Bahumatrik Multidimensional news service in Bangla & English
 
৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, সোমবার ২১ মে ২০১৮, ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

যৌন হয়রানি বিষয়ে কেন মুখ খোলেনা মেয়েরা?


২০ জানুয়ারি ২০১৮ শনিবার, ০২:২০  পিএম

বহুমাত্রিক ডেস্ক


যৌন হয়রানি বিষয়ে কেন মুখ খোলেনা মেয়েরা?
Getty Images

ঢাকা : সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে রাজনীতি, ব্যবসা, শিল্প-সংস্কৃতির জগতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন অত্যাচারের অনেকগুলো ঘটনা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন বেশ কয়েকজন নারী এবং পুরুষ। হলিউডের শীর্ষ একজন প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল নীরবতা ভাঙার পালা।

বিভিন্ন পেশায় যৌন নির্যাতনের বা হয়রানির প্রতিবাদে `মি টু` হ্যাশট্যাগ দিয়ে জনপ্রিয় ক্যাম্পেইন চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

বাংলাদেশেও অভিযোগ উঠেছে যে, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র কোনো অঙ্গনেই নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা থেমে নেই।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিস কেন্দ্র বলছে, ২০১৭ সাল জুড়ে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে যৌন সহিংসতায় নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতা।

কিন্তু বাংলাদেশে কেন জোরালোভাবে গড়ে ওঠেনি এই ক্যাম্পেইন?

বাংলাদেশে টেলিকম কোম্পানির যেসব বিজ্ঞাপন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে তার একটি ছিল কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস নিয়ে নির্মিত একটি বিজ্ঞাপন, যেখানে অভিনয় করে রীতিমত তারকা হিসেবে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিলেন মডেল ফারহানা শাহরিন ফারিয়া।

সম্প্রতি মিডিয়া জগতের কাজের ক্ষেত্রে নানারকম হয়রানির কথা উঠে এসেছে তার এক সাক্ষাতকারে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন মিডিয়া জগতে কাজ করতে হলে তার ভাষায় `স্যাক্রিফাইস` করতে হয়।

"আমি ছিলাম লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার ২০০৭ এর সেকেন্ড রানার আপ। মূলত যখন আমি বাংলালিংক কাস্টমার কেয়ারের বিজ্ঞাপন করি তারপর থেকে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে বাজে প্রস্তাব পাই", বলেন ফাারিয়া।

এর আগেও তিনি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ ভিডিও তে তুলে ধরেন নানারকম হয়রানির কথা।

কিন্তু এটি নিয়ে আগে মুখ খোলেননি কেন? জানতে চাইলে তিনি জানান, সবসময়ই তিনি এ বিষয়ে প্রতিবাদ করে আসছেন। যার জন্য অনেক বড় বড় কাজ হারাতে হয়েছে তাকে।

"সরাসরি অফার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আমাদের সাথে `পার্সোনাল রিলেশন` মেইনটেইন করতে হবে। কেন আমি পার্সোনাল রিলেশন রাখবো? আমার কোয়ালিটি, বিউটি দিয়ে আমি কাজ করবো। এই অফারগুলির কারণে আমাকে অনেক কাজ ছেড়ে দিতে হয়েছে। যেখানে আমার মনে হয়েছে আমার কোয়ালিটির চেয়ে `স্যাক্রিফাইস` টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"।

কেন আমাকে কাজের অফার দেয়া হলো তার সাথে এমন শর্ত দেয়া হলো?

কিন্তু বাংলাদেশে কাজ দেয়ার নাম করে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তার মত অনেকের কাছ থেকেই সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসে। কিন্তু এগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেন ইন্ডাস্ট্রির নেতৃত্ব স্থানীয় পরিচালকরা?

চলচ্চিত্র পরিচালক প্রযোজক সোহানুর রহমান সোহানের কাছে প্রশ্ন রাখা হলে তিনি বলেন, "এখানে ভালো খারাপ অনেক মানুষ আছে। কেউ ফিল্মকে হয়তো খারাপভাবে ব্যবহার করছে। তিনি (ফারিয়া) হয়তো এরকম কারো পাল্লায় পড়েছেন। দীর্ঘ ৪০ বছর কাজ করছি। তবে আমার ক্ষেত্রে এমন কখনো ঘটেনি। আবার অনেকসময় কেউ কেউ আমাদেরও প্রস্তাব দিয়ে সুযোগ নিতে চায়, যেটা কখনো সম্ভব না"।

তবে অভিযোগ থাকলে প্রমাণ নিয়ে প্রযোজক বা পরিচালক সমিতিতে জানালে তারা ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

হলিউডের যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর গত অক্টোবর মাসে বিবিসির এক জরিপে উঠে এসেছে, ব্রিটেনে কর্মক্ষেত্রে বা পড়াশুনার জায়গায় অর্ধেক নারীই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, এমনকি এক পঞ্চমাংশ পুরুষও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

