Bahumatrik Logo
১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:৪৪ অপরাহ্ণ

আনন্দের কথা ভাবতেও ভুলে গেছেন চা শ্রমিকরা


০১ মে ২০১৬ রবিবার, ০১:৩৮  এএম

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


আনন্দের কথা ভাবতেও ভুলে গেছেন চা শ্রমিকরা
ছবি-বহুমাত্রিক.কম

সিলেট : বছর ঘুরে ফিরে এলো মহান মে দিবস। এদিন শ্রমিকরা শোষণ-বঞ্চনা কাটিয়ে নতুন জীবনে ফেরার প্রত্যাশা করলেও বাংলাদেশের হাজারো চা শ্রমিকদের জন্য তা নিছক নিরাশা মাত্র। বিশ্বব্যাপি শ্রমিক শ্রেণির আট ঘন্টা কাজ, আট ঘন্টা আনন্দ-বিনোদন আর আট ঘন্টা বিশ্রামের কথা থাকলেও অন্যান্য অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের মতো চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের দু:খ-কষ্টের জীবনে নেই কোন আনন্দ-বিনোদন। জীবন যুদ্ধে বেঁচে থাকার তাগিদে শিল্পের বৃহদাংশ শ্রমিকরা রুটি আর লাল চা খেয়েই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটিয়ে দেন।

নারী শ্রমিকরা সেকশন ও টিলায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে কাজ করেন। চা বাগানে যাদের কাজ নেই এমন অসংখ্য নারী শ্রমিকরা বেকারত্ব আর সংসারের অসহায়ত্বের ভারী বোঝা নিয়ে স্বল্প মজুরিতে বস্তির কঠিন কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন। মে দিবসে শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধা বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে চা শিল্পে কর্মরত নারী-পুরুষ শ্রমিকদের এমনই কষ্টের চিত্র ফুটে উঠে।

শমশেরনগর চা বাগানে কর্মরত ৫০ বছর লছমি রানী রাজভর, রেবতি রিকিয়াশন করুন সুরে বললেন, ‘আমাদের জীবনে কী আর আমোদ প্রমোদ আছে। সারাদিন কাজ করেও পরিবার চালাইতে পারি না। পেট ভরে না। বাচ্চাদেরেও ঠিকমতো খাওয়াইতে পারি না। বৃষ্টির সময়ে লম্বরেও ভিজি, ঘরেও ভিজি। বউ, বাচ্চা, গরু-ছাগল নিয়া একঘরেও থাকি। চা বাগানে শ্রমিকদের জীবনে আনন্দ চিন্তা করা কঠিন।’

বয়োবৃদ্ধ শ্রমিকরা জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ চা শিল্প শ্রমিকরা। ওই শিল্পের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে হাজার হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক। হাড় ভাঙা খাটুনি দিয়েই জীবনের চাকা ঘুরছে। নারী শ্রমিকরা একাধারে ঘরে বাইরে কাজ করছেন। পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে চেহারায় হাড্ডিসার দশা। চা বাগানের এই শ্রমিকরা জীবিকার তাগিতে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠিন কাজ করে চলেছেন।

Kamalgonjপ্রয়োজনীয় জীবিকার সংস্থান না হওয়ায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অনেক চা শ্রমিক ইমারত নির্মাণের কাজেও আত্মনিয়োগ করেছেন  

কর্মরত নারী শ্রমিকরা দু’টি হাতে সারাক্ষণ পাতি উত্তোলনে থাকে ব্যস্ত। রোদ, বৃষ্টিতে ভিজেই চলে তাদের কাজ। এরপর মজুরি! সেই মজুরি দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হয় না। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান সংকট প্রবল। অজ¯্র সমস্যায় জর্জরিত চা শ্রমিকরা এক ঘরে গাদাগাদি করে দুঃখ কষ্টে জীবন অতিবাহিত করছেন।

শ্রমিকরা বলেন, ঘুম থেকে উঠেই লাল চা দিয়ে রুটি খেয়ে কাজে চলে যান। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সন্তানাদি ও রান্নাবান্না করে কোনমতে রাতের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েন। তাদের বিশ্রাম আর আমোদ-প্রমোদ করার সুযোগটুকুও নাই। ৮৫ টাকা মজুরি দিয়ে একবেলা, আধা বেলা খেয়ে দিন কাটছে। চা বাগানে বেকার শ্রমিকরা বস্তির ইটভাটা, স-মিল, বিল্ডিং নির্মাণে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন। এরপরও ঠিকমতো খাবার জোগানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

মৌলভীবাজার চা শ্রমিক সংঘের আহ্বায়ক রাজদেও কৈরী বলেন, শ্রম আইনের সকল সুযোগ সুবিধা চা শ্রমিকদের পক্ষে ভোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখানে নিয়োগপত্র, পরিচায়পত্র নেই। তিনি বলেন, আইনে থাকলেও চা বাগানের নারী শ্রমিকরা কাজে চলে গেলে শিশুদের রাখার জন্য ডে-কেয়ারেরও কোন ব্যবস্থা নেই। কি নিদারুন কষ্ট চা শিল্প শ্রমিকদের! তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ও চা শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন বলেন, চা বাগানে বৃটিশ আমলের যে শ্রমিক ছিল তা থেকে আর শ্রমিকদের কাজে নিয়োগ না দেওয়ায় বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ফলে হাজার হাজার বেকার শ্রমিকরা বস্তির ইটভাটা, বিল্ডিং, স-মিল, গাছের গুড়ি উত্তোলনসহ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করছে।

অথচ মালিকরা চা বাগানের পতিত জমি প্লান্টেশন করলে যেমন শ্রমিকরা কাজ পেতো, অন্যদিকে মালিক পক্ষেরও লভ্যাংশ বৃদ্ধি পেতো। নামে মাত্র রেশনসহ সাতাশ শ’ টাকা মাসিক মজুরি দিয়ে পাঁচ, সাত সদস্যের পরিবার চালানোই কঠিন। সেখানে আমোদ প্রমোদের কথা কল্পনাই করা যায় না।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।