Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৬ আশ্বিন ১৪২৫, শনিবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে না পারার দুঃখে আত্মহত্যা


১৭ মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০২:৩১  এএম

শেখ প্রিয়া, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে না পারার দুঃখে আত্মহত্যা

খুলনা : যে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার স্বপ্ন দেখতেন দেবাশীষ মন্ডল। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া করে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) মৃত্তিকাবিজ্ঞানের ওই ছাত্রের স্বপ্ন ছিল পবিপ্রবির শিক্ষক হবেন। সেভাবেই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। অনার্স ও মাস্টার্সে তিনি ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন। মাঝখানে কিছুদিনের জন্য তিনি কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।

এরই মাঝে পবিপ্রবির মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে লেকচারার নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তার মৌখিক পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। চাকরি পাওয়ার শর্তে কর্তৃপক্ষের ঘুষের আবদার পূরণে ১৫ লাখ টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছিলেন তিনি। চাকরি না হওয়ার কথা জানতে পেরে রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে এই মেধাবী সোমবার (১৪ মে ) বর্তমান কর্মস্থল কুষ্টিয়ায় ভাড়াবাড়িতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। যদিও পরিবারের দাবি তাকে কেউ হত্যা করতে পারে। ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরখালী ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া গ্রামের পরিমল মন্ডলের ছেলে দেবাশীষ মন্ডল।

দেবাশীষের স্বজন ও সহকর্মীদের সূত্রে জানা যায় দেবাশীষ গত ১২ মে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে কুষ্টিয়ায় এসে খুব চিন্তিত ছিলেন (ঘটনার দিন সোমবার) সকাল থেকে ফোনে কারও সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করছিলেন। এ সময় তাকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। সহকর্মীরা বারবার তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করেও কোনো উত্তর পাননি। দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে তিনি অফিস ত্যাগ করে বাসায় ফেরেন। তার সাবলেটে থাকা প্রভাষক আব্দুল মান্নান জানান বাসায় গিয়ে দেখি মূল দরজা ভেতর থেকে আটকানো।

অনেক ধাক্কাধাক্কি করে কোনো সাড়া না পেয়ে আমরা বাড়িওয়ালাকে খবর দিই। পাশের বাসার ৩য় তলার সানশেড থেকে উঁকি দিয়ে তাকে বসা দেখতে পেয়ে দরজা খুলতে অনুরোধ করি। তিনি খুলবেন বললেও আর খুলেননি। একপর্যায়ে আমরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখি। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।

দেবাশিষ মন্ডলের ছোটভাই আশিস কুমার বলেন, দাদা পরীক্ষা দিয়ে এসে বাড়িতে ফোন দিয়ে জানান তাকে চাকরী পেতে ১৫লাখ টাকা দিতে হবে। বাড়ি থেকে ১০ লাখ টাকা দিতে বলেন। অবশিষ্ট ৫ লাখ তিনি নিজে দেবেন বলেও আমাদের জানান। আমরা ১০ লাখ টাকা জোগাড়ও করে ফেলেছিলাম, কিন্তু এর মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে গেল। ভাই জানতে পারেন, কোনো এক আওয়ামী লীগ নেতার ভাইজির চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। এ চাপ তিনি মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে আমার ভাই। এর আগে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তির পর নানা ধাপ পেরিয়ে ১২ মে দেবাশীস মৌখিক অংশ নেন। এর দুই দিন পরেই তিনি আত্মহত্যা করেন।

তিনি জানান পবিপ্রবির বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ২৪ এপ্রিল। এতে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার পদে চাকরি প্রার্থী হিসেবে মৌখিক পরীক্ষায় যোগ দেন ৬ জন। এর মধ্যে দেবাশীস মন্ডল সব যোগ্যতায় এগিয়ে ছিলেন। তার মৌখিক পরীক্ষাও ভালো হয়েছিল।

দেবাশিষের প্রতিবেশি চাচাতো ভাই নরেশ কুমার মন্ডল জানান সোমবার বিকেল ৫টার দিকে খবর পাই দেবাশীষ আত্মহত্যা করেছে। সোমবার রাতের ট্রেনেই কুষ্টিয়া যায়। দেবাশীষের লাশ কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে।  

ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরখালী ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া গ্রামের পরিমল মন্ডলের ছেলে দেবাশীষ। বাবা পরিমল মন্ডল নিজে একজন কৃষক। কিন্তু তিন ছেলেকে লেখাপড়া শিখিযেছেন। বড় ছেলে মিল্টন কুমার মন্ডল চালনা কোসি কলেজের প্রভাষক। মেঝে ছেলে দেবাশীষ মন্ডল রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে চাকরী করতো। ছোট ছেলে আশিষ কুমার মন্ডল খুলনা পলিটেকটেক ইন্সটিটিউটে ডিপ্লোমা করেছে। বর্তমানে বেসরকারী একটি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছে।

এদিকে দেবাশীষের লাশ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর মঙ্গলবার তার নিজ বাড়ি ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালিয়া গ্রামে সৎকার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: নাসির উদ্দীন জানান লোক মারফত খবর পেয়ে দেবাশীষ মন্ডলযে ফ্লাটে থাকতেন সেখানে তার কক্ষ থেকে ফ্যানের সাথে গলায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় লাশ উদ্ধার করা হয়। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের সদস্যদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।