যৌন হয়রানির শিকার প্রায় ৬৩ শতাংশ নারী বিবিসিকে জানান, ঘটনার পর তারা এ বিষয়ে কোনো রিপোর্ট করেননি বা কাউকে জানান নি।

অন্যদিকে যৌন হয়রানির শিকার ৭৯ শতাংশ পুরুষ জানিয়েছেন বিষয়টি তারা নিজেদের মধ্যেই চেপে রেখেছিলেন।

এছাড়া, প্রতি সাত জনে অন্তত একজন অযাচিত বা অশ্লীল স্পর্শের শিকার হয়েছেন।
এরপর সোশ্যাল মিডিয়ায় `মি টু` হ্যাশ ট্যাগে অনেক নারী-পুরুষ জানিয়েছেন কীভাবে তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

শারীরিক নির্যাতনের বা হয়রানির প্রতিবাদে `মি টু` হ্যাশট্যাগ দিয়ে জনপ্রিয় ক্যাম্পেইন শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

যৌন হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বেশ বড়সড় মিছিলও হয়েছে হলিউডে।

সামাজিক মাধ্যমে হ্যাশ ট্যাগ মি টু - প্রথমে শুরু করেছিলেন সমাজকর্মী টারানা বার্ক এবং পরে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় অভিনেত্রী আলিসা মিলানো, প্রযোজক হার্ভি ওয়েনস্টিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করার পর।

এরপর বিশ্বজুড়ে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীদের অনেকেই এ প্রচারণায় এগিয়ে আসেন এবং নিজের ওপর ঘটে যাওয়া হয়রানির ঘটনা প্রকাশ্যে আনেন।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব যৌন নির্যাতনের ঘটনার বিষয়ে সরাসরি মুখ খুলতে চান না কেউ। শোবিজ বা কর্পোরেট জগতের নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া এমন সব হয়রানির কথা জানালেও, বেশ কজনই সরাসরি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

ঢাকার বনশ্রী এলাকার একজন নারী (ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে এখানে তার নামটি প্রকাশ করা হচ্ছে না।) কাজ করতেন নামকরা একটি প্রতিষ্ঠানে।

কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বসের দ্বারা বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে শেষশেষ চাকরি ছেড়ে দিতেই বাধ্য হন।

"একদিন গিয়ে ডেস্কে বসেছি। আমার ব্রাঞ্চের একজন বস আমাকে ফোন দিয়ে বলে `আজ কি রং এর ব্রা পড়ে এসেছো?` আমি তো শক্ড হয়ে গেলাম। পড়ে বললাম আপনাকেএকটা থাপ্পড় মারবো। সে বলে মারো, তাও ভালো ...আবার একদিন মেসেঞ্জারকে দিয়ে সিনেমার টিকেট কাটিয়ে এনে খবর দিচ্ছে`। স্যার আপনাকে নিয়ে সিনেমায় যাবে। মেসেঞ্জারদের মাধ্যমে এভাবে চাউর করা হতো, আমাকে ব্ল্যাকমেইল করা হতো। পরে আমি বাধ্য হলাম চাকরিটা ছেড়ে দিতে"।

কিন্তু তিনি কখনো বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেননি। চেষ্টা করেছেন বদলির তাও না পেরে নিজেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

২০১৬ সালে কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ সিএইচআরআই- এর গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশের পুলিশে কর্মরত নারী কনস্টেবলদের ১০ ভাগের বেশি সদস্য যৌন হয়রানির শিকার হন। আর উপ পরিদর্শক ও সহকারী উপ পরিদর্শকদের শতকরা তিন ভাগ এ ধরনের ঘটনার শিকার হন। ক্যাডার পর্যায়ের নারী পুলিশরাও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বাইরে নন-ওই রিপোর্টে বলা হয়।

২০১৭ সালের শেষে এসে আইন ও শালিস কেন্দ্র জানায়, ধর্ষণের ঘটনা ও তার ভয়াবহতা অনেক বেড়েছে। একবছরে সারাদেশ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮১৮ জন আর ধর্ষণের পর হত্যার শিকার প্রায় অর্ধশত। আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন।

বিভিন্ন অন্যায় নিপীড়ন বা নির্যাতনের খবর যারা তুলে ধরেন সেই সাংবাদিকতা পেশায় কর্মরত নারীদেরও যৌন নিপীড়নের মুখে পড়তে হয়।

দীর্ঘিদন ধরে সংবাদকর্মী হিসেবে কর্মরত রুবিনা মোস্তফা খুলে বলেন তার অভিজ্ঞতা
ছবির কপিরাইট Ain o salish kendra website
Image caption ২০১৭ সালের শেষে এসে আইন ও শালিস কেন্দ্র জানায়, ধর্ষণের ঘটনা ও তার ভয়াবহতা অনেক বেড়েছে।

পুলিশ, সরকারি অফিস, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংবাদ মাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন যৌন হেনস্থার পরেও বাংলাদেশে অবশ্য ব্যাপকতা পায়নি মি টু ক্যাম্পেইন।

