Bahumatrik Logo
২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৩:১৮ পূর্বাহ্ণ

আধুনিক ঢাকার উদ্ভব ও সংবাদপত্রের গোড়ার কথা


০৬ মে ২০১৪ মঙ্গলবার, ০৪:৪০  পিএম

ড. এমরান জাহান

বহুমাত্রিক.কম


আধুনিক ঢাকার উদ্ভব ও সংবাদপত্রের গোড়ার কথা

ঢাকা: (শেষ পর্ব) উনিশ শতকের মধ্যভাগে ঢাকায় শিক্ষা প্রসারের ফলে একটি প্রগতিশীল বাঙালি সমাজের সূচনা ঘটে। তাঁরা নিজ তাগিদেই ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সংস্কার কল্পে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। ১৮১৮ সালের পর থেকেই কলকাতার বাঙালি হিন্দু সমাজ সংবাদ সাময়িকপত্র প্রকাশের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে যে উত্তাল ঢেউ তুলেছিল তার সেই প্রভাব ঢাকার নবসৃষ্ট সমাজকে প্রভাবিত করবে সেটাই স্বাভাবিক।

এদের মধ্যেই ঢাকায় প্রথম প্রগতিবাদী ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ গড়ে ওঠে। ১৮৪৬ সালে ব্রজসুন্দর মিত্রের নেতৃত্বে ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।  ১৮৬১ সালে এই ব্রাহ্ম সমাজেরই উদ্যোগে  ঢাকার প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ঢাকা প্রকাশ প্রকাশিত হয়েছিল। ঢাকা প্রকাশ ছিল ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র। তবে ১৮৪৬ সালে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানে ধরে নেয়া যায় যে, চল্লিশের দশকেই ঢাকায় একটি বিদ্বৎ সমাজের সমাবেশ ঘটেছিল। তারপরও প্রায় বিশবছর সময় লেগে গেল ঢাকা থেকে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ হতে।

আর উনিশ শতকের শুরুতেই রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে কলকাতার ব্রাহ্মসমাজ  সেখানকার সমাজ ও প্রশাসনের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।১৬ অথচ কলকাতা থেকে ঢাকার দূরত্ব সে সময়ে দু’শ মাইলের অধিক ছিলনা। সম্ভবত এররূপ বিলম্বের কারণ ছিল ঢাকায় মুদ্রণযন্ত্রের অভাব। যাহোক, ঢাকার সংবাদপত্রের উদ্ভব ও বিকাশে ঢাকাস্থ সভা সমিতির পৃষ্ঠপোষকতা যে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল, তা পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে শুধু ব্রাহ্ম সমাজের ভূমিকা আলোকপাত হলো। সংস্কারপন্থী ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠায় ঢাকার বিদ্ব্যৎজন অংশগ্রহণ করেন। এঁদের মধ্যে জমিদার, শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা সম্পৃক্ত ছিলেন। 

১৮৬৩ সালে ব্রজসুন্দর মিত্র, দীননাথ সেন ঢাকায় ব্রাহ্ম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। অবৈতনিক স্কুলটি ছিল মিড্ল ভার্নাকুলার স্কুল। ঢাকার আরমানিটোলায় ব্রাহ্ম সমাজ অফিসের সামনে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর্থিক অসুবিধার কারণে স্কুলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন শিক্ষানুরাগী জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী। তখন থেকে স্কুলটির নামকরণ করা জগন্নাথ স্কুল। উনিশ শতকে জগন্নাথ স্কুল পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকার শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে আধুনিকতার দ্বার খুলে দেয়।

পোগজ স্কুলের শিক্ষক গোপীমোহন বসাক জগন্নাথ স্কুলের প্রথম হেড মাস্টারের দায়িত্ব নেন। ঢাকার শিক্ষানুরাগী হিসেবে মি. বসাক এর খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই জগন্নাথ স্কুলই পরবর্তীতে জগন্নাথ কলেজ এবং বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৫৬ সালে ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজ নারী শিক্ষা প্রসারে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিল। এতে সহযোগিতা করেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ডব্লিউ ব্রেনান্ড এবং ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের হেডমাস্টার এফ টিড (F. Tydd)।

এতে স্থানীয় বৃদ্ধিজীবী আনন্দমোহন দাস এবং দীনবন্ধু মল্লিক (স্কুল ইনসপেক্টর) সম্পৃক্ত ছিলেন। ঢাকার বাংলা বাজারে স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল। ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজের অপর কর্ণধার ছিলেন নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ঢাকার শিক্ষা সংস্কৃতির পুরোভাগে ছিলেন জগন্নাথ স্কুলের শিক্ষক এই নবকান্ত বাবু। সামন্ত জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি স্কুল শিক্ষকের চাকুরী নেন এবং সংস্কারবাদী প্রগতিশীল ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। ফলে তাঁকে রক্ষণশীল পিতা কর্তৃক ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করা হয়। তাদের উদ্যোগেই ঢাকায় জেনানা এ্যডুকেশন সোসাইটি প্রতিষ্ঠা পায়।

১৮৭১ সালে ‘ঢাকা শুভাসাধনা সভা’ নামে অপর একটি সমাজ সংস্কারক সভা তৈরি করা হয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ঢাকা থেকে যে সকল সংবাদ সাময়িকপত্র জন্ম নেয় এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করার ব্যাপারে উপরোক্ত ব্যক্তি ও সমাজের ভূমিকা ছিল ব্যাপক।

ষাটের দশকে যখন ঢাকায় সংবাদ-সাময়িকপত্রের সূত্রপাত হয় সে সময়ে  অর্থাৎ ১৮৬২ সালে বাবু ব্রজসুন্দর মিত্র ও অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ঢাকা কলেজে একটি ‘ল’ ক্লাস (Law class) খোলার আবেদন জানান। সরকার এ আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৮৬৩ সালেই ঢাকা কলেজে একটি ‘ল’ ক্লাস চালু করেন। পূর্বে আইন শাস্ত্র পড়ার জন্যে পূর্ব বাংলার মানুষকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে যেতে হতো।

১৮৬৮-৭২ সালের মধ্যে এই ‘ল’ কলেজে থেকে ৪৯ জন ছাত্র উত্তীর্ণ হয়ে আইনজীবী পেশায় আত্মনিয়োগ করে ঢাকা শহরে বসবাস করেন। স্বাধীন পেশায় আত্মনিয়োগ করায় ঢাকার উন্নয়নে ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁরা মনোনিবেশ করতে পারেন। তাদের পেশাগত স্বাধীনতা ঢাকার শিক্ষা সমাজ ও সংস্কৃতিতে নেতৃত্ব দানের সুযোগ করে দেয়।

এই ধারাই উনিশ শতকের  দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত সমাজ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। এ সম্পর্কে ঢাকার গবেষক শরীফ উদ্দীন আহমেদ যথার্থই লিখেন “এর ফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তন হয় তা হল ঢাকায় ইংরেজি শিক্ষিত একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আবির্ভাব যারা আস্তে আস্তে উচ্চপদে এবং ক্ষমতায় আসীন হন। এই শ্রেণীটির বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল নতুন ধরনের।”১৭ একটি বিশেষ লক্ষণীয় বিষয়, কলকাতার ন্যায় ঢাকার নব উদ্ভব এ শ্রেণীর উত্থান পর্বটি ছিল একচেটিয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকেই।

কিন্তু কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় নবসৃষ্ট কলকাতা শহরে ঐতিহাসিক কারণেই বাঙালি হিন্দুর সমাবেশ ঘটেছিল এবং তারা ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল । কাজেই হিন্দুদের মধ্য থেকে কলকাতায় আধুনিক জনমতের উদ্ভব ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মুসলিম শাসকদের তৈরী শহর ও রাজধানী ঢাকায় কেন হিন্দু সমাজের মধ্য থেকেই মধ্যবিত্ত সমাজ ও আধুনিক জনমতের উদ্ভব হয়েছিল ? পূর্বের আলোচনায় এ বিষয়টি খানিকটা চলে আসছে।

আর এখানে বলা যেতে পারে যে,  ঢাকা মোগল আমলে ইসলামী ঐতিহ্যমণ্ডিত মুসলিম পরিবারগুলি কোম্পানি শাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেনি। অধিকন্তু উনিশ শতকের চল্লিশ দশক থেকে ঢাকায় পাশ্চাত্য শিক্ষার সুযোগ শুরু হলে সেখানেও নেতৃত্বে চলে আসে ঢাকার ধনী হিন্দু গোষ্ঠী। বসাক, গোপী, মিত্র সম্প্রদায়টি নবাবি আমল থেকেই সম্পদের প্রাচুর্যে অগ্রসর ছিল।১৮

ইংরেজ শাসন ও আশীর্বাদ এদের উন্নতির পথ নতুন করে উন্মুক্ত করে দেয়। ১৮৪১ সালে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত কোনো সময়েই তিনজনের বেশী মুসলমান ছাত্র একত্রে ঢাকা কলেজে পড়ালেখা করেনি। এই রিপোর্টটি ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এ ডব্লিউ, ক্রফ্ট এর।১৯ ঢাকার মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ না করার পশ্চাতে শুধু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসই দায়ী নয়, নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় তা বহুলাংশে দায়ী ছিল। উনিশ শতকের ষাট দশকে ঢাকায় যে সকল সংবাদ সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয়েছিল- সবগুলির পৃষ্ঠপোষক, সম্পাদক, সাংবাদিক ছিলেন ঢাকার আধুনিক শিক্ষিত হিন্দু জনগোষ্ঠী।

যাহোক, ঢাকার আধুনিক শিক্ষার প্রচার ও প্রসার অবধারিতভাবে ঢাকায়  সংবাদ-সাময়িকপত্র চর্চার পথ উন্মুক্ত করে দেয়। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি তাদের সামাজিক-বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা চেতনা থেকেই সংবাদপত্রের চর্চা করেছিলেন। তবে সংবাদপত্র চর্চার ক্ষেত্রে কলকাতার মতো ঢাকার নব্য শ্রেণীটির বিকাশ শুধু বর্ণহিন্দু চট্টোপাধ্যায়, বন্দ্যোপাধ্যায়ের  মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, নিম্ন হিন্দুর মধ্যেও প্রসারিত ছিল। তাঁতী, কামার, শাঁখারীর মধ্যেও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অংশীদার ছিল। ঢাকার তাঁতী সম্প্রদায়ের রোহিনী কুমার বসাক ছিলেন ঢাকা কলেজের প্রথম গ্রাজুয়েট। এঁরা ছিলেন ঢাকার বনেদী ব্যবসায়ী।

শিক্ষার পাশাপাশি ঢাকার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ঘটে একই সময়ে। অর্থাৎ উনিশ শতকের তিরিশ-চল্লিশ দশক থেকে ঢাকার ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ঢাকার ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে ঢাকার অর্থনৈতিক জীবনের যে পুনরুত্থান ঘটে এর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে ঢাকার সাহিত্য ও সংবাদপত্র চর্চা জগতের। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ঢাকা থেকে প্রথম যে সংবাদপত্রটি (ঢাকা নিউজ)প্রকাশ পেয়েছিল সেটি একদল খাটি ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা ও সম্পাদনায়।

মোগল আমলে ঢাকা ছিল প্রাচ্যের বিখ্যাত ব্যবসা-বাণিজ্যের নগরী। আরব ও ইউরোপীয় বণিকদের আকৃষ্ট করত ঢাকার বাণিজ্য। মোগল আমলের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে ড. আব্দুল করিম এবং জেমস টেলর।২০ মুর্শিদাবাদের প্রশাসনিক রাজধানী স্থানান্তরের পরও (১৭১৬ খ্রী:) ঢাকা ভারতবর্ষের বিখ্যাত ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থানটি দখল করে রাখে। ঢাকার ব্যবসা বাণিজ্যের পতন শুরু হয় ১৭৬৫ সালে কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর।

১৭৬৫ থেকে ১৮৩০-৩৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের পতন কাল। ১৮৩৬ সালে অভ্যন্তরীণ শুল্ক এবং নগর শুল্ক প্রত্যাহারের পর ধীরগতিতে ঢাকার ব্যবসা বাণিজ্যে সম্ভাবনা জেগে ওঠে। আঞ্চলিক প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার পুনরুত্থান শুরু হলে নগরায়ণের ধারাও গতি পায়। সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্রমবিকাশ ঘটে। এ নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় পাট চাষ ও পাট ব্যবসা। এ সময় রেল যোগাযোগ ও স্টিমার ব্যবস্থা ঢাকার বাণিজ্যকে চাঙ্গা করে।

এখন প্রশ্ন হলো উনিশ শতকে এসব নব্য ব্যবসায়ীদের পরিচয় কি? আঠার শতকের শেষে ঢাকার বড় ব্যবসায়ীরা ঢাকা ত্যাগ করলে গুটিকতক স্থানীয় হিন্দু ব্যবসায়ী এবং আরমেনীয়, কাশ্মীরি ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে। এখানে বাঙালি মুসলমানের কোনো অস্তিত্ব ছিলনা।  বিষয়টি মোগল আমল থেকেই লক্ষ  করা গেছে।  ঢাকার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। এদের মধ্যে সুবর্ণ বণিক, সাহা, বসাক (তাঁতী) ব্যবসা বাণিজ্য ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে।

