Bahumatrik Logo
২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ

আধুনিক ঢাকার উদ্ভব ও সংবাদপত্রের গোড়ার কথা


২৬ মার্চ ২০১৪ বুধবার, ০৭:৫৮  এএম

ড. এমরান জাহান

বহুমাত্রিক.কম


আধুনিক ঢাকার উদ্ভব ও সংবাদপত্রের গোড়ার কথা

ঢাকা: ঢাকায় কখন একটি নব্যশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সৃষ্টি হয় এবং তাদের নেতৃত্বে কখন আধুনিক জনমতের বাহন সংবাদ-সাময়িকপত্রের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে-এরূপ একটি অনুসন্ধান করার উদ্দেশ্যেই এই লেখাটি পরিচালিত হয়েছে। আধুনিক ঢাকার বিকাশ ও সংবাদপত্রের উদ্ভবের আলোচনার সঙ্গে কলকাতার ইতিহাস টানা হবে খুবই প্রাসঙ্গিক।


ঢাকা সতের শতকে শক্তিশালী মোগলদের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাদেশিক রাজধানী শহর ছিল। কিন্তু আঠারশতকে মোগলদের পতনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে ঢাকার পতনও এগিয়ে গেছে। মাঝে প্রায় দেড় শত বছর(১৭১৭-১৮৪০) ঢাকা অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। আঠার শতকের মধ্যভাগে নতুন শহর কলকাতা উপনিবেশ সরকারের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করায় সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। ফলে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতায় আধুনিক শিক্ষিত একটি শক্তিশালী বুর্জোয়া শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে। এদের নেতৃত্বে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাসহ আধুনিক সংবাদ-সাময়িকপত্রের ব্যাপক চর্চার সূত্রপাত ঘটে।

একই বাংলার নিকটবর্তী অপর প্রাচীন শহর ঢাকা ঊনিশ শতকের মধ্যভাগে এসে সেখানে ক্ষুদ্র একটি আধুনিক বুর্জোয়া শ্রেণীর পদচারণা লক্ষ করা যায়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় আধুনিক সাহিত্য ও সংবাদ সাময়িকপত্রের উদ্ভব হয় এবং সীমিত পরিসরে এর বিকাশ ঘটে। একই ভৌগোলিক অবস্থানে থেকে কেন কলকাতার চেয়ে ঢাকায় আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটতে অধিক বিলম্ব হলো? আবার ঢাকার নব্যশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিকাশের সঙ্গে ঢাকার সংবাদ-সাময়িকপত্র চর্চার আন্তঃসম্পর্ক কি ছিল? এ বিষয়গুলোও আলোচনার প্রাসঙ্গিক বিষয় হবে।

আমরা জানি বাংলার কলকাতাকে কেন্দ্র করে আঠার শতকে আধুনিক সংবাদ সাময়িকপত্রের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। আধুনিক নাগরিক সভ্যতার উদ্ভবও ঘটেছিল কলকাতায়। ইংরেজ সিভিলিয়ান জেমস অগস্টাস হিকি সর্বপ্রথম বেঙ্গল গেজেট নামক প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশ করে শুধু বাংলা নয় ভারত উপমহাদেশে আধুনিক সংবাদপত্রের সূচনা করেন। ঢাকার সংবাদপত্রের গোড়ার কথা জানতে হলে বাংলা সংবাদপত্রের গোড়ার ইতিহাস জানা দরকার। যাহোক, ইংরেজি ভাষায় বেঙ্গল গেজেট প্রকাশিত হয় ২৯ জানুয়ারি ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে। সেই থেকে বাংলায় তথা ভারতবর্ষে আধুনিক সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু।

এসব সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় কোম্পানির রাজধানী কলকাতা থেকে। কলকাতায় বসবাসরত ইংরেজ সিভিলিয়ানগণ ছিলেন এ সকল সংবাদপত্রের পরিচালক ও প্রকাশক। নিঃসন্দেহে এগুলোর পাঠক ছিলেন কলকাতায় বসবাসরত বিদেশি নাগরিক। বেঙ্গল গেজেট প্রকাশের প্রায় ৩৮ বছর পর ১৮১৮ সালে বাংলা ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগনেওয়া হয়। কিন্তু সে বাংলা সংবাদপত্রের প্রথম উদ্যোক্তাও ছিলেন ইউরোপিয়। ১৮১৮ সালে এপ্রিল মাসে জন ক্লার্ক মার্শম্যান বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র মাসিক দিগদর্শন প্রকাশ করেন। পরের মাসে অর্থাৎ ২৩ মে প্রকাশিত হয় সমাচার দর্পন। এই দ্বিতীয় বাংলা পত্রিকাটি ছিল সাপ্তাহিক।

এক্ষেত্রে কলকাতা নয়, দু’টি পত্রিকাই প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতার নিকটবর্তী হুগলির শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশনের উদ্যোগে। তবে সুখের বিষয় একই সময়ে বাঙালি সম্পাদক ও প্রকাশকের দ্বারা বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৮১৮ সালের জুন মাসে রাজা রামমোহন রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত হয় বাঙ্গাল গেজেটি। সংবাদপত্রের শিরোনামটি ইংরেজি হলেও তা ছিল বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র, যা বাঙালির সম্পাদনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। বাঙ্গাল গেজেটির সম্পাদক ও প্রকাশক  ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। তিনি পূর্বোক্ত মিশনের পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বাঙালি জাগরণের প্রতিভু রাজা রামমোহন রায়। বাঙ্গাল গেজেটি প্রকাশের স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আরও কতকগুলো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়।

ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতাকে কেন্দ্র করে সংবাদ-সাময়িকপত্রের বিপ্লব ঘটে যায়। কিন্তু সে সকল সংবাদ সাময়িকী কেবল কলকাতা নগরী থেকেই প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার প্রধান শহর ঢাকা থেকে ১৮৫৬ সালের পূর্বে কোনো সংবাদ সাময়িকপত্র প্রকাশের খবর পাওয়া যায় না। সম্ভবত ঢাকায় মুদ্রণযন্ত্র, সংবাদ প্রকাশের উদ্যোক্তা বা পৃষ্ঠপোষক এবং একই সঙ্গে একটি পাঠক ও নাগরিক শ্রেণীর অভাব হেতু এরূপ বিলম্বের কারণ। (চলবে)

লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশ সময়: ০০১২ ঘণ্টা, মার্চ ২৬, ২০১৪

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।