ীরা বিএফডিসির শ্রমিক সিন্ডিকেট এর কারনে মাছ অবতরন এবং পরিবহনের সাথে নিজেদের শ্রমিক ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে অনেক সময় মৎস্য অবতরন ঘাটেই মাছ পঁেচ গিয়ে তাদের আর্থিক লোকসান গুনতে হয়। এই বিষয়ে বিএফডিসি কর্তৃপক্ষকে একাধিক বার অবহিত করা হলেও এই সমস্যার কোন সমাধান মেলেনি।

মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদ হতে আহরিত মৎস্য সম্পদের উপর রয়েলটি আদায় করা। কিন্তুু হ্রদের মৎস্য সম্পদের উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের কোন নজর নেই বিএফডিসির। রাঙ্গামাটি কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ ফিস কালচারিষ্ট থাকলেও এই পদ দীর্ঘ দিন যাবৎ শুন্য। তাছাড়া গ্রদের কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো বিনষ্ট হয়ে গেলেও এদিকেও নজর নেই কর্তৃপক্ষের।

কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদের উন্নয়নে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র রাঙ্গামাটি নদী উপকেন্দ্রের মৎস্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গবেষনার ফলাফল জানালেও এদিকেও লক্ষ্য থাকে না বিএফডিসি কর্র্তৃপক্ষের। চলতি মাসের ১লা মে থেকেই কাপ্তাই হ্রদে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন শুরু হলেও হ্রদে মৎস্য আহরণ বন্ধের বিষয়ে অযথা সময়ক্ষেপণের অভিযোগ রয়েছে। বিএফডিসি যে কারণে ১২ মে থেকে মাছ আহরণের উপর নিষেধাষ্ণা আরোপিত হয়। মৎস্য ব্যবসায়ীদের অভিযোগ শুধুমাত্র বাড়তি রয়েলটি আদায়ের জন্যই মৎস্য আহরণের উপর নিষেধাষ্ণা আরোপ বিলম্বিত হয়। এতে কাপ্তাই হ্রদে মাছের প্রাকৃতিক প্রজননের সুষ্ঠ পরিবেশ এর উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, হ্রদ হতে আহোরিত মৎস্য সম্পদের উপর আদায়কৃত রয়েলটির মধ্যে হ্রদ ইজারা বাবদ আর্থিক ৫ লক্ষ টাকা সরকারী কোষাগারে জমা দেয়া এবং মাছের পোনা ছাড়া বাবদ ৪০ হতে ৫০ লক্ষ টাকা ব্যয় ছাড়া আর কোন টাকাই এখানে খরচ করা হয়না।মূলত বিএফডিসি রাঙ্গামাটি কেন্দ্রের আয়ের উপর বিএফডিসি অনেক নির্ভরশীল।

কাপ্তাই হ্রদের উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বিএফডিসির মাধ্যমে হ্যাচারি সহ একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। অপরদিকে মাছ ধরা বন্ধ মৌসুমে দরিদ্র জেলেদের খাদ্য শষ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রনালয় হতে। অথচ এর পুরো সুফল ভোগ করছে বিএফডিসি। ইতিপূর্বে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন শ্রেণির বিশিষ্ট্য লোকজনের উপস্থিতিতে আড়ম্বর পূর্ণ পরিবেশে কাপ্তাই হ্রদে মাছের পোনা অবযুক্তকরণ কর্মসূচীর সূচনা করা হলেও গত ২ বছর যাবৎ এই অনুষ্ঠান ও নাম মাত্র আনুষ্ঠানিকতায় সম্পন্ন হচ্ছে। দিন দিন বিএফডিসি হয়ে পড়ছে জন বিচ্ছিন্ন।

কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনায় রাঙ্গামাটির স্থানীয় সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন এখানকার বিশিষ্টজনরা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে সরকারকে বাস্তবতার নিরিখে নতুন ভাবে চিন্তা ভাবনা করার আহবান তাদের।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।