Bahumatrik Multidimensional news service in Bangla & English
 
৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, শনিবার ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ৪:০৫ অপরাহ্ণ
Globe-Uro

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় : রাজনৈতিক অঙ্গন বনাম আদালত অবমাননা


১৩ আগস্ট ২০১৭ রবিবার, ০২:১৪  এএম

এ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

বহুমাত্রিক.কম


ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় : রাজনৈতিক অঙ্গন বনাম আদালত অবমাননা

ঢাকা : সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ নিয়ে আবেগ-উত্তাপ ও যৌক্তিক তর্ক-বিতর্ক চলছে। চায়ের দোকান থেকে পত্রিকার কলাম, টেলিভিশন টক শ’ পর্যন্ত। সরব গোটা রাজনৈতিক অঙ্গণ। অরাজনৈতিক অঙ্গণেও চলছে এনিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। সন্দেহ নেই আরো কিছুকাল চলবে। চলাটাই স্বাভাবিক। রায়ে সংক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন দলের নেতা-মন্ত্রীরা পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন বিষয় ও প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার প্রকাশ্য সমালোচনা করছেন। অন্যদিকে এই রায় ও পর্যবেক্ষণে উচ্ছ্বাস প্রকাশ পাচ্ছে বিএনপিসহ দলটির সমমনাদের বক্তব্য-মন্তব্যে। যার প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘রায় নিয়ে কেউ রাজনীতি করবেন না, আমরা অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন, আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের ফাঁদে পা দেব না। প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্যের পর রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে কোনো পক্ষেরই আর রাজনীতি করা সমীচীন নয় বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।

এদিকে প্রধান বিচারপতিকে অপসারণে আন্দোলন করা হবে বলে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটা খারাপ লক্ষণ। শুক্রবার মাদারীপুরে একটি সভায় এলজিআরডি মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন ‘প্রধান বিচারপতি ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন’। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন ‘ আদালতের রায় প্রশ্নবিদ্ধ’। মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আ.ক. ম মোজাম্মেল হক শুক্রবার বেলাব মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স্রের উদ্ভোধন উপলক্ষে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মতবিনিময় উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘প্রধান বিচারপতির বক্তব্য দুঃখজনক’। এদিকে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আওয়ামী লীগ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।


পাঠক এবার আসল কথায় আসি। আদালত অবমাননার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে আদালত অথবা আইন ব্যবস্থাকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা অসম্মান প্রদর্শন করা। এটা এমন কোন আচরণকে বুঝায় যা আইনের কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থায় অসম্মান প্রদর্শন করে। অথবা বিচারাধীন কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে”।

একজন আইনবিদ যদি বিচার বিবেচনা না করে তাঁর মক্কেলকে ভুল পথে চালান, তবে তিনি নৈতিকতা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত হবেন এবং এ কারনে তিনি আইন পেশার অধিকার হারাতে পারেন। ঠিক তেমনি আদালত অবমাননা কখন, কীভাবে হতে পারে সে বিষয়ে প্রত্যেকের পরিষ্কার ধারণা থাকা অপরিহার্য। যদি সঠিক ধারণা থাকে, তবে আমাদের আদালত অবমাননা সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমার মুখোমুখি যেমন হতে হয় না, ঠিক তেমনি মহামান্য আদালত ও বিচারক মহোদয়কেও বিব্রত হতে হয় না। পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষভাবে স্মরণে রাখা দরকার যে, স্বাধীনতারও একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে, যা ইচ্ছে তা করা বা লেখা। রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার সময় আমাদের উচিত বিচার বিভাগ ও আদালত সম্পর্কে তথ্য পরিবেশনের আগে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করা।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। মূলত, সংবিধানে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করে বলা হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংগঠনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় সব নাগরিকের বাক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হলো। বিষয়টি বিশ্লেষণের দাবিদার। বিধান মোতাবেক আদালত অবমাননা দুটি শ্রেণীতে পড়তে পারে, যথা দেওয়ানি আদালত অবমাননা ও ফৌজদারি আদালত অবমাননা। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো দেওয়ানি আদালতের দেয়া রায়ে ডিক্রি, আদেশ, রিট অথবা আদালতের পরোয়ানা অমান্য কিংবা আদালতের দেয়া কোনো রায় বা মুচলেকা ভঙ্গ করে থাকেন তবে সেটা আদালত অবমাননা হতে পারে।

