Bahumatrik Multidimensional news service in Bangla & English
 
৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, বুধবার ২২ নভেম্বর ২০১৭, ৪:৪১ অপরাহ্ণ
Globe-Uro

রাজবন বিহারে দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান শুরু


০৩ নভেম্বর ২০১৭ শুক্রবার, ১২:৫৬  এএম

মোঃ মোস্তফা কামাল, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

বহুমাত্রিক.কম


রাজবন বিহারে দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান শুরু
ছবি : বহুমাত্রিক.কম

রাঙ্গামাটি : পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধধর্মালম্বীদের তীর্থস্থান হিসাবে পরিচিত রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে ৪৪ তম দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান।

এশিয়ার বৌদ্ধ ধর্মালম্বী দেশসমূহের মধ্যে রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারেই বৃহৎ পরিসরে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই চীবর দানানুষ্ঠান। কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান মূলত বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও রাজবন বিহারের এই চীবর দানানুষ্ঠান এখন পরিণত হয়েছে সার্জনীন উৎসবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বেইন কর্মীদের পঞ্চশীল গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় চীবর দানানুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা। পরে পঞ্চশীল গ্রহণের মাধ্যমে কঠিন চীবর তৈরির বেইন ঘর উদ্বোধনের পর চরকায় সুতা কাটার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশিষ রায় বেইন ঘর এবং রাণী ইয়েন ইয়েন সুতা কাটা ঘর উদ্বোধনের মাধ্যমে চীবর প্রস্তুতের আনুষ্ঠানিবকতার উদ্বোধন করেন। সকল আনুষ্ঠানিকতায় চীবর প্রস্তুত শেষে ৩ নভেম্বর শুক্রবার ভান্তকুলের হাতে ছবির প্রদান করা হবে। সন্ধ্যা ৬ টায় প্রদীপ পূজার মাধ্যমে শেষ হবে দুই দিন ব্যাপী চীবর দানানুষ্ঠানের সকল কর্মসূচি।

বৌদ্ধধর্মীয় শাস্ত্রীয় মতে কঠিন চীবর দানকে সকল দানের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মূলত এই কারণে এই চীবর দানানুষ্ঠানেকে দানোত্তম কঠিন চীবর অনুষ্ঠান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মের মহাউপাসিকা মিগার মাতা বিশাখা কতৃর্ক প্রবর্তিত রীতি অনুসারে মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা বের করে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে প্রস্তুত করা হয় এই চীবর। চীবর মূলত বৌদ্ধ ভান্তদের পরিধেয় বস্ত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের সাধক পুরুষ সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভন্তের নির্দেশনায় এবং তাঁর উপস্থিতিতে লংগদু উপজেলার তিন টিলা বৌদ্ধ বিহারে প্রথম বারের মতো বিশাখা কতৃর্ক প্রবর্তিত রীতি অনুসারে প্রুচলন করা হয় দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান। পরবর্তীতে বনভন্ত রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে আসার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম বারের মতো রাজবন বিহারে মিগারমাতা বিশাখা প্রবার্তত রীতি অনুসারে দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠান শুরু হয়।

এর পর থেকে প্রতিবছর রাজবন বিহারে চীবর দানানুষ্ঠান হয়ে আসছে। প্রথম দিকে রাজবন বিহারে এই চীবর দানানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে স্বল্পপরিসরের আয়োজন হলেও পরবর্তীতে এই আয়োজন বৃহৎ পরিসরে রুপ নেয়। বিশেষ করে চীবর দানানুষ্ঠানের সমাপনী দিনে বনভন্তের ধর্মীয় দেশনা শোনার জন্য ক্রমান্বয়ে এই ভিড় বাড়তে থাকে।

রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারের উপাসক-উপাসিকা পরিষদের উদ্যোগে প্রতিবছর এই দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে আসছে। পরিষদের দায়ক-দায়িকাদের প্রতিবছর নিরলস শ্রম দিয়ে এই চীবর দানানুষ্ঠানের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আসছে। ৪৪তম দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানের আয়োজনের প্রস্তুতি বিষয়ে উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সভাপতি গৌতম দেওয়ান জানান ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় যথাযথ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এবছরও চীবর দানানুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।

৬ শতাধিক দায়ক-দায়িকা এবারের চীবর দানানুষ্ঠানে চীবর প্রস্তুতির কাজে অংশ নেবেন। এই উপলক্ষে চীবর দানানুষ্ঠান স্থলে দুই শতাধিক বেইন স্থাপন করা হয়েছে। তিনি জানান, রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারের প্রধান ধর্মীয় গুরু ভন্তের মহা নিরআন লাভের পর ও ভক্তগুলোর কথা বিবেচনায় এখনো রাজবন বিহারে প্রয়াত বনভন্তের দেহ সংরক্ষণ করা আছে। চীবর দানানুষ্ঠানে আগত সকলে বিশেষ ভাবে রক্ষিত ভনভন্তের শবদাহে শ্রদ্ধা জানাবেন। তাছাড়া চীবর দানুষ্ঠান স্থলে বনভন্তের প্রতিকৃতি থাকবে মধ্যমনি হিসাবে। চীবর দানানুষ্ঠানের ধর্মীয় দেশনায় বনভন্তের রেকর্ড কৃত ধর্মীয় দেশনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ গুলো প্রচার করা হবে। বিগত বছরগুলোর ন্যায় এবছর ও চীবর দানানুষ্ঠানে লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

গৌতম দেওয়ান জানান, এবছরের চীবর দানানুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন স্থান ধেকে বৌদ্ধ ধর্মালম্বী লোকজনদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতেও বৌদ্ধ ধর্মালম্বী দায়ক-দায়িকাদের সমাগম ঘটবে। দায়ক-দায়িকোদের পাশাপাশি ও দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দিরের ধর্মীয় গুরুরাও চীবর দানানুষ্ঠানে অংশ নিবেন। তাছাড়া চীবর দানানুষ্ঠানের বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকত এবং ধর্মীয় দেশনায় অন্যান্য ধর্মালম্বী লোকজন ও উপস্থিত থাকবেন বলে তিনি জানান। তিনি জানান চীবর দানানুষ্ঠানের সমাপনী দিনে রাঙ্গামাটি রাজবন বিহার এলকা জনসমুদ্রে পরিণত হবে।

এদিকে রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারের ৪৪ তম দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানের সুষ্ঠূ পরিবেশে নিশ্চিত করার র লক্ষ্যে ৪ স্তরের পুলিশী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান। তিনি জানান, চীবর দানানুষ্ঠানের সময় পোশাকি পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশও মোতায়ান করা হয়েছে। রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে বিশেষ পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের পাশাপাশি রাজবন বিহারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসিয়ে পুরো এলাকার সার্বিক পরিবেশ মনিটরিং করা হচ্ছে। চীবর দানানুষ্ঠানে ৫ শতাধিক পুলিশ সদস্য সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানানো হয়েছে।

রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান জানিয়েছেন, রাজবন বিহারের ৪৪ তম দানোত্তম কঠিন চীবর দানুষ্ঠান সুষ্ঠূ পরিবেশে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সকল প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রযোজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে চীবর দানানুষ্ঠানের সুষ্ঠূ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে। আইন শৃংখলা রক্ষার প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

এদিকে ৪৪ তম দানোত্তম কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজবন বিহারের আশে পাশের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন দ্রব্যের পসরা বসানো হয়েছে। শুরু হয়েছে মেলা। রাঙ্গামাটির আবাসিক হোটেল গুলোতে এখন খালি কোন রুম নেই বলে জানিয়েছেন হোটেল কর্তৃপক্ষ।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea
Intlestore

বিশেষ প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ

Hairtrade