Bahumatrik Logo
২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৮:৪০ অপরাহ্ণ

আদিবাসী পরিসংখ্যানে শুভঙ্করের ফাঁকি


২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ বৃহস্পতিবার, ১১:২৪  পিএম

বিশেষ প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


আদিবাসী পরিসংখ্যানে শুভঙ্করের ফাঁকি
সংগৃহীত

ঢাকা: দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠির সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে সরকারি তথ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে বলে দাবি করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত।

এই ফাঁকি শুধু আদিবাসী জনসংখ্যার হিসেবেই নয়। তাদের ভাষা, গোষ্ঠিগত সংখ্যাসহ আর্থ-সামাজিক প্রতিটি সূচকেই বাস্তবের সঙ্গে সরকারি তথ্যের বিস্তর ফারাক রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এক ধরণের অশ্রদ্ধা, অবহেলা ও স্বীকৃতি না দেওয়ার অভিপ্রায় থেকেই আদিবাসীদের পরিসংখ্যানে রাষ্ট্রের এই অসচেতনতা। 

বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে স্পেকট্রা কনভেনশন সেন্টারে আদিবাসী জনগোষ্ঠির উপর পরিচালিত এক গবেষণা উপাত্ত প্রকাশ অনুষ্ঠানে অধ্যাপক বারকাত এসব দাবি করেন।

Identity Based Discrimination and Economic Disparity between the Mainstream and Indigenous Communities: An Exploratory Research in the Northern Districts of Bangladeshশিরোনামে এ গবেষণা পরিচালনা করে হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি), যাঁর নেতৃত্বে ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত।

উন্নয়ন সহযোগি সংস্থা অক্সফাম ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহযোগীতায় এ গবেষণায় অধ্যাপক বারকাত বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও অনগ্রসরতার নাতিদীর্ঘ চিত্র তুলে ধরেন।

দেশে আদিবাসীর জনগোষ্ঠির প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সরকারি সংস্থার ত্রুটি ও ঔদাসিন্যের কথা উল্লেখ করে আবুল বারকাত বলেন, ‘সরকারি তথ্যে (২০১২-১৩) দেশে আদিবাসী মানুষের সংখ্যা বলা হচ্ছে ২৫ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৭ ভাগ। পরিসংখ্যানে ২৭টি আদিবাসী গোত্র ও ২৬টি ভাষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কতটি জেলায় আদিবাসী জনগোষ্ঠির বাস রয়েছে তার উল্লেখ নাই।’

এইচডিআরসি’র গবেষণা উপাত্ত তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, ‘অপরদিকে একই সময়ে আমাদের গবেষণা পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে-আদিবাসী মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখ, তার মানে সরকারি হিসেবের দ্বিগুণ। শতাংশের অনুপাতে তা মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৪ ভাগ। আমাদের অনুসন্ধানে আদিবাসী গোত্র রয়েছে ৪৯টি ও নিজস্ব ভাষা রয়েছে ৪০টি। দেশের ৬৪ জেলার ৪৮টিতেই আদিবাসী বসবাস রয়েছে।’

তথ্যের এই বিস্তর ফারাকের জন্য রাষ্ট্রের এক ধরণের অশ্রদ্ধা, অবহেলা ও স্বীকৃতি না দেওয়ার অভিপ্রায়কেই দায়ী করতে চান এই অর্থনীতিবিদ।

দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত রাজশাহী, নওগাঁ ও দিনাজপুর জেলার ১৪টি উপজেলার ৩২টি ইউনিয়নের ৪৮টি গ্রামে পরিচালিত গবেষণায় আদিবাসী জনগোষ্ঠির আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের নানা দিক চিত্রিত করার চেষ্টা চালায় আবুল বারকাতের নেতৃত্বে এইচডিআরসির গবেষক দল।

উত্তরাঞ্চলের ১৪টি উপজেলায় এই গবেষক দল ২১টি স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের আদিবাসী গোত্রের সন্ধান পান, যাদের সবাই কোনো না কোনো ভাবে বিভিন্ন নিগ্রহের শিকার।

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আদিবাসী এসব গোষ্ঠিগুলো হচ্ছে-বাগদি/বানিয়াত, ভূঁইমালি/পাহাড়িয়া, চণ্ডাল, গুঞ্জু, গুরাইট, কাদরা/বানজার, কোঁচ/বর্মণ, কুল কামার/লোহার/কুল/কারমাকার, কুড়া, মাহালী, মাহাতো, মালো, মালপাহালি, মুণ্ডা/মুণ্ডারী/পাহান, মোশহর, ওঁড়াও, সাঁওতাল, সিং/ভূঁইয়া, টোরি ও ভূমিজ।

বৈষম্যের সাতকাহন

বিস্তৃত এই গবেষণায় উত্তরাঞ্চলের আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন অসমতা-বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হলেও এতে বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠির জীবনচিত্র প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন ড. বারকাত।

সুনির্দিষ্ট তথ্য ও গবেষণা পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের খ্যাতিমান এই শিক্ষক বলেন, ‘রাজশাহী, নওগাঁ ও দিনাজপুরের ২১টি আদিবাসী গোষ্ঠির মাঝে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, মাথাপিছু আয়, বিদ্যুত, ভূমি ইত্যাদির বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট।’