২০০৭ সালে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ফৌজদারি বিধির কন্টেম্পট পিটিশন নং ৯৫৭১/২০০৭ (রাষ্ট্র বনাম আদালত অবমাননাকারী) মামলায় স্বয়ং মহামান্য বিচারপতি আদালত অবমাননা সম্পর্কে রায় প্রদান করতে গিয়ে উল্লেখ করে বলেছেন, বিচারকরা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় তবে সে সমালোচনা সংযত ও বস্তুনিষ্ঠ হওয়া দরকার। একজন বিচারকের রায় নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করতে আইনগত কোনো প্রকারের বাঁধা নেই। কিন্তু প্রদত্ত সে রায়ের কারণে বিচারককে ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনা করা যাবে না। প্রত্যেকের বিবেচনায় রাখতে হবে আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় আইন বিচারকদের এতটুকু নিরাপত্তা জনগণ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে প্রদান করেছেন। যদি সে রকমটা না হতো তবে বিচারকের মতো সর্বাধিক গুরুদায়িত্ব পালন করতে কেউ রাজি হতেন না।

বিচারকরা যে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তা কখনও নয় তবে তার দায়বদ্ধতা বা সে সব সমালোচনার ধরন ও প্রকৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। বিচারকের রায়ে যদি কোনো ব্যক্তি সন্তুষ্ট না হয় এবং সে যদি মনে করে তবে সে ন্যায়বিচারের প্রাপ্তির জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে। কাজেই আমাদের উচিত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ভুলে গেলে চলবে না একজন বিচারক যদি তার বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভীক না হতে পারেন ও প্রদত্ত রায় সম্পর্কে যদি উদ্বিগ্ন থাকেন বা প্রচারিত কোনো সংবাদ সম্পর্কে ভীত হয়ে যান তাহলে তিনি ন্যায়বিচার কিংবা স্বাধীনভাবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কুণ্ঠাবোধ করতে পারেন। যদি সে রকমটা হতে থাকে তবে পরিশেষে বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে দেশবাসী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিচারপতিদের সাহস থাকতে হবে, তবেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পাবে। পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

আঠারো শতকের প্রথম ভাগে মহামান্য বিচারপতি Lord Robertson বলেছিলেন in the absence of immunity, no man but a beggar or a fool would be a judge. কাজেই প্রচলিত আইন ও আদালতকে সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের দায়িত্ব।

বিচারকদের দায়িত্ব কোনো মামুলি দায়িত্ব নয় বরং গুরু দায়িত্ব। বিচারকের কাজের সঙ্গে চিকিৎসকের কাজের তুলনা করলে ভুল হবে না। ২০০৭ সালে মহামান্য হাইকোর্ট আদালত অবমাননা আইনের মামলায় রায় প্রদানকালে মন্তব্য প্রদানকালে বলেন, প্রতিটি চিকিৎসক জীবন্ত মানুষের হৃদয়ে, মস্তকে বা শরীরের অন্যান্য বিশেষ অপরিহার্য ও সংবেদনশীল অঙ্গে অপারেশন করার সময় তার সম্পূর্ণ মনোযোগ শুধু অপারেশনে নিয়োজিত করে থাকেন। কেননা তিনি জানেন তার মনোযোগের সমান্যতম বিঘœ ঘটলে রোগীর প্রাণহানি ঘটতে পারে।