১৮৪০ সালের পর থেকে ঢাকার অর্থলগ্নী ব্যবসা পরিচালনা করে পোদ্দার সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দুরা। ঢাকার মুসলমানরা এসব ব্যবসায় ধর্মীয় কারণে আগ্রহ দেখাত না। তবে ঢাকার চামড়ার ব্যবসায় একটি বহিরাগত মুসলিম পরিবারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। ঢাকার চামড়া ব্যবসায়ী খাজা আলিমুল্লাহ এবং তার পুত্র আব্দুল গনি বিপুল বিত্তের মালিক হয়ে ঢাকার জমিদারী লাভ করেন। খাজা আব্দুল গনি ও তার পরিবার আধুনিক ঢাকার সকল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আরমেনিয় ব্যবসায়ী পোগজ পরিবার ঢাকার শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখেন। ঢাকার এন,পি,পোগজের কথা পূর্বেই বলা হয়েছে । উনিশ শতকের ঢাকার অপর ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ছিলেন স্কটল্যা-ের আলেকজা-ার ফোর্বেস। এই ব্যবসায়ীই  ঢাকার প্রথম সংবাদপত্র The Dacca News (১৮৫৬) সম্পাদনা করেন। তাকে ঢাকার আধুনিক সাংবাদিকতার জনক বলা হয়। তার উত্তরসুরী ই.সি. কেম্পও ঢাকার সংবাদপত্রের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। 

এক্ষেত্রে একটি মিল দেখা যাচ্ছে, কলকাতার প্রথম সংবাদপত্র ছিল ইংরেজি ভাষায় (বেঙ্গল গেজেট, ১৭৮০) এবং প্রকাশক ছিলেন বিদেশী ইংরেজ ব্যবসায়ী ( অগাস্টাস হিকি), আর ঢাকার প্রথম সংবাদপত্রটিও প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজি ভাষায় এবং প্রকাশক- সম্পাদক গোষ্ঠী ছিলেন অবাঙালি ব্যবসায়ী ।

ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। এসময় ঢাকার পোদ্দাররাও এক পর্যায়ে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী বনে যান। ফরাশগঞ্জের দাস পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিখ্যাত মথুরানাথ পোদ্দার। তাদের পৈত্তিক নিবাস বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ে শুভড্যা গ্রামে। তারা হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েন। মথুরানাথও ঢাকার শিক্ষা ও সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তার দুই ছেলে স্বরূপ চন্দ্র দাস এবং মধুসুদন দাস ঢাকার ব্যাংকিং ব্যবসা শুরু করে অর্থনৈতিকভাবে খ্যাতি লাভ করেন।

ফরাশগঞ্জে এখনো তাদের “রূপ লাল হাউজ” স্মৃতি বহন করছে।২১ ফরাশগঞ্জের এই দাস পরিবার উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ঢাকার শিক্ষা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জগতে ব্যাপক অবদান রেখে আসছে। সুতরাং আঠার শতকের দ্বিতীয় ভাগে ঢাকার সাহিত্য, সংবাদপত্র জগতের যে উত্থান ঘটেছিল তা  আকস্মিক বা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না।

ঢাকায় সভাসমিতির উদ্ভব ও সংবাদপত্র
উপরোক্ত আলোচনায় এটা বলা হচ্ছে না যে, ১৮৪০-৫০ থেকে প্রশাসনিক উন্নতি, ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি ও শিক্ষা উন্নতিতে  কলকাতার ন্যায় ঢাকায় বিশাল একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল। তবে একটি নতুন চেতনা বা জাগরণ ঘটেছিল শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। আর তা কলকাতার তুলনায় সীমিত পরিসরেই বৃদ্ধি পেয়েছিল। পূর্ববঙ্গের প্রধান শহর ঢাকার সংবাদ-সাময়িকপত্রের উদ্যোক্ততা ও সাংবাদিকবৃন্দ ছিলেন মধ্যবত্তি শ্রেণীর অন্তর্গত। আর ঢাকা কিংবা পূর্ববাংলার সমগ্র জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশই ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্গত। এরা কেউ কেউ কোনো না কোনো সভা সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিশেষ গোষ্ঠী বা সমিতির সদস্যগণ সমাজ কল্যাণের জন্যই এসব সভা সমিতি গড়ে তুলেছিলেন। এসব সভা সমিতি বা গোষ্ঠীর মতবাদ প্রচার করার জন্যে মুখপত্র হিসেবে ঢাকা তথা পূর্ববাংলায় সংবাদপত্রের বিকাশ ঘটে। যেমন ঢাকায়  ঢাকা প্রকাশ নামে (১৮৬১) প্রথম যে বাংলা সংবাদপত্রটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল- তা ছিল ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র। পরবর্তীতে মালিকানা ও সম্পাদকের পরিবর্তন হলে ঢাকা প্রকাশও গোঁড়া হিন্দু সমর্থকে পরিণত হয়।

আঠার শতকের শেষের দিকে এ দেশে আগত ইংরেজরাই উদ্যোগী হয়ে বাংলায় প্রথম সভা সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সূত্র ধরে উনিশ শতকের কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি-যারা পাশ্চাত্য ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন- তাদের উদ্যোগে সভা সমিতি গড়ে ওঠে। এসব সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বীয় সমাজের হিত সাধন ও সংস্কার কার্য পরিচালনা করা। বাঙালির উদ্যোগে প্রথম সভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৫ সালে। ‘আত্মীয় সভা’ নামে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তার উদ্যোগেই তিন বছর পর ১৮১৮ সালে কোনো বাঙালির দ্বারা প্রথম সংবাদপত্র বাঙ্গালা গেজেটি প্রকাশিত হয়েছিল। এর মাত্র একমাস আগে মিশনারিরা সমাচার দর্পন প্রকাশ না করলে বাঙ্গালা গেজেটিই প্রথম বাংলা সংবাদপত্রের দাবিদার হতো। যাহোক তারপর এ উদ্যোগ আর থেমে থাকেনি।

সেকালের কলকাতার কবি-সাংবাদিক ইশ্বরগুপ্ত (সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদক), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখের উদ্যোগে নানা সভা সমিতি গড়ে ওঠে আঠার শতকের প্রথম ভাগেই। কিন্তু পূর্ববঙ্গের প্রধান শহর আর অখ- বাংলার দ্বিতীয় বড় শহর ঢাকায় স্বাভাবিক কারণেই কলকাতার সমতালে সভা-সমিতি গড়ে ওঠেনি। ঐ একই কথা, বিলম্বে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আত্মবিকাশ। পূর্ববঙ্গের অনেক শিক্ষিত চাকুরীজীবী ও জমিদার শ্রেণীর বসবাস ছিল রাজধানী শহর কলকাতায়, যেখানে সকল নাগরিক সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান ছিল।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন জানিয়েছেন, ঢাকার প্রথম (গোটা পূর্ববঙ্গে প্রথম) সভাটির উদ্ভব হয়েছিল ১৮৩৮ সালে। তাঁর মতে, ঢাকায় স্থাপিত প্রথম সভাটির নাম ছিল ‘তিমির নাশক সভা’।২২ ১৮৪৬ সালে ঢাকায় কলকাতার অনুসরণে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা পায় যার কথা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। ১৮৫১ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ঢাকা ক্লাব’ এবং ১৮৫২ সালে ‘বেথুন সোসাইটি’ শাখা। এ সকল সভা সমিতির উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড।

উনিশ শতকের আশি দশক থেকে ঢাকার সভা সমিতির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তাতে সংবাদ সাময়িকপত্রের প্রকাশনাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। ধারণা করা যায় ঢাকার অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও প্রশাসনিক উন্নয়নের সূত্রপাত উনিশ শতকের চল্লিশ দশক থেকে শুরু হলেও তার পূর্ণতা আসে সত্তর-আশির দশক থেকে। এই সকল উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে যেমন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, আবার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিন্তা-ধারা বিকাশের সঙ্গে জড়িত থাকে সংবাদ-সাময়িকপত্রের।

এ সকল সভা সমিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন ঢাকর সাংবাদিক ও সম্পাদকবৃন্দ। যেমন ঢাকার বিখ্যাত বান্ধব পত্রিকার (প্রথম প্রকাশ ১৮৭৪) সম্পাদক কালী প্রসন্নঘোষ ছিলেন ‘শুভ সাধিনী (প্রতিষ্ঠা ১৮৭১) সভার বিশেষ উদ্যোক্তা। তিনি একাধারে  ব্রাহ্ম আন্দোলনের নেতা এবং স্ত্রী শিক্ষা ও নারী মুক্তির সমর্থক। নিম্নে ঢাকার কয়েকটি সভা সমিতির বিবরণ দেয়া গেল, যেগুলি সরাসরি সংবাদ-সাময়িকপত্র প্রকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।

সভা সমিতির নাম        প্রতিষ্ঠাকাল        মুখপত্র (সংবাদপত্র/সাময়িকপত্র)

মনোরঞ্জিকা সভা            ১৮৬০            মনোরঞ্জিকা

জ্ঞানমিহির বিকাশিনী         ১৮৬০                 সংস্কার সংশোধনী

হিন্দু ধর্মরক্ষিণী সভা         ১৮৬৫            হিন্দু হিতৈষিণী

সঙ্গত সভা             ১৮৭০            বঙ্গবন্ধু

শুভা সাধিনী             ১৮৭১            শুভ সাধিনী

বাল্যবিবাহ নিবারিণী         ১৮৭৩            মহাপাপ বাল্য বিবাহ

সারস্বত সমাজ             ১৮৮১            সারস্বত পত্র

টেম্পারেন্স সোসাইটি         ১৮৮৭             যুবক হৃদয়

উদ্দেশ্য মহৎ             ১৮৮৯            উদ্দেশ্য মহৎ

সাহা সমিতি            ১৯০৪            নববিকাশ

উৎস: ওয়াকিল আহমদ প্রণীত, উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা চেতনার ধারা এবং মুনতাসীর মামুন প্রণীত‘উনিশ শতকে পূর্ববাংলার সভাসমিতি’ গ্রন্থের সাহায্যে তৈরি।

দেখা যাচ্ছে, ঢাকার সংবাদ-সাময়িকপত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত সভা সমিতিগুলি অধিকহারে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল উনিশ শতকের ৭০-৮০ দশকে। সম্ভবত, এ সময় ঢাকার ব্রাহ্ম আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠেছিল ।একই সঙ্গে এই সংস্কারবাদী ব্রাহ্ম সমাজের বিপরীত ধারায় সৃষ্টি হয় ‘হিন্দু ধর্মরক্ষিণী সভা’। এতে সুবিধা হয়েছিল সংবাদ সাময়িকপত্রের এবং ঢাকার মুদ্রণ ব্যবস্থার। তারাও তাদের চিন্তা ও মতের বিকাশ ও প্রচার ঘটানোর জন্যে সংবাদপত্রের চর্চা করেছিলেন।

অপর একটি প্রাসঙ্গিক চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে, ১৮৮৩ সালের পূর্বে ঢাকা নগরীতে মুসলমানদের কোনো সভা-সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর সংবাদপত্রতো নয়ই। ১৮৮৩ সালে ‘ঢাকা মুসলমান সুহৃদ সম্মিলনী’ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন আব্দুল মজিদ। এর দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো মাহুতটুলির মুন্সি নূর বক্স্রের বাসায়।

কিন্তু আলোচ্য সময়ে কলকাতায় আব্দুল লতিফের মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি (১৮৬৩) এবং সৈয়দ আমীর আলীর সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান এ্যসোসিয়েশন (১৮৭৭) সহ সুধাকর গোষ্ঠী (১৮৮৯) প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এমনকি চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় প্রথম দুটি সংগঠনের শাখা প্রতিষ্ঠিত (১৮৮৩ ) হলেও ঢাকায় এর কোনো শাখা খোলার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

ঢাকায় মুদ্রণযন্ত্রের উদ্ভব : বাংলা গ্রন্থ প্রকাশনা ও সংবাদপত্র

ছাপাখানা বা মুদ্রণযন্ত্রের সঙ্গে সংবাদপত্রের বিকাশ ও প্রকাশের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাধারণত সংবাদপত্র প্রকাশের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হল মুদ্রণযন্ত্র বা ছাপাখানার অনুপস্থিতি। যে সমাজ ও স্থানে যত আগে মুদ্রণযন্ত্রের কাজ শুরু হয়েছে সেখানেই সংবাদ সাময়িকপত্রের উদ্ভব হয়েছে দ্রুত। ঢাকার মূদ্রণব্যবস্থা আলোচনার পূর্বে বাঙলা মুদ্রণযন্ত্রের প্রসঙ্গ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দরকার।

ভারত উপমহাদেশে মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয় কোম্পানির শাসনামলে। পর্তুগিজ ধর্ম প্রচারকগণ মুদ্রণযন্ত্রের উদ্যোক্ততা। যতদুর জানা যায়, পর্তুগিজরা ১৫৫৬ সালে ভারতের পশ্চিম উপকূলের গোয়া নগরে প্রথম মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেন। কলকাতায় মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয় ১৭৮০ সালে এবং এখান থেকেই ভারত উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তার পূর্বেই সম্ভবত হুগলীতে পর্তুগিজ পাদ্রীরা একটি মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।২৩

তবে ১৭৬৬ সালে উইলিয়াম বোল্টস নামে এক ইউরোপীয় কলকাতা থেকে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করতে কোম্পানি সরকারের নিকট আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার অনুমতি প্রদান করেনি। ধারণা করা যেতে পারে ১৭৮০ সালের পূর্বে কলকাতায় মুদ্রণযন্ত্র ছিল। তা না হলে বোল্টস সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ কীভাবে নিয়েছিলেন।  