এসব বিষয়ে আদিবাসীদের অভিযোগের কথা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘আদিবাসী অধ্যুষিত রাজশাহীতে বাঙালি ছেলেমেয়েদের ভর্তির পর আদিবাসী ছেলেমেয়েরা চান্স পায়। ভর্তির সুযোগ পেলেও আদিবাসী ছেলেমেয়েরা সামনের সীটে বসার সুযোগ পায় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার-ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া হয় না তাদের। দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের নতুন বই দেওয়ার উৎসব হলেও আদিবাসী ছেলেমেয়েরা পায় পুরাতন বই।’

ক্লাসে শিক্ষকরাও তাদের বিষয়ে অপেক্ষাকৃত কম মনযোগ দেন-গবেষণায় এমন অভিযোগ পাওয়ার কথাও জানান আবুল বারকাত।

‘বরেন্দ্র অঞ্চল কর্তৃপক্ষ সেচ সুবিধা দিতে আদিবাসীদের কাছ থেকে বাড়তি পেমেন্ট নেন। ব্যাংকিং সুবিধা আদিবাসীদের জন্য সংকুচিত। দেড় লাখ আদিবাসীর মাঝে মাত্র ১০০ ব্যাংক একাউন্টধারী পাওয়া গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছেও সহযোগীতা পান না আদিবাসীরা। কোনো অপরাধ হলেই আদিবাসীদের দায়ী করা হয়’-যোগ করেন এই অর্থনীতিবিদ।

‘সরকারের ৯১টি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসুচির কোনো সুবিধা আদিবাসীরা পান না বলে অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদে কোনো কার্ডের আবেদন করলে-ওই আদিবাসী আবেদনকারীকে কেউ চিনে না বলে বিদ্রুপ করা হয়’-উল্লেখ করেন তিনি।

এতে আরো বলা হয়, গবেষণার আওতাধীন ২১টি আদিবাসী গোষ্ঠির মধ্যে কমপক্ষে ৩/৪টি গোষ্ঠির কেউই বিদ্যুত সুবিধা পাননি। অন্যদের মধ্যেও বিদ্যুত সুবিধাপ্রাপ্তদের সংখ্যা অতি নগণ্য। ৩টি গোষ্ঠির কারোরই ভূমি নাই। স্বতন্ত্র এসব গোষ্ঠির যাদের সংখ্যা যতো কম ভূমিহীনতা ততোই বেশি।

আদিবাসীদের ‘সত্যিকারের মানব সভ্যতার সুরক্ষক’ উল্লেখ করে গণমানুষের অর্থনীতিবিদখ্যাত প্রথাবিরোধী এই রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য যদি কাউকে পুরষ্কৃত করা হয়, সেটা আদিবাসীদের করা উচিত। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যকে সংরক্ষণে আদিবাসীদের ভূমিকা অনন্য।’

‘প্রকৃতির এই সুরক্ষকদের’ প্রাকৃতিক সম্পদে অধিকার নেই জানিয়ে ‘ডেভেলপমেন্ট ডিজাস্টার’ হওয়ার সতর্ক বার্তাও উচ্চারণ করেন তিনি।

‘বাজেটে আদিবাসীদের জন্য তিনগুণ বরাদ্দ রাখুন’

আদিবাসী জনগোষ্ঠিকে উন্নয়নের মূলস্রোতের বাইরে রেখে সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত সম্ভব নয়-জানিয়ে অধ্যাপক বারকাত সামাজিক সব সূচকে পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠির জন্য বাজেটে তিনগুণ বরাদ্দ রাখার দাবি জানান।

গবেষণা সুপারিশে সংবিধানে আদিবাসীদের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি, আদিবাসী ভূমি কমিশন ও জাতীয় আদিবাসী কমিশন গঠনের প্রস্তাব রাখেন তিনি।

অন্যায্য ভূমি অধিগ্রহণ বন্ধ করে আদিবাসীদের উন্নয়নের মূলস্রোতে নিয়ে আসতে অন্তত কয়েক অর্থ বছর সাধারণের চেয়ে তিনগুণ বেশি বাজেট বরাদ্দ রাখার দাবি রাখেন ড. বারকাত।

‘আমরাই পশ্চাতে থাকব’

প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সুপারনিউমেরারি অধ্যাপক ড. রওশন আরা এই গবেষণাকে অত্যন্ত সুক্ষ ও বিস্তৃত গবেষণাকর্ম বলে উল্লেখ করেন।

আদিবাসী জনগোষ্ঠির বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেখানে ন্যায় বিচার নেই, সেখানে কল্যাণের সম্ভাবনা অনুপস্থিত। আদিবাসী জনগোষ্ঠিকে পশ্চাতে রেখে আমরাই পশ্চাতে থাকব।’

অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আদিবাসীদের বঞ্চনা অনভিপ্রেত। এটি সার্বিক প্রগতিকে, উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করে।’

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং গবেষণা প্রতিবেদনের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘আদিবাসীরা বিপন্ন হলে রাষ্ট্রই প্রান্তিকতার দিকে যায়।’

‘কেবল আদিবাসী জনগোষ্ঠির ক্ষেত্রেই নয়, বৈষম্য সব পর্যায়েই রয়েছে। এখানে প্রান্তিকতার ধারা অনেক ব্যাপক। সামষ্ঠিক বৈষ্যমকে মোকাবেলা করে-নির্মুল করেই উন্নয়নের পথে যেতে হবে আমাদের’-আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক শারমিন্দ নিলোর্মি।

অনুষ্ঠানে অক্সফামের প্রজেক্ট ম্যানেজার এমবি আকতার আদিবাসীদের নিয়ে এই গবেষণাকে মাইলফলক উল্লেখ করে একে ধরে আগামীতে আরো কর্মসূচি নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন, অক্সফামের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সৈকত বিশ্বাস।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।