যদি কোনো কারণে সে চিকিৎসক সমালোচনার সম্মুখীন হন কিংবা ভীত হয়ে যান তবে তার পক্ষে যেমন অপারেশন করা দুরূহ হয়ে পড়বে ঠিক তেমনি বিজ্ঞ বিচারকরা যদি সমালোচনার ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন তবে তা হলে বিচারকার্য অবিচারে পর্যবসিত হতে পারে। ফলাফল হিসেবে বিচারক সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সুদূর প্রসারিভাবে রাষ্ট্রের আপামর জনসাধারণ অপরিসীম ক্ষতির স্বীকার হতে পারেন। সে দিক বিবেচনায় কোনো বিচারক সম্পর্কে কোনো প্রকারের অভিযোগ সৃষ্টি হলে প্রথমে তাকে সে অভিযোগ সম্পর্কে জ্ঞাত করা অপরিহার্য। পরবর্তী সময়ে তার ঊর্ধ্বতন নিয়ন্ত্রণকারী মহামান্য বিচারক মহোদয়কে বিষয়টি জ্ঞাত করা দরকার। যদি প্রয়োজন হয় তবে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতির গোচরীভূত করা যেতে পারে। কারণ, কোনো অসৎ বিচারককে কোনো পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগে নিয়োজিত রাখা উচিত নয়।

১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট অব কেরেলা বনাম প্রিতিশ নন্দি (ক্রিলজা-১০৬৩) মামলায় মহামান্য বিচারপতি বলেন, বিচারকের বদান্যতা এতখানি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে না যে, সে কথা ও কার্যকে উৎসাহিত করবে যা জনসাধারণের বিচার প্রণালীর প্রতি আস্থা নষ্ট করবে, কোনো রকমের অনুগ্রহ বা ভীতি ছাড়া তাদের দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে। মুক্ত সমালোচনায় সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও অর্পিত ভূমিকা রাষ্ট্রের স্বীকার করে নিতে হবে। মন্তব্য, সমালোচনা, তদন্ত ও গ্রহণের যুগে বিচার বিভাগ যৌক্তিক ও অনিষ্টবিহীন সমালোচনার হাত থেকে নিরঙ্কুশভাবে অব্যাহতি দাবি করতে পারে না। কিন্তু সমালোচনাটি শোভন ভাষায় নিরপেক্ষ, অনুভূতিপূর্ণ, সঠিক ও যথাযথ হতে হবে।

সম্পূর্ণভাবে যেখানে সমালোচনার ভিত্তি হচ্ছে সত্যবিকৃতি ও পুরো বানোয়াট এবং বিচারকের ন্যায়পরায়ণতার ওপর কটাক্ষপূর্ণ ও বিচার বিভাগের সম্মান খাটো করা ও জনগণের আস্থা ধ্বংস করে দেয়া এটা উপেক্ষা করা যায় না। যেহেতু আইনের মহার্ঘতা অবমাননাকারীদের দ্বারা কালিমা লিপ্ত করার অনুমতি দেয়া যায় না।

রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে আদালতের রায়ের গঠনমূলক সমালোচনা করার। রায়ের সমালোচনা হতে কোনো দোষ নেই কিন্তু যে বিচারক সে রায় প্রদান করেছেন তাকে তার রায়ের জন্য ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনা বা কোনো প্রকারের আক্রমণ করা যাবে না। যদি কোনো রাষ্ট্রে সে রকমটা হতে থাকে তবে সে রাষ্ট্রের বিচার প্রতিষ্ঠান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ও গণতান্ত্রিক ধারা হুমকির মুখে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

ব্রিটিশ প্রবর্তিত আইনের ভিত্তি হচ্ছে “রাজা কোন অন্যায় করতে পারেনা। আদালত রাজার হয়ে তথা সরকারের পক্ষ হয়ে বিচার করে। অনেক সময় দেখা যায় একই মামলায় ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন ভিন্ন। সুপ্রীম কোর্টও পৃথক রায় দিয়েছেন। তা সত্বেও বলা যাবেনা কোন আদালত ভুল বা অন্যায় রায় দিয়েছেন। প্রতিটি কোর্ট তার নিজ বুদ্ধি এবং বিবেচনায় রায় দিয়েছেন। তাই কোন কোর্টের রায়কেই সমালোচনা করা যাবেনা। অথচ আমেরিকা সহ আধুনিক বিশ্বের বহু দেশে আদালতের রায়কে সমালোচনা করার অধিকার নিয়ে কথাবার্তা উঠেছে জন স্বার্থে বিচার কার্যের নিরেপেক্ষ ও যুক্তি সংঘত সমালোচনা আদালত অবমাননা নয়।