হুগলীর ‘শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস’ স্থাপিত হয় ১৮০০ সালে। এটি ছিল বাংলা ভাষার প্রথম প্রেস।২৪ এর উদ্যোক্তা ছিলেন তিন ইউরোপীয় তিন ব্যক্তি, যথা জোওয়ামার্শম্যান (১৭৬০-১৮৩৭), উইলিয়াম কেরী (১৭৬১-১৮৩৪) ও উইলিয়াম ওয়ার্ড (১৭৬৯-১৮২১)। ১৮১৬ সালে কলকাতায় ফোরিস কোম্পানি প্রেস স্থাপিত হয়। গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় এই প্রেস থেকে প্রথম বাংলা মুদ্রিত বই  অন্নদা মঙ্গল প্রকাশিত হয়।

বাংলা মুদ্রণ যন্ত্রের ইতিহাসে ১৮১৮ সালটি বিশেষ তাৎপর্যবহ। এই সালে হুগলীর শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে জোওয়া মার্শম্যান কর্তৃক প্রথম মাসিক দিগদর্শন পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এটি বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র বলে এ পর্যন্ত ধারণা করা হয়। একই সালে প্রায় কাছাকাছি সময়ে কলকাতায় বাংলা মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়। এ মুদ্রণযন্ত্রটির নাম ছিল ‘বাঙ্গালা গেজেট প্রেস’। বাঙালি গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ছিলেন প্রেসটির মালিক।

তিনি হুগলীর শ্রীরামপুর মিশন প্রেসে কম্পোজিটার হিসেবে কাজ শিখে কলকাতায় প্রেস স্থাপন করেন। ‘বাঙ্গাল গেজেট প্রেস’ থেকেই দিগদর্শন এর সমসাময়িককালে কলকাতা থেকে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য বাঙ্গালা গেজেট নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ দিক থেকে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য প্রথম বাঙালি পেশাদার সাংবাদিক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক।

কলকাতায় ১৭৮০ সালে ইংরেজি প্রেস এবং ১৮১৬ ও ১৮১৮ সালে বাংলা প্রেস স্থাপিত হলেও ঢাকায় প্রায় অর্ধ শতাব্দীর পর মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়। এতেই অনুধাবন করা যায় কলকাতা ও ঢাকার মধ্যে উন্নয়নের  ব্যবধান। এই রূপ বিলম্বের অন্যতম কারণ একটি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অনুপস্থিতি। ইতোপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি কীভাবে উনিশ শতকের মধ্যভাগে এসে ঢাকায় একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল।

১৮৫৬ সালে ঢাকায় ইউরোপীয়দের সহযোগিতায় একটি ইংরেজি মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়। এই মুদ্রণযন্ত্র থেকেই ঢাকার প্রথম সংবাদপত্র ঢাকা নিউজ (ঞযব উধপপধ ঘবংি) প্রকাশ করা হয়। ঢাকায় প্রথম এই মুদ্রণ যন্ত্রটি স্থাপন করেন আলেকজান্ডার ফোর্বেস। তিনি ছিলেন নীলকর এবং ঢাকার প্রথম সাংবাদিক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর।২৫ এই প্রেস বা ছাপাখানায় বাংলা মুদ্রণের ব্যবস্থা ছিল না। ঢাকায় বাংলা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় আরও চারবছর পর। তবে পূর্ব বাংলার প্রথম মুদ্রণযন্ত্রটি ঢাকায় নয়, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রংপুরের কাকিনায়।

১৮৪৭ সালে ‘বার্ত্তাবহ যন্ত্র’ নামে শিক্ষানুরাগী জমিদার গুরুচরণ রায়ের অর্থায়নে ছাপাখানাটি স্থাপন করা হয়। এখান থেকেই পূর্ব বাংলার প্রথম সংবাদপত্র রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ প্রকাশিত হয়। যাহোক, ১৮৬০ সালটি ঢাকার সংবাদপত্র ও মুদ্রণ জগতের জন্যে বিখ্যাত হয়ে আছে। ১৮৬০ সালে ঢাকার ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ নামে প্রথম বাংলা ছাপাখানা স্থাপিত হয়। ঢাকার সাহিত্য সংস্কৃতি ও সংবাদপত্রের উদ্ভব ও বিকাশের জন্যে ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ পথিকৃৎ ভূমিকা পালন করে। ঢাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ব্রজসুন্দর মিত্র, ভগবানচন্দ্র বসু, কাশিনাথ মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় বাংলামুদ্রণ যন্ত্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রজসুন্দর মিত্র (১২২৭-১২৮০ বঙ্গাব্দ) ছিলেন ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠাতা এবং আবগারী কালেক্টর।

আরমানিটোলাস্থ তার নিজস্ব বাড়িতে বাঙ্গালা যন্ত্র প্রেস স্থাপন করা হয়।২৬ ভগবান চন্দ্র বসু (১৮২৯-১৮৯২) ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকার শিক্ষানুরাগী। তাঁর সুযোগ্যপুত্র বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্র বসু। আর কাশিনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ঢাকার স্কুল ইন্সপেক্টর। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ঢাকা বকশী বাজার পাঠশালার শিক্ষক হরিশচন্দ্র মিত্র এবং ঢাকা মডেল স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক ও কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার। এঁরা সবাই ছিলেন ঢাকার তথা পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিভু। ঢাকার এই মধ্যবিত্ত সংখ্যাটি খুব অধিক ও শক্তিশালী ছিল তা বলার সুযোগ নেই। এ সকল শিক্ষিত বিদ্বান ব্যক্তিরা তাঁদের পাশ্চাত্য ইংরেজি শিক্ষা লব্ধ সামাজিক ও ধর্মীয় চিন্তা ভাবনাকে প্রচারের মাধ্যম হিসেবেই প্রথম মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেন এবং তা থেকে সাহিত্য বই, স্কুল পাঠ্যবই প্রকাশের উদ্যোগ নেয়।

তাঁদের নেতৃত্বে ১৮৬০ সালেই প্রথম বাংলা সাহিত্য সাময়িকী কবিতা কসুমাবলী প্রকাশের মধ্য দিয়ে ঢাকায় বাংলা সংবাদ সাময়িকপত্র প্রকাশের পথ সূচনা করে।  দেখা যায়, কয়েকমাস ব্যবধানে এই ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত পরপর মনোরঞ্জিকা ও নব ব্যবহার সংহিতা সাহিত্য সাময়িকী। এই বাঙ্গালা যন্ত্র থেকে ১৮৬০ সালে দীনবন্ধু মিত্রের কালজয়ী নাটক নীল দর্পন প্রকাশিত হয়।২৭    

পরের বছর ১৮৬১ সালে ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ প্রেস থেকে ঢাকার প্রথম সংবাদ নির্ভর সংবাদপত্র সাপ্তাহিক ঢাকা প্রকাশ এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ ঢাকার সাহিত্য-সংস্কৃকি তথা সামাজিক জীবনে কতবড় বিপ্লব এনেছিল উপরোক্ত প্রকাশনা থেকে অনুমান করা যায়। এঘটনাটি শুধু ঢাকা নয়, গোটা পূর্ব বাংলার মুদ্রণ শিল্পের বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে। ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ প্রেসকে অনুসরণ করে ষাটের দশক থেকে বাণিজ্যিকভাবে আরো পাঁচ-ছয়টি প্রেস ঢাকায় স্থাপিত হয়। এগুলির মধ্যে নুতন যন্ত্র, সুলভ যন্ত্র, গিরিশ যন্ত্র, পূর্ববঙ্গ প্রেস, শীতল প্রেস অন্যতম। ঢাকার সংবাদ-সাময়িকপত্র বিকাশে প্রেসগুলি কীরূপ ভূমিকা পালন করেছিল তা নিম্নের প্রকাশনা ছক থেকেই ধারণা পাওয়া যায়।

‘নুতন যন্ত্র’ প্রেস থেকে মুদ্রিত পত্র-পত্রিকা ছিল অবকাশ রঞ্জিকা (মাসিক ১৮৬২), চিত্ত রঞ্জিকা (মাসিক ১৮৬২),সুলভ যন্ত্র প্রেস থেকে মুদ্রিত হয়েছিল ঢাকা দর্পন (সাপ্তাহিক ১৮৬৩), কাব্য প্রকাশ (মাসিক ১৮৬৪), হিন্দু রঞ্জিকা (মাসিক ১৮৬৬), হিন্দু হিতৈষিণী (১৮৬৫),গিরিশ যন্ত্র প্রেস থেকে মিত্র প্রকাশ (মাসিক ১৮৭০), বান্ধব (মাসিক ১৮৭৪), পূর্ববঙ্গ প্রেস থেকে ভিষক (মাসিক ১৮৮১), বঙ্গবন্ধু (মাসিক ১৮৮৮), আর    শীতল প্রেস থেকে  রত্নাকর (পাক্ষিক ১৮৮৪)প্রকাশিত হয়েছিল।২৮

ঢাকার মুদ্রণযন্ত্র এবং সংবাদ-সাময়িকপত্র প্রকাশকে কেন্দ্র করে ঢাকায় একদল লেখক-সাংবাদিক সৃষ্টি হয়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, কালীপ্রসন্ন ঘোষ, হরিশচন্দ্র মিত্র, শ্রীনাথ চন্দ্র, হরচন্দ্র চৌধুরী, দীনেশচরণ বসু প্রমুখ যারা ঢাকার সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক বাহক ছিলেন। সুতরাং ঢাকায় সংবাদ-সাময়িকপত্রের উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে ঢাকায় মুদ্রণযন্ত্র প্রতিষ্ঠা এক গুরুত্বপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণের ভূমিকা পালন করে।

উনিশ শতকে ঢাকার সংবাদ-সাময়িকপত্র

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ঢাকায় সংবাদপত্র প্রকাশের সকল আয়োজন শুরু হয় উনিশ শতকের চল্লিশ-পঞ্চাশ দশক থেকে। সর্বশেষ ১৮৬০ সালে ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ ও অন্যান্য বাংলা প্রেস চালুর সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার সংবাদপত্র তার অগ্রযাত্রা শুরু করে। এ পর্যায়ে উনিশ শতকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পত্র-পত্রিকার উদ্ভব ও বিকাশ বর্ণনা করব। ঢাকার পত্র-পত্রিকার নিম্নোক্ত তালিকা প্রকাশকাল ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে মূলত ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা সাময়িক পত্র (১ম ও ২য় খ-), কেদারনাথ মজুমদারের বাঙ্গালা সাময়িক সাহিত্য, মুনতাসীর মামুন প্রণীত উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িকপত্র (১ম খ-): ১৮৪৭-১৯০৫’ এবং মোহাম্মদ আবদুল কাইউম প্রণীত উনিশ শতকে ঢাকার সাহিত্য ও সংস্কৃতি গ্রন্থ থেকে। অন্যান্য সূত্র থেকেও সাহায্য নেয়া হয়েছে যা তথ্যসূত্র স্থানে উল্লেখ রয়েছে।

ঢাকা নিউজ : ১৮ এপ্রিল ১৮৫৬ সালে ঢাকা নিউজ এর প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়। মৃণালকান্তি চন্দ তাঁর হিস্ট্রি অব দ্য ইংলিশ প্রেস ইন বেঙ্গল গ্রন্থে লিখেন যে, ১৮৫৬ সালের ২১ এপ্রিল তারিখে ঢাকা নিউজ প্রকাশ হয়েছিল।২৯ পত্রিকাটি ইংরেজি সাপ্তাহিক। ঢাকার প্রথম সংবাদপত্র ঢাকা নিউজ এর সম্পাদক আলেকজান্ডার ফর্বেস(A.Forbes.Esqr)। মুদ্রণ ও প্রকাশক ছিলেন জে.এ.মিনাস। ঢাকা নিউজ এর পৃষ্ঠপোষকগণ ছিলেন ঢাকার এলিট ও কয়েকজন নীলকর। এঁদের মধ্যে ছিলেন নব্য জমিদার ঢাকার খাজা আব্দুল গণি (১৮৩০-১৮৯৬) এবং এন.পি.পোগোজ।

উদ্যোক্তাদের কেউ বাঙালি ছিলেন না। পত্রিকাটি কোনো অর্থেই বাঙালি সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিল না। কাজেই একথা বলার উপায় নাই যে, ঢাকার নিউজ এর সূত্র ধরেই ঢাকার মধ্যবিত্ত সমাজের সংবাদপত্র জগতে শুভযাত্রা হয়েছিল। পত্রিকাটি সব সময়ই সমকালীন ব্রিটিশ বিরোধী নীল বিদ্রোহ, ফরায়েজি বিদ্রোহ ও কৃষক বিদ্রোহের বিরুদ্ধে ছিল। পত্রিকাটি প্রকাশের একবছর পরই ঢাকার লালবাগের কেল্লায় সিপাহি বিদ্রোহ দেখা দেয়। সিপাহিদের বিরুদ্ধে ঢাকা নিউজ অনবরত প্রচারণা শুরু করে।

ঢাকা নিউজ ছাপা হতো ‘ঢাকা প্রেস’ থেকে। ‘ঢাকা প্রেস’ এর মালিক ছিলেন আর্মেনিয় ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী এন পি পোগেজ, এ এম ক্যামরন, জে. এ গ্রেগ, জে. পি ওয়াইজ এবং অবাঙালি মুসলমান ও ঢাকার নবাব বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা খাঁজা. এ গণি। এ সকল ব্যক্তিরা ঢাকা নিউজ পত্রিকারও উদ্যোক্তা ছিলেন। ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা নিউজ চলছিল।