যতটুকুই হয়েছে তাতে অবশ্য বাংলাদেশে ফেসবুক টুইটারে অনেক পুরুষও যোগ দিয়েছেন এই ক্যাম্পেইনে।

অনেক পুরুষ `আই হ্যাভনট` হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে জানিয়েছেন তারা কখনো এমন হয়রানি করেননি।

এই ক্যাম্পেইনে যুক্ত ছিলেন যারা তাদের একজন পেশায় ব্যাংক কর্মকর্তা আফসানা কিশোয়ার। তিনি বলেন, "এর ফলে অনেকেই মুখ খুলেছেন। নিজের ওপর ঘটা যৌন নির্যাতনের কথা বলেছেন। যা দেখে আমরাও উদ্বুদ্ধ হয়েছি"।

আবার কোনও কোনও পুরুষও জানিয়েছেন তাদের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনে বিষয়ে। কিন্তু এ ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দেয়ার পর যে প্রতিক্রিয়া আসে সেটা অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে বিব্রতকর।

ফলে অনেকেই শেষপর্যন্ত এই বিষয়টিতে আগ্রহ হারিয়েছে- যেমনটা উঠে আসে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর কথায়।

এ সমস্ত হয়রানির ক্ষেত্রে সাহস করে মুখ খোলার যে অনীহা, তা প্রায় তিনবছর আগে পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে গণহারে যৌন হয়রানির একটি ঘটনার সময় প্রকটভাবে দেখা গেছে। ফলে সেই ঘটনার পর যে তুমুল দাবি উঠেছিল বিচারের তাও স্তিমিত হয়ে গেছে।

সোশ্যাল মুভমেন্ট বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ডক্টর সামিনা লুৎফা। তিনি মনে করেন এধরনের ক্যাম্পেইন বাংলাদেশে বড় কোনো মুভমেন্ট হিসেবে গড়ে উঠতে না পারার পেছনে অনেকগুলো বিষয় কাজ করেছে।

"যেকোন যৌন নিপীড়নের বিষয়ে কথা বলার বিষয় নির্ভর করে কিভাবে সমাজে নিপীড়ণকারী এবং নিপীড়িতকে দেখা হচ্ছে তার ওপরে। যদি সমাজে যৌন নিপীড়ককে একজন অপরাধী হিসেবে দেখা না হয় এবং দেখা হয় পৌরুষের অংশ হিসেবে তাহলে দুধরনের বিষয় ঘটে। একটা হচ্ছে যৌন নিপীড়নকে বুঝতে চিনতে পারেনা মানুষ। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে যে পরিস্থিতিতে আছেন সে অবস্থায় তিনি সেটা বলার সাহস পাচ্ছেন কি-না"।

আর যৌন নিপীড়ন কিন্তু যৌন ইচ্ছা থেকে তৈরি হয়না, এটা কিন্তু হয় পুরুষের ক্ষমতার চর্চা থেকে। পুরুষ তার ক্ষমতাকে চর্চা করে অধীনস্ত নারীকে নানাভাবে হেনস্থা করার মধ্য দিয়ে"।

তার মতে, "ক্ষমতাশালী পুরুষের বিরুদ্ধে নারী কথা তখনই বলবে যখন সে বিচারের সম্ভাবনা জানবে। কিন্তু এ সমাজ নিপীড়িত নারীকে আরো বেশি নিপীড়ন করে"।

মেয়েরা যতই ঘর থেকে বের হচ্ছে এ ধরনের নির্যাতন কমার বদলে আরো বাড়ছে বলে বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের এই শিক্ষক সামিনা লুৎফা।

অধ্যাপক সামিনা লুৎফা আরো বলেন, ``এ ধরনের ক্যাম্পেইনের ফলে বড় কোনো সাফল্যের উদাহরণও নেই যেটা অনুপ্রাণিত করবে। আবার এই ধরনের ক্যাম্পেইনকে সামনে নিয়ে যাবে সেরকম উদ্যম জোগানোর মত রোল মডেলও দেখা যাচ্ছেনা"।

এক্ষত্রে তিনি তনু হত্যার পর সৃষ্ট বিক্ষোভ প্রতিবাদ এবং পহেলা বৈশাখে যৌন হামলার পরের প্রতিবাদের উদাহরণ টানেন। যা পরবর্তীতে আর বেশিদূর যেতে পারেনি।

ফলে এই ক্যাম্পেইন সারাবিশ্বে জোয়ার তৈরি করতে পারলেও বাংলাদেশে এসে মুখ থুবরে পড়েছে।

আর এরকম ক্ষেত্রে আইনের আশ্রয় নেয়ার বিষয়টি ভাবতেই পারেননা অনেক নারী আরো বেশি সামাজিক হয়রানির আশংকায়।-বিবিসি বাংলা

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea
Intlestore

নারীকথা -এর সর্বশেষ

Hairtrade