আদালত অবমাননার অপরাধ নিস্পত্তি করার ইখতিয়ার একমাত্র হাইকোর্ট বিভাগের। তবে অধঃস্থন আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে যদি অবমাননাকর কাজটি দন্ডবিধির অধীনে শাস্তি যোগ্য হয় সে ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগ কেসটি গ্রহন করবেন না। আদালত অবমাননার শাস্তি কারাদন্ড যার মেয়াদ ছয় মাস পর্যন্ত হতে পারে অথবা জরিমানা যার পরিমাণ দুই হাজার টাকা হতে পারে অথবা উভয়ই। ক্ষমা প্রার্থনা করলে অবমাননার আসামীকে মুক্তি দেয়া যায়। আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদ সুপ্রীম কোর্টকে তদন্ত/দন্ডাদেশ সহ প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদানের চুড়ান্ত ক্ষমতা দিয়েছে। দন্ডবিধির ১৭২-১৯০, ২২৮ ধারা ও ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৭৬, ৪৮০-৪৮৭, ১৯৫ ধারা আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। দেওয়ানী ও ফৌজদারী যে কোন আদালতের কোন আদেশকে অমান্য করাকেও আদালত অবমাননা বলে।

যেসব বিষয়ে আদালত অবমাননা হতে পারে:
ক) বিচারাধীন কোন বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা আদালত অবমাননা,
খ) এমন কিছু প্রকাশ করা যা বিচারাধীন কোন মামলার বিষয়কে প্রি-জুডিস বা ক্ষতিগ্রস্থ করে,
গ) এমন কিছু প্রকাশ করা যা আদালতের ফলাফলকে প্রভাবান্বিত করে,
ঘ) বিচারাধীন অভিযুক্ত আসামীকে “নির্দোষ” অথবা “দোষী” মন্তব্য সহকারে সংবাদ পরিবেশন ও ন্যায় বিচারকে বিঘ্নিত করতে পারে।
ঙ) সংবাদপত্রে অপমানজনক শিরোনাম সহ আসামীর ফটো প্রকাশ অবমাননা।

১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইনে আদালত অবমাননার স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় ২০১৩ সালে নতুন আদালত অবমাননা আইন তৈরী করে সংসদে পাশ করা হয় যা একটি মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বাতিল করে দিয়েছেন। তারপরও আদালত অবমাননাকর কিছু করা এখনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যে সংবাদে জনসমক্ষে আদালতের মান মর্যাদা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে সে ধরনের সংবাদ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচার করা উচিৎ নয় বা করা যাবে না। এ জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।

আদালত অবমাননা-সংক্রান্ত প্রকাশিত রায়গুলোর সারসংক্ষেপ দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের একটি রায়ে, যা ১৯৮৩ সালের অল ইন্ডিয়া রিপোর্টসের ১১৫১ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে। ওই রায়ে দেওয়া আদালত অবমাননার সংজ্ঞায় বলা হয়, `বিচার কাজে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আর নিজের পদবি একজন বিচারককে এমন প্রশিক্ষণ দেয়, যার দ্বারা তিনি সংবেদনশীল হওয়ার বদলে সহানুভূতিশীল হন।

অন্যদের চেয়ে একজন বিচারক মামলারত ব্যক্তিদের অহমিকা, হতাশা, অনুভূতি ও মানসিক চাপ বেশি হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম। তবুও এর একটা সীমারেখা থাকা অত্যন্ত জরুরি। একজন বিচারকের প্রতি এমন অপবাদ রচনা কখনো হতে পারে না। যার ফলে বিচারব্যবস্থা হুমকি কিংবা নষ্টের সম্মুখীন হবে। এর অর্থ এই নয় যে বিচারকদের রক্ষা করা আবশ্যক। কারণ বিচারকরা নিজেদের রক্ষা করতে অসমর্থ নন। এর প্রকৃত অর্থ জনগণের স্বার্থ ও অধিকারের উদ্দেশ্যেই বিচারব্যবস্থাকে শুধু অপবাদ-রটনা থেকে সুরক্ষা করতে হবে।


লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন গ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। Email: [email protected]  

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea
Intlestore

আইন -এর সর্বশেষ

Hairtrade