কবিতা কুসুমাবলী (সাহিত্য মাসিক, ১৮৬০) :কবিতা কুসুমাবলী একটি মাসিক সাহিত্য সাময়িকী এবং ঢাকার প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র। ১৮৫৬ সালে ঢাকার প্রথম সংবাদপত্র (ইংরেজি) প্রকাশের চার বছর পর বাংলা পত্রিকা প্রকাশের কারণ সম্ভবত: বাংলা ছাপাখানার অভাব এবং ১৮৫৮ সালে বিদ্রোহের সময় সংবাদপত্র দমন আইন জারি (গেগিং অ্যাক্ট)।৩০ অল্পদিন পর অ্যাক্ট প্রত্যাহার এবং ১৮৬০ সালে ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ প্রেস প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৮৬০ সালের মে মাসে (জ্যৈষ্ঠ ১২৬৭) কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের সম্পাদনায় সাময়িকীটি প্রকাশিত হয়।

আজকের ঢাকার বিশাল সাংবাদিক গোষ্ঠীর পথিকৃৎ কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার(১৮৩৪-১৯০৭)। জানা যায়, আর এক কবি হরিশচন্দ্র মিত্র (১৮৩৮-১৮৭২)পত্রিকাটির প্রকাশক ছিলেন।৩১ কবিতা কুসুমাবলীতে দুইজন মুসলমান কবি-লেখকের ছদ্ধ নাম পাওয়া যায়। ১৮৬০ সালে ঢাকার সংবাদপত্রের লেখক হিসেবে মুসলমান কবির আবির্ভাব বিষয়টি কৌতুহলোদ্দীপক। এই সাময়িকীটির প্রথম দিকে বার্ষিক মূল্য ছিল এক টাকা। ১৮৬০ সালে ঢাকা থেকে আরও তিনটি সাহিত্য সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

কবিতা কুসুমাবলী  প্রকাশের একমাস পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিল  পূর্ববাংলার রংপুর থেকে সাপ্তাহিক রঙ্গপুর দিকপ্রকাশ(এপ্রিল, ১৮৬০)। উল্লেখ, পূর্ব বাংলার তথা আজকের বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্রটি( রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ)। তবে তা ঢাকা থেকে নয় রংপুরের কাকিনা থেকে ১৮৪৭ সালে প্রকাশ হয়েছিল। আর সাপ্তাহিক রঙ্গপুর দিকপ্রকাশ(এপ্রিল, ১৮৬০) ছিল পূর্ববাংলার দ্বিতীয় পত্রিকা।

মনোরঞ্জিকা (মাসিক, প্রকাশকাল ১৮৬০) :ঢাকার মনোরঞ্জিকা সভার মুখপত্র হিসেবে ১৮৬০ সালে জুন মাসে মাসিক মনোরঞ্জিকা প্রকাশ হয়েছিল (আষাঢ় ১২৬৭)। এটিও ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ প্রেস থেকে মুদ্রিত হয়। কলকাতার সোমপ্রকাশের সূত্রমতে, সাময়িকীটির সম্পাদক ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, প্রকাশক মহেশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, এবং মুদ্রাকর হরিশচন্দ্র মিত্র। আর ঢাকার নরমাল স্কুলের প্রধান সহকারী অভয়চরন রায়ের উদ্যোগে ঢাকায় মনোরঞ্জিকা সভা স্থাপিত হয়। এটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত দ্বিতীয় সাময়িকপত্র।

নবব্যবহার সংহিতা (মাসিক, আগস্ট ১৮৬০) :১৮৬০ সালে ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ থেকে মুদ্রিত হয় নবব্যবহার সংহিতা। পত্রিকার শিরোনামটি ভিন্ন প্রকৃতির। সম্পাদক ছিলেন রামচন্দ্র ভৌমিক। তিনি ঢাকার সদর আদালতের উকিল ছিলেন। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার সোমপ্রকাশের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেন,এ পত্রিাকায় সরকারের গেজেট ও অন্যান্য সার্কুলার বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হতো।৩২ একই সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত তৃতীয় পত্রিকাটি ছিল সংস্কার সংশোধনী, যার সম্পাদক  স্কুল শিক্ষক জগন্নাথ সরকার।

ঢাকা প্রকাশ (সাপ্তাহিক,৭ মার্চ ১৮৬১): ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ দিনটি ঢাকার ইতিহাসে যেমন  গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে, এর ঠিক নব্বই বছর পূর্বে  ঢাকার একই দিনে ঢাকা থেকে  প্রথম সংবাদ নির্ভর সাপ্তাহিক পত্রিকা ঢাকাপ্রকাশ প্রকশিত হয়ে ঢাকার ইতিহাসকে উজ্জল করে রেখেছে। এটিও ব্রজেন্দ্রনাথের মতে বাবুবাজারে অবস্থিত ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়।

ঢাকা প্রকাশ নিয়ে হালে মুনতাসীর মামুন এবং মোহাম্মদ আবদুল কাইউম বিস্তর গবেষণা করেছেন । এখানে প্রাসঙ্গিক কিছু নতুন তথ্য দেয়া হলো।  ঢাকা প্রকাশ শুধু পূর্ববাংলার নয়- উভয় বাংলার দীর্ঘস্থায়ী পত্রিকা (১৮৬১-১৯৬১)। কলকাতায় উনিশ শতকের তৃতীয়  দশক থেকে ইশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদপ্রভাকরকে (প্রথম প্রকাশ ২৮ জানুয়ারি ১৮৩১) কেন্দ্র করে সংবাদপত্র চর্চার মাধ্যমে যে একটি বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চার ব্যাপক জাগরণ ঘটেছিল, ঢাকায় উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্রাকারে হলেও একটি সাংবাদিক-সাহিত্যিক সমাজের সৃষ্টি হয়েছিল।

তবে ব্রজেন্দ্রনাথের প্রদত্ত সূত্র থেকে হিসাব করলে দেখা যায়, ১৮৩১ সালে সংবাদপ্রভাকর প্রকাশের পূর্বে শধু কলকাতা থেকেই ছোটবড় ১০টি (আর গোটা বাংলা থেকে ১৩টি)পত্রিকা প্রকাশ হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা প্রকাশ ঢাকার প্রথম সংবাদভিত্তিক পত্রিকা মাত্র। এরপূর্বে  ১৮৬০ সালে তিনটি সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়। পূর্বে উল্লিখিত ‘বাঙ্গালা যন্ত্রের’ পরিচালকবৃন্দ ঢাকা প্রকাশ প্রকাশ করেন। কলকাতার বিখ্যাত সোমপ্রকাশ অনুকরণে ঢাকা প্রকাশ নাম করণ করা হয়।

আবার ঢাকা প্রকাশের অনুকরণে ঢাকার ঢাকা গেজেট (১৮৬১), ঢাকা দর্পন (১৮৬৩), ঢাকা দর্শক (১৮৭৫) প্রকাশিত হয়েছিল। পার্থ চট্টোপাধ্যায় সরকারি একটি সূত্র ব্যবহার করে দেখান যে, ১৮৬৭ সালে ঢাকা প্রকাশের প্রচার সংখ্যা ছিল ২৬৯ এবং ১৮৭৭ সালে ৪০০ কপি।৩৩ সেকালের ঢাকার শিক্ষিত পাঠকের কথা চিন্তা করলে প্রচার সংখ্যাটি নেহায়েৎ কম নয়। তবে একই সময়ে (পূর্ব সূত্রমতে)কলকাতার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ১৮৭৭ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সোমপ্রকাশের প্রচার সংখ্যা ছিল ৭০০ কপি। এটি ছিল বাংলার দুটি শহরের দুটি প্রথমসারির জনপ্রিয় সংবাপত্রের প্রচার সংখ্যার ব্যবধান। তাতে পাঠকগোষ্ঠীর সংখ্যার ধারাটিও অনুধাবন করা যায়।  

ঢাকা প্রকাশের প্রথম সম্পাদক কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার। ব্রজসুন্দর মিত্র এবং দীনবন্ধু মৌলিক পত্রিকাটির বিশেষ উদ্যোক্তা। তবে মানিকগঞ্জের মৌলভী আব্দুল করিম ঢাকা প্রকাশের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলে জানা যায়।  সম্পাদক হিসেবে কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের বেতন ধরা হয়েছি মাত্র ২৫ টাকা।  ষাটের   দশকে সার্বক্ষণিক এক সম্পাদকের ২৫ টাকা বেতন তেমন বেশি ছিল না। একটু তুলনা করার জন্যে সমসাময়িক দুটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়।

১৮৭৮ সালে ঢাকার একটি এডাল্ট ফিমেল স্কুলের শিক্ষিকার বেতন ছিল ৬০ টাকা। আর তার পূর্বে ১৮৪৩ সালে কলকাতার একজন সম্পাদকের (অক্ষয়কুমার দত্তের) বেতন ছিল মাসিক ৪০ টাকা( সূত্র: স্বপন বসু, সংবাদ সাময়িকপত্রে উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ ১ম খ-, কলকাতা,২০০৩, পৃ.৬৮)। যাহোক,ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক দীননাথ সেন এবং কবি দীনেশচরন বসু ঢাকা প্রকাশের পরবর্তী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র হিসেবে সমাজ সংস্কারের প্রগতিশীলতার দাবি নিয়ে পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশ পায়। সময়ে সময়ে পত্রিকাটির আদর্শ পরিবর্তিত হয়। ঢাকা প্রকাশ পূর্ববাংলা মানুষের মুখপত্র ছিল। ঢাকার আধুনিক ও যুক্তিবাদী গোষ্ঠীর চিন্তা ধারার বহি:প্রকাশ ঘটেছিল  বাংলা সংবাদপত্র ঢাকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

চিত্তরঞ্জিকা (মাসিক ১৮৬২) : চিত্ত রঞ্জিকা একটি সাহিত্য সাময়িকী। প্রকাশক সারদাকান্ত সেন, ঢাকা কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। এর সম্পাদক  ছিলেন হরিশচন্দ্র মিত্র। ১৪ মে ১৮৬২ সালে ১৬ পৃষ্ঠায় (ডিমাই ২ ফর্মা) সাময়িকীটি প্রকাশিত হয়। প্রতি সংখ্যার মূল্য দুই আনা ছিল বলে জানা যায়। চিত্তরঞ্জিকা পত্রিকায় কবি আহমদ এবং ‘এইচ’ এরূপ সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করে দুইজন মুসলমান কবি কবিতা লিখেন। গবেষকদের ধারণা ‘কবি আহমদ’ সম্ভবত: সলিমুদ্দিন আহমদ এবং ‘এইচ’ আব্দুল হামিদ খান ইউসফজয়ী।

ঢাকাবার্ত্তা প্রকাশিকা (সাপ্তাহিক জুন ১৮৬২) : ঢাকাবার্ত্তা প্রকাশিকা সমসাময়িক কুষ্টিয়ার গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার মতো দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী ছিল না। পত্রিকাটি ১৮৬২ সালের জুন মাসে প্রকাশ পায়। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সোমপ্রকাশের বরাত দিয়ে জানান, পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন রামচন্দ্র ভৌমিক। মুনতাসীর মামুন ব্রজেন্দ্রনাথের সূত্রকেই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু অন্যমতে ঢাকাবার্ত্তা প্রকাশিকার সম্পাদক ছিলেন হরিশচন্দ্র মিত্র।৩৪ পত্রিকাটি মাত্র ১ বৎসরকাল স্থায়ী হয়েছিল।

অবকাশরঞ্জিকা(মাসিক সেপ্টম্বর ১৮৬২): অবকাশরঞ্জিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মিত্র। এর মূল্য প্রতিসংখ্যা এক  আনা ছিল। এটি  মাসিক সাহিত্য সাময়িকী। ঢাকার নতুনযন্ত্র থেকে পত্রিকাটি মূদ্রিত হতো।
ঢাকাদর্পণ (সাপ্তাহিক জুলাই ১৮৬৩) : সম্ভবত: অল্পকালের মধ্যে ঢাকাবার্ত্তা প্রকাশিকা বন্ধ হয়ে গেলে পত্রিকা পাগল হরিশচন্দ্র মিত্র ঢাকা দর্পণ প্রকাশ করেন।

ঢাকার ইমামগঞ্জের সুলভ যন্ত্র ছাপাখানা পত্রিকাটি প্রকাশ পায়। ঢাকা প্রকাশের সময়কালেই পূর্ববাংলার বিখ্যাত সংবাদপত্র কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা( এপ্রিল ১৮৬৩)প্রকাশ পেয়েছিল। পত্রিকাটির সম্পাদক হরিনাথ মজুমদার। যাহোক, এক মানহানির মামলায় জড়িত হয়ে ১ বছর পরই (১৮৬৪) পত্রিকাটি প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।

কাব্যপ্রকাশ (মাসিক ১৮৬৪): ঢাকাদর্পণ বন্ধ হয়ে গেলে হরিশচন্দ্র মিত্র ১৮৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে কাব্য প্রকাশ নামে একটি মাসিক সাময়িকী সম্পাদনা করেন। নামকরণ থেকেই জানা যায় পত্রিকাটি ছিল সাহিত্য বিষয়ক। ঢাকার মোগলটুলির সুলভ যন্ত্র থেকে কাব্য প্রকাশ ছাপা হতো।
বিজ্ঞাপনী (সাপ্তাহিক মার্চ ১৮৬৫): ঢাকার বিজ্ঞাপনী যন্ত্র থেকে সাপ্তাহিক বিজ্ঞাপনী প্রকাশিত হয়।

‘বিজ্ঞাপনী যন্ত্র’ প্রেসটি মানিকগঞ্জের বালিয়াটির জমিদার গিরিশচন্দ্র রায় চৌধুরী ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বেতন পূর্বের ঢাকা প্রকাশের চেয়ে বেশী করে ৫০ টাকা ধার্য করা হয়। কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার একজন পাঁকা সম্পাদক ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় বিজ্ঞাপনী ঢাকার উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন সাপ্তাহিকী হিসেবে পরিচিতি পায়।

কলকাতার সংবাদপত্র সুযোগ পেলে মাঝে মধ্যে ঢাকার সংবাদপত্রের প্রশংসাও করত। কলকাতার সংাবদ পূর্ণচন্দ্রোদয় ১৯/৪/১৮৬৫ তারিখে লিখে; “কলিকাতায় যে যে বাঙ্গালা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশ হইয়া থাকে ঢাকার বিজ্ঞাপনী ও ঢাকা প্রকাশ ইহার কাহার দ্বিতীয় নহে।”

এক বছর পর ১৮৬৬ সালে বিজ্ঞাপনী প্রেস বিক্রি হয়ে যায় এবং তা ময়মনসিংহে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে বিজ্ঞাপনী  জগন্নাথ অগ্নিহোত্রীর সম্পাদনায় দুই বছর প্রকাশিত হয়েছিল। ব্রজেন্দ্রনাথ কলকাতার সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোয়ের এক রিপোর্টের বরাত দিয়ে লিখেন, যে পত্রিকার পরিচালক গিরিশচন্দ্র রায় চৌধুরীর সঙ্গে স্বাধীনচেতা সম্পাদক কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের  ব্রাহ্মধর্ম নিয়ে মতের অমিল দেখা দেয়ায় সম্পাদক পত্রিকা ত্যাগ করেন।৩৫ এতে বুঝা যায় ঢাকায় একটি হিন্দু রক্ষণশীল গোষ্ঠীও শক্তিশালী ছিল।  ধারণা করা হয় ১৮৬৬ সালের জানুয়ারি মাসেই কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার সম্পাদকের দায়িত্ব ত্যাগ করেন।

হিন্দু হিতৈষিণী (সাপ্তাহিক মার্চ ১৮৬৫): হিন্দু হিতৈষিণী নামকরণ দেখেই অনুধাবন করা যায় যে, হিন্দুদের ধর্ম ও সম্প্রদায়ের কল্যাণার্থে সাপ্তাহিকীটির উদ্ভব। ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং এর মুখপত্র ঢাকা প্রকাশের বিপরীতে হিন্দু হিতৈষিণী প্রকাশিত হয়। ঢাকা প্রকাশের ৫ বছরের মধ্যে ১৮৬৫ সালে হরিশচন্দ্র মিত্রের সম্পাদনায় হিন্দু হিতৈষিণী যাত্রা শুরু। মূলত: সংস্কারবাদী একেশ্বর ধর্ম ব্রাহ্ম ধর্মের বিপরীতে ‘হিন্দু ধর্ম রক্ষিণী’নামে যে ধর্মসভা প্রতিষ্ঠিত হয় এর মুখপত্র ছিল হিন্দু হিতৈষিণী। এই প্রাচীনপন্থি সভার নেতা ছিলেন বিক্রমপুরের জমিদার জগবন্ধু বসু এবং ঢাকার উকিল লক্ষèীকান্ত মুন্সি ।

হরিশচন্দ্র মিত্র এর সম্পাদক নিযুক্ত হওয়ার পূর্বে তিনি ব্রাহ্ম সমাজের নেতা ছিলেন। কলকাতার একটি সংবাদপত্র আক্ষেপ করে লিখে যে, “হরিশবাবু এতকাল চিরদুঃখিনী বঙ্গবিধাবাদিগের সাপক্ষে লেখনী সঞ্চালন করিয়া এক্ষণ তাহাদিগের বিপক্ষতাচরণ করিতেছেন, শিক্ষিত অন্ত:করণের এতাদৃশ পরিবর্তন অসম্ভবনীয়।”৩৬ হরিশচন্দ্র মিত্র ১৮৬৯ সালে সম্পাদকের দায়িত্ব ত্যাগ করলে আনন্দচন্দ্র সেন গুপ্ত সে দায়িত্ব নেন। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের ভাষ্য অনুযায়ী (১ম খ- পৃ. ৫৭)পত্রিকাটি ১৮৮০ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল।

পত্রিকাটির প্রচার সংখ্যা ছিল তিন শত। গোড়াপন্থি হওয়ায় মনে হয় পত্রিকাটি পাঠক প্রিয় ছিল।
অবলা বান্ধব (পাক্ষিক ১৮৬৯): ঢাকার সন্নিকটে বিক্রমপুরের লোনসিংহ গ্রাম থেকে ১০ জ্যৈষ্ঠ ১২৭৬ অবলা বান্ধব প্রকাশিত হয়।তবে ছাপার কাজ ঢাকার একটি প্রেস থেকেই সম্পন্ন হতো। ১৮৬৭ সালে পল্লী বিজ্ঞান নামে অপর একটি মাসিক পত্রিকা বিক্রমপুরের জৈনসার গ্রাম থেকে প্রকাশিত হয়। বিক্রমপুর প্রাচীনকাল থেকে অগ্রসরমান এলাকা এবং বর্ণ হিন্দু অধ্যুষিত।

কোম্পানি আমলে ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে অন্যান্য এলাকার বর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়ের ন্যায় বিক্রমপুরের হিন্দুরা কলকাতা ও ঢাকার নাগরিক জীবনে আধিপত্য বিস্তার করে। ঢাকার প্রথম ছাপাখানা ও সংবাদপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রেও তাদের মূখ্য ভূমিকা ছিল। যাহোক অবলা বান্ধবের সম্পাদক ছিলেন লোনসিংহ মিড্ল ইংলিশ স্কুলের হেড্ মাস্টার ব্রাহ্মকর্মী বাবু দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

পত্রিকাটি ঢাকার সুলভযন্ত্র থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হতো বলে এটি ঢাকার সংবাদপত্রের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। নারীবিষয়ক ঢাকার প্রথম পত্রিকা ছিল অবলা বান্ধব । পত্রিকাটি ছিল স্ত্রী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। উল্লেখ্য, এর কিছু পূর্বে ১৮৬৩ সালে নারীবিষয়ক বিখ্যাত পত্রিকা মাসিক বামাবোধিনী কলকাতার শহরতলী থেকে উমেশচদ্র দত্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল।

ব্রজেন্দ্রনাথ জানান ( পৃ.২, খ- দ্বিতীয়) ১৮৭০ সালে সম্পাদক কলকাতায় চলে গেলে সেখান থেকেই অবলা বান্ধব প্রকাশিত হতে থাকে। উনিশ শতকে পশ্চাৎপদ পূর্ববাংলা থেকে নারী স্বাধীনতার স্লোগান নিয়ে একটি মুখপত্র প্রকাশ করা কম সাহসের বিষয় নয়।

বেঙ্গল টাইমস(সপ্তাহে দু’দিন ১৮৬৯): অত্যান্ত আধুনিক প্রভাবশালী ও দামী সংবাদপত্র ছিল বেঙ্গল টাইমস। ঢাকার দ্বিতীয় ইংরেজি সংবাদপত্র। মালিক সম্পাদক ছিলেন ই.সি কেম্প যিনি ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত ঢাকা নিউজ এর সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন।  মুনতাসীর মামুন ল-নের ই-িয়া অফিস লাইব্রেরীর সূত্র দিয়ে জানান যে পত্রিকাটি ১৮৬৯ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল (১ম খ-,পৃ,৫৯)। এতে ঢাকা ও কলকাতার বিজ্ঞাপন প্রকাশ হতো।

সমকালীন অন্যান্য সংবাদপত্রের চেয়ে এতে অধিক বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। প্রতি সংখ্যার দাম ছিল ঢাকার আট আনা, মফস্বলে নয়আনা। পত্রিকাটি ঢাকার সাহিত্য-সংস্কৃতি কিংবা স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত ছিল না।অন্যান্য কোনো সূত্রেই বেঙ্গল টাইমসের উল্লেখ নেই।

মিত্র প্রকাশ (মাসিক ১৮৭০): ঢাকার বিখ্যাত সাংবাদিক হরিশচন্দ্র মিত্রের সাথে মিল রেখে  ৩০ বৈশাখ ১২৭৭ ‘মিত্র প্রকাশ’ বের করা হয়। এটি একটি সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা এবং সম্পাদক হরিশচন্দ্র মিত্র। পত্রিকা প্রকাশের দুই বছর পর ১৮৭২ সালে হরিশচন্দ্র মৃত্যুবরণ করায় এর সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁর অগ্রজ কালিদাস মিত্র (ব্রজেন্দ্রনাথ, ২য় খ-, পৃ.৩,)। মুনতাসীর মামুনের গবেষণায় এই পত্রিকাটির উল্লেখ নেই।

বঙ্গবন্ধু (পাক্ষিক ১৮৭০): প্রথম প্রকাশ ১ শ্রাবণ ১২৭৭ এবং ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের সংগঠন ‘সঙ্গত সভার’ মুখপত্র ছিল বঙ্গবন্ধু। নামকরণে চমৎকারিত্ব আছে, আছে দেশপ্রেম। সম্পাদক ছিলেন বঙ্গচন্দ্র রায়। তিনি ছিলেন ঢাকার পোগজ স্কুলের শিক্ষক। লক্ষণীয় বিষয় যে, সেকালে স্কুল শিক্ষক তাদের দায়িত্ববোধ থেকেই অলাভজনক পেশা সংবাদপত্রের সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন। ১৮৭২ সালে পত্রিকাটি পাক্ষিক থেকে সাপ্তাহিকে রূপান্তরিত হয়। পত্রিকাটি কিছু দিন কলকাতা থেকে, তারপর ঢাকা থেকে ১৯০৭ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সম্পাদকবৃন্দ ছিলেন কৈলাশচন্দ্র নন্দী, বরদাকান্ত হালদার, ঈশানচন্দ্র সেন, গিরিশচন্দ্র সেন এবং দুর্গাদাস রায়।

শুভসাধিনী (সাপ্তাহিক,ফেব্রুয়ারি ১৮৭১): শুভ সাধিনী ছিল পূর্ববঙ্গ শুভা সাধিনী সভার মুখপত্র। ১৮৭১ সালে পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশ পায়। সম্পাদক ছিলেন কালীপ্রসন্ন ঘোষ। আর মূল্য প্রতি সংখ্যা এক পয়সা। পত্রিকাটির পরিচালক কালীনারায়ণ রায়। একই সময়ে ইস্ট নামে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক ঢাকা থেকে প্রকাশ হয়। সম্পাদক কালীনারায়ণ রায় এবং পরে শশিভূষণ । এটি ছিল ব্রহ্মসমাজের ইংরেজি মুখপত্র।
হিতকরী (সাপ্তাহিক, ১৮৭১): ১৮৭১ সালে হিতকরী ঢাকা সুলভযন্ত্র থেকে প্রকাশিত হয়। একই সময়ে প্রকাশিত শুভ সাধিনী এবং হিতকরীর মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু কোনো সূত্রই পত্রিকাটির সম্পাদক কে ছিলেন তা উল্লেখ করেননি।

মহাপাপ বাল্য বিবাহ (মাসিক ১৮৭৩): এটি একটি বিশেষ ধারার পত্রিকা। মোহাম্মদ আবদুল কাইউমের মতে বাল্য বিবাহ নিবারণী সভার মুখপত্র হিসেবে মহাপাপ বাল্যবিবাহ ঢাকা থেকে প্রকাশ পায়। বোঝা যাচ্ছে সেকালে ঢাকায়ও বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে সমাজ সংগঠিত হয়েছিল। বাল্যবিবাহ যে মহাপাপ এর উপর জনমত সৃষ্টি করার জন্যে পত্রিকাটির সম্পাদক নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় (১৮৪৫-১৯০৪)এবং তাঁর ভাই ড. নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায়( ১৮৫২-১৯১০)একই শিরোনামে পত্রিকা প্রকাশ করেন।  নবকান্ত ছিলেন ঢাকা জুবিলী স্কুলের শিক্ষক এবং ড.নিশি কান্ত ১৮৮৩ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি. ডিগ্রী লাভ করেন। ইউরোপে ভারতীদের মধ্যে তিনিই প্রথম পিএইচ.ডি ডিগ্রীধারী। পত্রিকার শিরোনাম দেখেই জানা যায় এর উদ্দেশ্য কি ছিল।

গবেষক স্বপন বসু লিখেন, এই আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঢাকার ব্রাহ্ম মতাবলম্বী কিছু যুবক বিশেষ ভূমিকা নেন। তাদের উদ্যোগে ১৮৭৩ সালে ঢাকায় বাল্যবিবাহ নিবারণী সভা প্রতিষ্ঠিত হয়।  এই সভার প্রাণপুরুষ ছিলেন নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়। ... সভার কাজকর্মের পরিচয় বৃহত্তর জগতে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে ও এই প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার জন্যে  ১৮৭৩ এর এপ্রিল মাসে মহাপাপ বাল্যবিবাহ নামে  বাল্যবিবাহ নিবারণী সভার এক মুখপত্র প্রকাশ করা হয়।৩৭

বান্ধব (মাসিক ১৮৭৪, আষাঢ়, ১২৮১): বান্ধব ঢাকার একটি উচ্চমাপের সাহিত্যপত্র। বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত বঙ্গদর্শন ( প্রথম প্রকাশ বৈশাখ ১২৭৯, ১৮৭২ ইং) যেমন কলকাতার সাহিত্য চর্চার জগতকে বিস্তৃত করেছিল, তেমনি কালীপ্রসন্ন ঘোষের বান্ধবকে ঘিরে ঢাকার কবি-সাহিত্যিকগণ সাহিত্য চর্চায় মেতেছিলেন। বঙ্গদর্শনের দ্বারা বান্ধবগোষ্ঠী প্রভাবিত হয়েছিল বলে মনে হয় । প্রথম পর্যায়ে সাময়িকিাটির সম্পাদক ছিলেন কালীপ্রসন্ন ঘোষ। শুরুতে এই সাহিত্যপত্রটির মূল্য অতি সুলভ ছিল। বার্ষিক এক টাকা দুই আনার বিনিময়ে পত্রিকাটি ডাকে পাওয়া যেত।৩৮

ঢাকা গেজেট (সাপ্তাহিক ১৮৮৬): ঢাকা গেজেট একটি সংবাদ নির্ভর সংবাদপত্র। ব্রজেন্দনাথ লিখেন, পত্রিকাটি ছিল ‘অ্যাংলো ভর্নাকুলার ’ সাপ্তাহিকপত্র( ২য় খ-, পৃ.৩৩)। কলকাতার সংবাদপত্র বেঙ্গল গেজেট ও বাঙ্গাল গেজেট অনুকরণে ঢাকা গেজেট নামকরণ করা হয়। প্রথম সম্পাদক শশীভূষণ রায়। তিনি ইতোপূর্বে ইষ্ট এর সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা গেজেট দীর্ঘতা লাভ করেছিল। যদিও এর দীর্ঘতার ক্ষেত্রে কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না।

গরীব (সাপ্তাহিক ১৮৮৬) : গরীব পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কুঞ্জবিহারী ভট্টাচার্য। গরীব নামের সঙ্গে পত্রিকাটির আর্থিক সম্পর্কের মিল ছিল। ঢাকার বিখ্যাত সংবাদপত্র ঢাকা প্রকাশ ১লা  অগ্রহায়ণ ১২৯৭ সালে প্রকাশিত এক মন্তব্যে গরীব সম্পর্কে যা বলেছিল-তাতে সেকালের সংবাদপত্রের স্বল্প আয়ুর বিষয়টিও চিত্রিত হয়। ঢাকা প্রকাশ লিখে:

গরীবের শহর ঢাকা হইতে গরীবের দোসর সংবাদপত্র হওয়া নিতান্তই আবশ্যক ছিল, সেই আবশ্যক এতদ্বারা পূর্ণ হইবে কিনা বলিতে পারি না। গরীব টিকিয়া থাকিলে বোধ হয় পূর্ণ হইতে পারে। ঢাকা প্রকাশের বয়সে ঢাকায় অনেক সংবাদপত্র হইয়াছে; তাহাদের মধ্যে অধিকেই বিলয় পাইয়াছে; তাহাতেই আমাদের আশংকা হয় গরীব বেচারা এ দুর্দিনে টিকে কিনা? গরীব বলিয়া দয়া করিয়া যদি লোকে এক মুঠা করিয়া অন্ন দেয় তবেই গরীব রক্ষা পাইতে পারে। ভরসা করি, গরীবকে পালন করা সবলের কর্ত্তব্য বোধ হইবে।৩৯
ঢাকা প্রকাশের আশংকাই ঠিক ছিল। অর্থাভাবে গরীব তিনশ টাকায় বিক্রি হয়ে যায়।

প্রকৃতি (মাসিক ১৮৯১):সংবাদনির্ভর কিংবা সাহিত্য সাময়িকী ছাড়াও ঢাকা থেকে নানা বৈচিত্রপূর্ণ পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে। প্রকৃতি ছিল এমনই একটি পত্রিকা। প্রাকৃতিক বিষয়ক পত্রিকা উনিশ শতকে প্রকাশ করা যেমন প্রকৃতি সচেতনতার পরিচয় অন্যদিকে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জও বটে। প্রকৃতির সম্পাদক ছিলেন প্রভাব চন্দ্র সেন। তিনি ফরিদপুর জেলার প্রাক্তন ডেপুটি স্কুল ইন্সপেক্টর ছিলেন।

পূর্বউল্লেখিত সূত্র মতে, ১৮৯১ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত ঢাকা আরো ৯টি পত্র-পত্রিকা প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলির আয়ুস্কাল ও পাঠকপ্রিয়তার দিক থেকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে হয় না। ১৮৫৬ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত ঢাকা থেকে ২১টি সংবাদপত্র এবং ৪৮টি সাময়িকপত্রসহ মোট (২১+৪৮) ৬৯টি পত্র-পত্রিকা প্রকাশ হয়েছিল।

উল্লেখিত প্রকাশ তালিকা থেকে অনুমান করা যায় ঢাকাকে কেন্দ্র করে ষাটের দশক থেকে পূর্ববাংলায় যে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল তারা অধিকাংশই সাহিত্য চর্চা ও সমাজ সংস্কারে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেছিলেন। আর এসব সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকা-ের মুখপত্র হিসেবে তাঁরা সংবাদপত্র চর্চাকে বেছে নিয়েছিলেন। আরেকটি গুরুতপূর্ণ বিষয় হলো গোটা উনিশ শতকে ঢাকা থেকে একটি পত্রপত্রিকাও প্রকাশের ইতিহাস পাওয়া যায়না,যেটি কোনো মুসলমান দ্বারা সম্পাদিত বা পরিচালিত হয়েছিল।

ঢাকার খ্যাতিমান সম্পাদকদের পরিচয়
নতুন উদ্ভব হওয়া সমকালীন মধ্যবিত্ত শ্রেণী বা গোষ্ঠীর চিন্তা চেতনা কী ছিল তার একটি বাস্তব চিত্র রয়েছে এসব সংবাদ-সাময়িকপত্রে। ১৮৬০ সালে সাহিত্য সাময়িকী কবিতাকুসুমাবলী এবং ১৮৬১ সালে সংবাদপত্র ঢাকাপ্রকাশকে অনুসরণ করে যে সকল বাঙালি মনীষী চিন্তা ও কর্মে ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গের আলোক বর্তিকা প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন তাঁরা কেউ না কেউ কোনো একটি আদর্শ নিয়ে অগ্রসর  হয়েছেন। তবে অধিকাংশ ছিলেন সংস্কারবাদী ও আধুনিক চিন্তার ধারক। উপরোক্ত বিবরণের আলোকে এঁদের মধ্যে বিখ্যাতজনের দ্বারা সম্পাদিত পত্রপত্রিকার নাম ও আদর্শের তথ্য দেয়া গেল।

১। কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার,( ১৮৩৪-১৯০৭) কবিতাকুসুমাবলী, ঢাকা প্রকাশ, মনোরঞ্জিকা, বিজ্ঞাপনী, আর আদর্শে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক।

২। দীননাথ সেন,( ১৮৩৯-১৮৯৮) হিতৈষিণী, ঢাকা প্রকাশ, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক।

৩। কালীপ্রসন্ন ঘোষ (১৮৪৩-১৯১০), বান্ধব, শুভসাধিনী, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক।

৪। হরিশচন্দ্র মিত্র( ১৮৩৮-১৮৭২), হিন্দুরঞ্জিকা, হিন্দু হিতৈষিণী, অবকাশরঞ্জিকা, চিত্তরঞ্জিকা, ঢাকা দর্পন, কাব্য প্রকাশ, মিত্র প্রকাশ এবং প্রথমে সং¯কারবাদী ব্রহ্মধর্ম প্রচারক, পওে রক্ষণশীল

৫। রামচন্দ্র ভৌমিক, ঢাকা বার্ত্তা প্রকাশিকা, নব্য ব্যবহার সংহিতা, পেশায় ঢাকার উকিল।

৬। বঙ্গচন্দ্র রায় (১৮৩৯-১৮৯২) বঙ্গবন্ধু, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক, ঢাকা কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট।

৭। কৈলাশচন্দ্র নন্দী, (মৃত্যু ১৮৮৪) বঙ্গবন্ধু, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক, ঢাকা কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট।

৮। গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৫-১৯১০), বঙ্গবন্ধু, বাংলা ভাষায় কোরআন শরীফের প্রথম অনুবাদক।

৯। কালীনারায়ণ রায়, ঈস্ট।

১০। নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় (১৮৪৫-১৯০৪), ঈস্ট, মহাপাপ বাল্যবিবাহ, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক, ত্যাজ্যপুত্র।

১১। শ্রীনাথ চন্দ্র (১৮৫১-১৯৩৮), সঞ্জীবনী, বাঙালী, সেবক, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক।

১২। দ্বারকানাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৪৪-১৮৯৮), অবলা বান্ধব, ব্রাহ্ম প্রচারক।

১৩। শশিভূষণ রায়, ঢাকা গেজেট।৪০

কেমন ছিল উনিশ শতকে ঢাকার সংবাদ-সাময়িকপত্রের মুদ্রণ ও প্রচার ব্যবস্থা ?

উনিশ শতকে ঢাকার সংবাদপত্রের মুদ্রণ ও প্রচার ব্যবস্থা কেমন ছিল? এ বিষয়গুলি নির্ণয়ের সঙ্গে ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গের সমাজ ব্যবস্থা আলোকপাত করতে হবে। মুদ্রণযন্ত্রের কথা আগে বলা হয়েছে। একটি সমাজ বা শহরের আর্থিক, সামাজিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সংবাদপত্রের প্রচার ও প্রকাশনা ব্যবস্থা। ইতোপূর্বের আলোচনায় লক্ষ করা গেছে ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম দিকের সকল সংবাদপত্রই কোনো না কোনো সভাসমিতির মুখপত্র হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে।

কিন্তু পত্রিকাগুলি ছিল স্বল্পায়ু। যখন সভাসমিতি ভেঙ্গে গেছে বা বিলুপ্তি ঘটেছে সেই সঙ্গে এর মুখপত্র পত্রিকার প্রকাশনাও বন্ধ হয়ে গেছে। একক প্রচেষ্টা বা পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় সংবাদপত্র প্রকাশিত হওয়ার উদাহরণ খুবই কম। ঢাকায় উনিশ শতকে পুঁজিপতির সংখ্যা ছিল সীমিত। পূর্ববাংলার অনেক জমিদার কলকাতায় বসবাস করতেন। টাঙ্গাইলের জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী কলকাতায় মুসলমান সংবাদপত্র মিহির ও সুধাকর স্বীয় অর্থানুকূল্যে প্রকাশ করেন। কিন্তু ঢাকায় যারা সংবাদপত্র প্রকাশ করেন- তারা নিতান্তই কবি-সাহিত্যিক।

কালীপ্রসন্ন ঘোষ বান্ধব পত্রিকা প্রকাশ করে ভীষণ আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন। পত্রিকার আয়ের উৎস ছিল দুটি, একটি গ্রাহক থেকে অর্থ আদায়, অপরটি বিজ্ঞাপন থেকে আয়। গোটা উনিশ শতকে ঢাকায় কোনো দৈনিক সংবাদপত্র ছিল না। বার্ষিক গ্রাহক ছিল। সবাই ঠিকমত চাঁদা প্রদান করতো বলে মনে হয়না। পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়া থেকে হরিনাথ মজুমদারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা(প্রথম প্রকাশ ১৮৬৩)। এক পর্যায়ে আর্থিক কারণে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।

সম্পাদক পত্রিকা বন্ধের কারণ সম্পর্কে (এপ্রিল ১৮৭৩) দুঃখ করে বলেন, “পরিশেষে আমরা দুঃখিতান্তকরণে বলিতেছি, নদিয়া, যশোর, পাবনা ও ফরিদপুর প্রভৃতি কয়েক জিলার মধ্যে সামান্যমূল্যে একখানি সাপ্তাহিক পত্রিকা গ্রামবার্ত্তা চলিতেছিল। গ্রাহকদিগের অসাবধানতায় তাহারও বিঘেœাপস্থিত হইল। ইহা যেন স্থানীয় লোকের তদরূপ অনাদায়ি গ্রাহকদিগের আয়েশের কারণ। ধন্য আমাদিগের দেশ, ধন্য আমাদিগের নেব-দেবনা প্রবৃত্তি।”৪১

উপরোক্ত বক্তব্য থেকে গ্রাহকদের অসাবধানতার বা সচেতনতার কথাই প্রকাশ পায়। কিন্তু এর মর্মমূলে ছিল পূর্ববঙ্গের আর্থিক অস্বচ্ছলতা। অতএব, সীমিত গ্রাহক বা পাঠকশ্রেণী, তার ওপর আর্থিক দুর্দশা, সঙ্গে যুক্ত হলো অতিরিক্ত মুদ্রণ ব্যবস্থা এবং ডাকমাসুল খরচ। সে সময়ে ডাকযোগেই পত্রিকা গ্রাহকের কাছে পাঠানো হতো। ঢাকা প্রকাশে প্রচারিত এক বিজ্ঞাপনে বাঙ্গালা যন্ত্র প্রেসের মুদ্রণ ব্যয় সম্পর্কে বলা হয়, পূর্ব নিয়ম পরিবর্তন করিয়া নিন্মলিখিত নতুন নিয়ম নির্দ্ধারিত করা হল।

পাইকার প্রত্যেক ফর্মার মূল্য-৬ টাকা।

ইংলিশের প্রত্যেক ফর্মার মূল্য- ৫ টাকা।

এতদপেক্ষা অল্প মূল্যে পুস্তক মুদ্রাংকন করিয়া দেওয়া আমাদের সাধ্যাতীত।”৪২
উনিশ শতকে সংবাদপত্র কোনো অবস্থাই লাভজনক ব্যবসা ছিল না। মাঝে মধ্যে লোকসান গুনেও কোনো কোনো পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে। আবার মুদ্রণ খরচ আর ডাক খরচ প্রায় সমান হয়ে যেত। ঢাকার পল্লী বিজ্ঞান এর বার্ষিক আয় ব্যয়ের একটি হিসাব পাওয়া যায়।৪৩ তাতে দেখা যায়, ছাপা খরচ আর ডাক খরচ প্রায় সমান। মুদ্রাঙ্কন খরচ ৩৯ টাকা,    আর আয় ডাক মাশুল প্রাপ্ত ৪৬ টাকা ৩ আনা।        

পল্লীর বিজ্ঞান প্রকাশিত হয় ‘জজবাবু’ নামে খ্যাত অভয়কুমার দাসগুপ্তের অর্থানুকূল্যে। অভয়বাবু মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চা জনপ্রিয় করার জন্যে পত্রিকাটি বিনামূল্যে বিতরণ করেন। পরে গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে গেলে বার্ষিক মাত্র দুই টাকা মূল্য ধার্য করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো উনিশ শতকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলির গ্রাহক বা প্রচার সংখ্যা কত ছিল?  বিভিন্নসূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে হিসাব করলে দেখা যায়,
ঢাকাপ্রকাশ, ১৮৬৭সালে ২৬৯ এবং ১৮৭৭ এ ৪০০,১৮৮০এ ৩৫০আবার ১৮৯০এ ১২০০কপি ।

মনে করা হয় ১৮৯০ এ পৌছে ঢাকা প্রকাশের আদর্শ ও নীতি পরিবর্তন হয়েছিল। এসময় পত্রিকাটি
গোড়া হিন্দু ধর্মের সমর্থনে প্রচারণা চালিয়েছিল। পল্লী বিজ্ঞান ৩০০ কপি ( পত্রিকটির মূল্য বার্ষিক দুই টাকা ছিল বিধায় গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে থাকতে পারে)। বঙ্গবন্ধু ২০০ কপি (১৮৮৪ সালের হিসাব মতে), ভিষক,২২৫ কপি (১৮৮৪ সালের হিসাব মতে), বান্ধব, ১০০০ কপি, হিন্দু হিতৈষিণী    ৪০০ কপি (১৮৬৭ সালের হিসাব মতে, ১৮৮০সালে ৩০০ কপি)৪৪। উনিশ শতকে ঢাকার সঙ্গে কলকাতার বাংলা সংবাদপত্রের প্রচার সংখ্যার ব্যবধান বোঝার জন্যে কলকাতার সংবাদপত্রের প্রচার সংখ্যা দেয়া হল:

সংবাদপত্র        ১৮৬৭        ১৮৭০        ১৮৭৭

সোমপ্রকাশ        ৪৫০-৪৭৫    ৭০০        ৭০০

এডুকেশন গেজেট    ৩৯৪        -        ১১৬৮

সুলভ সমাচার        -        ৩০০        -

সমাচার চন্দ্রিকা         ৪০০        -        -

তত্ত্ববোধিনী         ৫০০        -        -

ভাস্কর             ৪০০        -        -

অমৃতবাজার পত্রিকা    -        ২২১৭        ২২১৭

সংবাদ প্রভাকর (দৈনিক)     ৫০০        -        -

বঙ্গবিদ্যা প্রকাশিকা (দৈনিক) ৩০০

পূর্ণ চন্দ্রোদয় (দৈনিক)        ৩০০৪৫

কলকাতা ও ঢাকা শহরের বাইরে থেকে প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকার প্রচার সংখ্যা একই সূত্র থেকে দেয়া হল। তাতে মফস্বলের পত্রিকার প্রচার ও গ্রাহক সংখ্যা অনুমান করা যাবে।

পত্রিকার নাম        প্রচারের স্থান        প্রচার সংখ্যা         প্রচারকাল

বিজ্ঞাপনী         ময়মনসিংহ        ১৫০            ১৮৬৭

রংপুর দিগপ্রকাশ        রংপুর             ১৮০            ১৮৬৭

গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা       কুষ্টিয়া                     ১৭৫                        ১৮৮০

আহমদী                    টাঙ্গাইল                   ৪৫০                      ১৮৯০

উপরোক্ত তথ্যমতে দেখা যায় ঢাকার পাঠক সংখ্যা কলকাতার চেয়ে অনেক কম ছিল। এটাই স্বাভাবিক। কলকাতা কোম্পানি সরকারের রাজধানী। জীবন ধারনের ব্যাপক সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান ছিল কলকাতায়। ঢাকার অবস্থা ছিল এর বিপরীত। সমাচার দর্পনের বরাত দিয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায়  জানান যে, ১৮২৪ সালে কলকাতার লোকসংখ্যা ছিল ৫ লক্ষ(বাংলা সংবাদপত্র ও বাঙালির নবজাগরণ,পৃ.৮৩)।

এখন ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা জানতে পারলে পত্রিকার উপরোক্ত পাঠক বা গ্রাহকের সঙ্গে একটি তুলনা বের হয়ে আসবে। ঢাকার কালেক্টর জেমস টেইলরের মতে (১৮৩৮-৫০ সালের মধ্যে) শুধু ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা ছিল ৬০,৬১৭। এই জনসংখ্যার মধ্যে ১৭,৬৭৫ জনের বয়স ১৫ বছরের নি¤েœ। আর শহরের আশেপাশে গ্রামের লোকসংখ্যা অর্থাৎ শহরতলীতে বসবাসকারী জনসংখ্যা ৭,৬৮৯ জন।৪৬ স্যার চার্লস ড’য়লী’র গ্রন্থে যে লোকসংখ্যার উল্লেখ আছে তাতে দেখা গেছে ১৮০০ সালে ২ লক্ষ, ১৮৩০ সালে হ্রাস পেয়ে মাত্র ৭৫ হাজার, ১৮৩৮ সালে ৬৮ হাজার, ১৮৫৯ সালে ৫১ হাজার ৬৩৬ এ পৌঁছে। তারপর নগরায়ণের ধারা বৃদ্ধির সঙ্গে ঢাকার লোকসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।

১৮৯১ সালে ৮৩ হাজার ৬৩৩ জন এবং ১৯০১ সালে প্রায় ৯০ হাজারে উপনীত হয়।৪৭ জনসংখ্যার তুলনামূলক হিসেবে গ্রাহক বা পাঠকসংখ্যা যে খুব বেশি ছিল, তা নয়। তবে ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গের সমসাময়িককালের আর্থ সামাজিক ও শিক্ষার হার তুলনা করলে গ্রাহক সংখ্যাটি তেমন নিরাশ হওয়ার কিছু নয়। পত্রিকার গ্রাহক ও পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে ঢাকার পত্রিকার কর্তৃপক্ষ নানা সুযোগ সুবিধা ঘোষণা করত। সাপ্তাহিক ঢাকাপ্রকাশ পূর্ববাংলার বিখ্যাত সংবাদপত্র, তা সত্ত্বেও পত্রিকাটি বিশেষ ছাড় ঘোষণা করে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করে।

এতে বলা হয় “ঢাকা প্রকাশের বার্ষিক সুলভ মূল্য ৫, অসমর্থদিগকে ৩ টাকাতেও দেওয়া হয়।৪৮ ঢাকার গৌরব পত্রিকা বিশেষ ছাড় হিসেবে গ্রাহককে পুস্তক উপহার দেয়ার কথা ঘোষণা করে। এক বিজ্ঞাপনে বলা হয় “এই ভাদ্র মাসের মধ্যে মূল্যময় ডাক মাসুল এক টাকা দুই আনা পাঠাইলে পাঁচখানি পুস্তক উপহার ও এক বৎসর ৪৮ সংখ্যা গৌরব দেওয়া হইবে।”৪৯

পত্র-পত্রিকার অন্যতম আয়ের উৎস ছিল বিজ্ঞাপন। আর বিজ্ঞাপন নির্ভর করে গতিশীল ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর। ঢাকার উনিশ শতকে মধ্যভাগ থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুটা গতিশীল হলেও কলকাতার মত ছিল না। ফলে বিজ্ঞাপনের হার খুবই কম ছিল। আবার প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের টাকা আদায়েও পত্র-পত্রিকার কর্তৃপক্ষকে নানা ঝামেলায় পড়তে হত।

একেবারে উনিশ শতকের শেষে ১৯০০ সালে ঢাকার পত্র-পত্রিকার বিজ্ঞাপনের টাকা অনাদায়ের মত দুঃখজনক খবর পাওয়া যায়। ১৯০০ সালে ঢাকাপ্রকাশের বিজ্ঞাপনের হার ছিল ‘annas 3 per line for each insertion’। বিজ্ঞাপনের চালচিত্র অনুধাবন করা যায় নিন্মে সমসাময়িক একটি পত্রিকার এ সংক্রান্ত একটি প্রকাশিত সংবাদ থেকে। ঢাকার অনুসন্ধান পত্রিকা ভাদ্র ১২৯৫ সংখ্যায় লিখে; “সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে অনেকেই তাহার পয়সা দেননা।”৫০ ইংরেজি পত্রিকা ঢাকা নিউজ, বেঙ্গল টাইমস ছিল ঢাকার এলিট শ্রেণীর পত্রিকা। এর পাঠক ছিল ঢাকায় অবস্থানরত ইউরোপীয়রা। এ দু’টি পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের সংখ্যা ছিল অধিক এবং তুলনামূলক উচ্চ হার।

ঢাকার সংবাদপত্রের পৃষ্ঠপোষক ও প্রাসঙ্গিক বিষয়

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ঢাকায় পত্র-পত্রিকায় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ছিল। এখানে সংবাদপত্রে কেউ পুঁজি বিনিয়োগ করেনি। উনিশ শতকে সংবাদপত্রে পুঁজি বিনিয়োগ বা লগ্নি করা লাভজনক না হওয়ায় ধনী ব্যক্তি বা জমিদারগণ এ পথে না এসে জমির ওপরই অধিক টাকা লগ্নি করতেন। তবে কলকাতার পত্র-পত্রিকায় ধনীদের খানিকটা সম্পৃক্ততা ছিল।

আবার সংবাদ কৌমুদী প্রকাশে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। দৈনিক সংবাদ প্রভাকর প্রকাশের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন পাথুরিয়াঘাটার জমিদার নন্দকুমার ঠাকুর। কিন্তু ঢাকায় এমন সংবাদপত্র প্রকাশে উনিশ শতকে কোনো পুঁজিপতির সন্ধান পাওয়া যায়না । অনেকটা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো অবস্থা। ঢাকার দুজন বিখ্যাত সম্পাদক-যারা ঢাকায় প্রথম সংবাদপত্রের উদ্ভাবক কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার এবং হরিশচন্দ্র মিত্র জীবনের শেষ অধ্যায়ে অমানবিক জীবন ধারন করে প্রায় অন্নহীন অবস্থায় মারা যান। কিন্তু কলকাতার সংবাদপত্রের প্রথমদিকের দিকপাল রাজারাম মোহন রায় (মালিক-সম্পাদক, ব্রাহ্মণ সেবধি, সম্বাদকৌমুদী, বঙ্গদূত) বিশাল বিত্তের অধিকারী ছিলেন। প্যারীচাঁদ মিত্র (জ্ঞানাণে¦ষণ, বেঙ্গল স্পেক্টেটর) ছিলেন কাগজ ও হুন্ডির ব্যবসায়ী। ।৫১

হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়গত ভাবে দেখলে আরেকটি বিস্ময়ের বিষয় হলো, ঢাকায় বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত বা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের অনুপস্থিতি। ১৮৬০ থেকে ১৯০০ সাল পযর্ন্ত প্রকাশিত কোনো পত্র-পত্রিকার প্রকাশক সম্পাদকের দায়িত্বে কোনো বাঙালি মুসলমানকে দেখা যায় না। মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২), সম্পাদক হিতকরী, প্রকাশ ১৮৯০, আনিস উদ্দিন আহমদ (পারিল বার্ত্তাবহ,প্রকাশ ১৮৭৪, পূর্ববঙ্গের প্রথম মুসলিম সম্পাদক), আব্দুল হামিদ খান ইউসফ জয়ী (১৮৪৫-১৯১০?

আহমদী প্রকাশকাল ১৮৮৬) প্রমুখ কতিপয় বাঙালি মুসলমান উনিশ শতকের শেষার্ধে ঢাকার বাইরে মফস্বল এলাকা থেকে কয়েকটি পত্র-পত্রিকা প্রকাশ করেন।৫২ কিন্তু ঢাকা থেকে এমন কাউকে উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এরূপ উদ্যোগহীনতার অর্থ এই নয় যে, ঢাকায় ধনী মুসলমানের খুব একটা অভাব ছিল। ঢাকা ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ নগরী। ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত ঢাকার নায়েব নাজিম পদটি বহাল ছিল।

১৮৪৩ সালে এ পদটি বিলুপ্ত হলেও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর নতুন করে নবাবি দায়িত্ব পায় বিখ্যাত ব্যবসায়ী খাজা আব্দুল গণির পরিবার। তাদের উত্তর পুরুষ মুসলিম রাজনীতিক খাঁজা সলিমুল্লাহ। কিন্তু এই পরিবার থেকে বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ঢাকার এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দলটি ছিল উর্দু ফার্সি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ও সমর্থক।

উনিশ শতকে সাধারণ বাঙালি পরিবার থেকে ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে ঢাকায় বসবাসকারী কোনো বাঙালি গোষ্ঠী তৈরি হয়নি। যেমনটি তৈরি হয়েছিল হিন্দুজনগোষ্ঠী থেকে প্রথমে কলকাতায় আর ষাট দশক থেকে ঢাকায়। কারণ দুটি, প্রথমত: ঐতিহাসিক কারণেই ইংরেজ শাসন ও ইংরেজ প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষা মুসলমানগণ গ্রহণ করতে চায়নি; দ্বিতীয়ত: সাধারণ বাঙালি মুসলমানের আর্থিক অসংগতি। পূর্বেই বলা হয়েছে এ সময় বেশ কিছু সংখ্যক মুসলমান বুদ্ধিজীবী ঢাকায় ছিলেন।

আমাদের আলোচ্য সময়ে ঢাকার পাঁচজন মুসলমান লেখক ঐতিহাসিকের সন্ধান পাই। মৌলভী আব্দুর রউফ (লেখক, তারীখ-ই বাঙ্গালাহ, প্রকাশ ১৮৫৩), নওয়াব নুসরত জঙ্গ বাহাদুর (ঢাকার নায়েব-ই-নাজিম ১৭৯৬-১৮২৩ এবং লেখক ,তারীখ-ই-নুসরত জঙ্গী),মুনশী রহমান আলী তায়েশ (১৮২৩-১৯০৮),লেখক তাওয়ারিখে ঢাকা, প্রকাশ,১৯০৫), মৌলভী সৈয়দ আওলাদ হাসান (ঢাকার স্পেশাল সাব রেজিষ্ট্রার, লেখক, নোট অন দি এন্টিকুইটিশ অব ঢাকা, প্রকাশকাল ১৯০৪) এবং হাকীম হাবীবুর রহমান (১৮৮১-১৯৪৭) লেখক ঢাকা: পচাস বরস পহেলা প্রকাশ ১৯৪৯)।৫৩

এরাঁ চারজন উর্দু ভাষায় ঢাকার উপর প্রামাণ্য গ্রন্থ লিখেছেন এবং একজন ইংরেজি ভাষায় ঢাকার ইতিহাসের রচয়িতা। তাঁদের গ্রন্থে তাঁরা সমসাময়িক ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশে উদ্যোগ নিতে পারেননি। কারণ  বাংলা-বাঙালির চেতনার ধারক ছিলেন না। ফলে একটি পালা বদল সময়কালে ঢাকা কিংবা পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমানের দায়িত্ব নিতে তাঁরা ব্যর্থ হন। কিন্তু এই পালাবদলের সময় কলকাতায় হাল ধরেছিলেন রাজা রামমোহন, ইশ্বরচন্দ্র আর জোড়াসাকোর ঠাকুর পরিবার।

শেষ কথা

আলোচ্য গবেষণায় এটা প্রমানিত হয়েছে যে, কোম্পানি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে কলকাতায় উনিশ শতকের গোড়াতেই বাঙালি একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। এদের নেতৃত্বে কলকাতায় সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার সূত্রপাত ঘটে। তবে এই বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা একচেটিয়াভাবে কলকাতর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং একটি মাত্র সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে তা গড়ে ওঠেছিল। ঢাকা বৃহৎ বঙ্গের একটি প্রাচীন শহর হওয়া সত্ত্বেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখানে আধুনিক সুযোগ সুবিধা গড়ে ওঠতে বিলম্ব হয়।

ফলে কলকাতার সমতালে এখানে একটি মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব হয়নি। আধুনিক ঢাকার যাত্রা শুরু হয় উনিশ শতকের তৃতীয় চতুর্থ দশক থেকে। ১৮২০ সালে ঢাকা কমিটি নামে ঢাকা মিউনিসিপ্যালটির প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮৪১ সালে জেলা বোর্ড এবং ঢাকা কলেজসহ কতিপয় ইংরেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকার আধুনিক নগরায়নের অগ্রযাত্রা সেখান থেকেই। একটি আধুনিক শহরের অন্যতম উপাদান ছাপাখানা/মুদ্রণযন্ত্র। অগ্রযাত্রার এক পর্যায়ে ১৮৫৬ সালে ইংরেজি ছাপাখানা, আর ১৮৬১ সালে বাংলা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যাত্রা শুরু করে জনমতের বাহন সংবাদ-সাময়িকপত্র।

এসব সংবাদ-সাময়িকপত্রকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সাহিত্য চর্চা। সংবাদ-সাময়িকপত্র নানা মাত্রায় সমাজ সচেতনতার পরিচয় দেয়। সমকালীন সমাজ, ধর্ম সংস্কার, রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল উনিশ শতকের ঢাকার সংবাদপত্রের উপজীব্য বিষয়। উনিশ শতকের ঢাকা তথা পূর্ব বাংলার সমাজ চেতনা মানসের একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় ঢাকার এসব সংবাদ সাময়িকপত্রে। কাজেই উনিশ শতকের ঢাকার ইতিহাসের আকর উপাদান হল-সমকালীন প্রকাশিত ঢাকার সংবাদ-সাময়িকপত্র।

তথ্যসূত্র ও টীকা:
১. J.Natarajan, History of Indian Journalism (Govt. of India Press, Delhi,  pt.1,1955) p.4  গ্রন্থে ডাব্লিউ বোল্টসের সংবাদপত্র প্রকাশের প্রথম উদ্যোগকে ১৭৬৬ সালের পরিবর্তে ১৭৭৬ সাল দেখিয়েছেন। তথ্যটি ছাপার বিভ্রাট হতে পারে।

২.    দেখুন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, বাংলা সংবাদপত্র ও বাঙালির নবজাগরণ, ১৮১৮-১৮৭৭, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৭৭, পৃ.১৬ এবং ৮০-৮১। ইউরোপিয়দের দ্বারা আধুনিক সংবাদপত্র প্রকাশের পূর্বে মোগল আমলেও সংবাদপত্র প্রকাশ ও চর্চার একটি ধারা বিদ্যমান ছিল। এরূপ একটি বিবরণ দিয়েছেন, Sushila Agrawal, Press, Public-Opinion and Government in India( Jaipur,India,1970) P.21-22 ১৯৭০) চ.২১-২২
৩.    বিস্তারিত দেখুন, Abdul Karim, Dacca, the Mughal Capital Asiatic society of Pakistan, Dacca, 1964, pp.27-90
৪.    Abdul Karim, History of Bengal, Mughal Period, vol. 2, IBS, Rajshahi University, 1995, p.741. ঢাকা থেকে মুর্শিদকুলি খা এবং শেষ মোগল সুবাদারের বিদায়ের একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন,F.B.Bradley Birt;The Romance of an Eastern Capital,New Delhi,198)p.188-89
৫.   5.    M.Mufakharul Islam“The Economy of Dhaka 1610-1947”(400 years of Capital Dhaka and Beyound Vol.2,) Asiatic Society of Bangladesh, Dhaka, 2011. Pp.31
৬.     তালিকাটি দেখুন, James Taylor, A Sketch of the Topography & Statistics of Dacca(ed.Sirajul Islam)ASB Dhaka, 2010, p.167-68, ২০১০, ঢ়.১৬৭-৬৮, স্যার চার্লস ড’য়লী, ঢাকার প্রাচীন নিদর্শন (Antiquities of Dacca) ঢাকা, ১৯৭৭, পৃ. ১।

৭.    Sebastian Manrique, Travels of Fray Sebastian Manrique, উদ্ধৃত, শরীফ উদ্দীন আহমেদ, ঢাকা: ইতিহাস ও নগরজীবন ১৮৪০-১৯২১, ঢাকা, জুন ২০০৬, পৃ. ১৬।

৮.     Abdul Karim, `The Cronology of the early Naib Nazims of Dacca’, Journal of the Asiatic Society of Pakistan, vol. viii, No. 1, 1963, p. 7.

৯.    ঐ, মুন্সী রহমান আলী তায়েশ, তাওয়ারিখে ঢাকা (অনূদিত, ড. আ ম স শরফুদ্দীন) ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, বাংলাদেশ, ১৯৮৫, পৃ. ১২১।

১০. James Taylor ,Ibid P.182, দেখুন, ওয়াকিল আহমদ, বাংলার মুসলিম বুদ্ধিজীবি বাংলা একাডেমী, ঢাকা. ১৯৮৫, পৃ. ৫০-৯০

১১. M.Mufakharul Islam, op.cit.Pp.33-34

১২.    তাওয়ারিখে ঢাকা, পৃ. ১২।

১৩.    Khandaker M. Karim, `Naib Nazim of Dacca’Asiatic Society of Pakistan, Dacca, 1966

১৪. James Taylor,op.cit pp.75,202

১৫.     শরীফ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা কলেজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০০২,পৃ.৬৮।

১৬.    ব্রাহ্ম সমাজ সম্পর্কে দেখুন, David Kopf, The Brahmo Samaj and the Shaping of the Modern India Mind.

১৭.    শরীফ উদ্দিন আহমেদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৮।

১৮. Khandaker M. Karim,op.cit.

১৯.     শরীফ উদ্দিন আহমেদ, প্রাগুক্ত, পৃ.৮৮

২০. Abdul Karim, Dacca, the Mughal Capital p.55. James Taylor,op.cit pp , 112-134

২১.    বিস্তারিত, শরীফ উদ্দিন আহমেদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৬-২৭।

২২.    মুনতাসীর মামুন, উনিশ শতকে পূর্ব বাংলার সভাসমিতি, ডানা প্রকাশনী, ঢাকা ১৯৮৪, পৃ. ১৩।

২৩.     অতুল সুর, প্রকাশনার দু’শো বছর, কলকাতা, পৃ. ১৯।

২৪.     ফজলে রাব্বি, ছাপাখানার ইতিকথা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৭৭, পৃ. ৭১-৭২।

২৫.     এমরান জাহান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম: ইতিহাস ও সংবাদপত্র, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৩০।

২৬.    উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িকপত্র (১৮৪৭-১৯০৫) এর লেখক মুনতাসীর মামুন এর মতে, ঢাকার বাংলা বাজারে প্রেসটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। (১ম খ-, পৃ. ৪১)।

২৭.     শরীফ উদ্দিন আহমেদ, পূর্বোক্ত গ্রন্থে (পৃ. ৯৩) জানান যে, নীল দর্পন নাটকটি ১৮৬২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। তথ্যটি ছাপার বিভ্রাট হতে পারে।

২৮.     মোহাম্মদ আবদুল কাইউম, ‘উনিশ শতকে প্রকাশিত ঢাকার সাময়িকপত্র’, ভাষা ও সাহিত্যপত্র, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৭, পৃ. ১১৭।

২৯.    Mrinal Kanti Chanda, History of the English Press in Bengal 1780-1857, K.P. Bagchi & com. Calcutta 1987, p. 354

৩০.     J.Natarajan,History of Indian Journalism (Govt. of India Pres, Delhi,  pt.1,1955)pp.66-73 এমরান জাহান,“ঔপনিবেশিক শাসনামলে সংবাদপত্র দমন আইন ও বাংলা সংবাদপত্র ১৭৮০-১৯০০”, ইতিহাস বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ পত্রিকা, ২০১০

৩১.    মোহাম্মদ আবদুল কাইউম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৮।

৩২.    ঐ

৩৩.    পার্থ চট্টোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত পৃ. ৯২,মুনতাসীর মামুন, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০।

৩৪.    ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাময়িকপত্র ১৮১৮-১৮৬৮,বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১ম খ-, কলকাতা,৪র্থ সংস্করণ, ১৩৭৯,পৃ.১৭৭

৩৫.    ঐ, পৃ. ২০২

৩৬.     উদ্ধৃত, ঐ, পৃ. ২০৩

৩৭.    স্বপন বসু, সংবাদ সাময়িকপত্রে উনিশ শতকে বাঙালি সমাজ,২য় খ-,পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কলকাতা, ২০০৩, পৃ. ৪৭

৩৮.     ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,প্রগুক্ত, ২য় খ-,৩য় সংস্করণ ১৩৮৪, পৃ.১৪

৩৯.    উদ্ধৃত, মুনতাসীর মামুন , প্রগুক্ত, পৃ.৭১

৪০.    মুনতাসীর মামুন প্রণীত প্রাগুক্ত গ্রন্থ এবং মোহাম্মদ আবদুল কাইউম এর উনিশ শতকে ঢাকার সাহিত্য- সংস্কৃতি ( ঢাকা, ১৯৯০) গ্রন্থের সাহায্যে তৈরি হয়েছে তালিকাটি।

৪১.     উদ্ধৃত, এমরান জাহান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩।

৪২.     মোহাম্মদ আবদুল কাইউম, ‘উনিশ শতকে প্রকাশিত ঢাকার সাময়িকপত্র’ প্রাগুক্ত পৃ. ১২৫।

৪৩.     ঐ।

৪৪.     পার্থ চট্টোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯২-৯৩।

৪৫.     ঐ।

৪৬.       James Taylor,op.cit pp. 159

৪৭.     স্যার চালর্স ড’য়লী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১।

৪৮.     মুনতাসীর মামুন, প্রাগুক্ত ১৩৮

৪৯.    মোহাম্মদ আব্দুল কাইঊম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২।

৫০.     ঐ

৫১.    পার্থ চট্টোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৫।

৫২.    বিস্তারিত,মুহম্মদ নূরুল কাইউম, “বঙ্গীয় মুসলিম সাংবাদিকতার উৎপত্তি ও উদ্দেশ্য : একটি পর্যালোচনা” বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা, ডিসেম্বর, ১৯৯৬

৫৩.    বিস্তারিত বিবরণের জন্যে,ওয়াকিল আহমদ,মুসলিম বাংলার বুদ্ধিজীবী ১৭৫৭-১৮০০,বাংলা একাডেমী ,ঢাকা ১৯৮৫।

Dr.Emranড. এমরান জাহান: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বদ্যিালয়

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।