Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৩০ আশ্বিন ১৪২৫, সোমবার ১৫ অক্টোবর ২০১৮, ৭:০৯ অপরাহ্ণ
Globe-Uro

দুই সন্তান হারানোর ৪৬ বছরেও শহীদ পরিবারের মর্যাদা মেলেনি


১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ রবিবার, ০৩:৪৫  এএম

কাজী রকিবুল ইসলাম

বহুমাত্রিক.কম


দুই সন্তান হারানোর ৪৬ বছরেও শহীদ পরিবারের মর্যাদা মেলেনি
-ছবিরন নেছা। ছবি: বহুমাত্রিক.কম

যশোর : পাকিস্তান আমলের ছোট্ট একটি শহর যশোর। সেই শহরের ঘোপ এলাকায় বাস করতেন ইব্রাহিম মোল্যা। তার নয় সন্তানের সংসারে সুখের কোন অভাব ছিল না। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে সুখি পরিবারে নেমে আসে অমানিশার ছায়া। তাদের কেউ কেউ পরিবার নিয়ে অন্য কোথাও, কেউবা দুঃখ স্মৃতি বুকে নিয়ে বাস্তভিটায় বসবাস করছেন।

১৯৭১ সালের যুদ্ধ চলাকালীন সময় ঘোপ এলাকার ইব্রাহিম মোল্লার বড় ছেলে বাবর আলি মোল্লা(২৫) ওরফে বাবুকে তার নানা বাড়ি যশোরের শালথা ফুলবাড়ি এলাকা থেকে মুক্তি বাহিনি বলে পাকিস্তানি হায়েনারা ধরে নিয়ে যায়। যশোরের শালিখা থানার ব্রিজের নদীর পাড়ে গুলি করে হত্যা করে পানিতে ভাসিয়ে দেয়। খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবারের লোকজন বাবুকে খুঁজতে থাকে এবং এক পর্যায়ে জানতে পারে তাকে মেরে ফেলেছে পাক-হানাদার। মৃত্যু কালে এক সন্তান রেখে যান। স্বজন হারা পরিবার হা হা করে ঘুরতে থাকে আর লাশ খুঁজতে থাকে। তার কদিন পরেই মেজো ছেলে ইসমাইল মোল্লা (১৯)ওরফে বেটা ভাই হারাবার শোকে রওনা হয় নানাবাড়ি।

এরপর বাড়ির লোকজন পরের দিন বেটাকে নানা বাড়ি না পেয়ে খুঁজতে থাকে। দুদিন পর জানতে পারে পাকহায়েনার দালালরা যশোর নিউ মার্কেট এলাকায় জবাই করে বেটাকে হত্যা করেছে। তখন পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের উপার্জনক্ষম দুই ভাইয়ের শহীদ হবার খবর শুনতে পেয়ে বাবা ইব্রাহিম মোল্যা পাগল হয়ে যায়। সন্তান হারাবার শোকে দিক-বিদিক খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। কিন্তু কোথাও দুই সন্তানের লাশ খুঁজে পায়নি।

জোয়ান দুই ছেলেকে হারিয়ে পিতা একপ্রকার ১৯৭১ থেকে বাকি জীবনটা নিজ বাসভবনে কেঁদে কেঁদেই মারা যান। বাবু-বেটা নামে তৎকালিন সময়ে অনেকেই চিনতেন এবং বয়জৈষ্ঠরা যারা যশোরের অনেকেই এদের নাম শুনতে আফসোস করেন। বাবু যশোর মুসলিম একাডেমি স্কুল থেকে এসএসসি পরিক্ষা দিয়েছিল। তার এক ছেলে আছে। যার নাম মাছুদ মোল্যা। বেটাও যশোর মুসলিম একাডেমি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। ইব্রাহিম মোল্লা নিজ নাম সই ছাড়া লেখাপড়া জানতেন না। ১৯৬০/৬১ সালে ঘোপগ্রামের নিজ পৈত্রিক সম্পত্তি সরকার নিয়ে নেয়। যার আংশিকে সরকাটি টিচার ট্রেনিং কলেজ, কেন্দ্রীয় কারাগার, সিএন্ডবি গ্যারেজ, ফুড অফিস, ঘোপ কবর স্থান, পিডিবি ষ্টাফ কোয়াটার নির্মাণ যাহা যশোর রেকর্ড রুমে প্রমান মেলে।

এই মোল্লা পরিবার যশোর ঘোপ এলাকার আদি স্থানীয় বাসিন্দা ঘোপের সকলের কাছে সৎ পর-উপকারি ভাল মানুষ হিসাবে ইব্রামোল্লা এক নামেই পরিচিত। বাবু বেটার মা ছবিরন নেছার জানা যায়, ওই সময় যারা বাবু ও বেটাকে চিনতেন এবং তাদের শহীদ হবার ঘটনা জানতেন তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এখনও বেঁচে আছেন। যশোর ঘোপ এলাকার গন্যমান্য ব্যাক্তদের অতি চেনামুখ বাবু-বেটা, এক সাথে বড়, বেড়ে ওঠা এবং যশোরের অসংখ্যক মানুষের পরিচিত মুখ ছিল এই বাবু-বেটা ।

তারা হলেন, শহরের ঘোপ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আলী রেজা রাজু, তার ছোট ভাই সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রাজেক আহমেদ, যশোর জেলা জাসদের সভাপতি রবিউল আলম, তার ভাই সদু আলম, ঠিকাদার মোহন আহমেদ, ব্যবসায়ী আব্দুল মুন্নাফ মনু মিয়া, তার ভাই আবুল কাশেম, টুকু মিয়া, ফকু মিয়া, শেখ বাবু মোহাম্মদ, আযাহার আলি কুন্টে, আজাদ রহমান, প্রয়াত চঞ্চল আহমেদ, তোতা মোল্যাসহ যশোরের আরও অনেকে। শুধু এই পরিবারের দেখভাল করার তেমন কোন জনবল না থাকায় স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর আজো তাদেরকে খোঁজ রাখেনি বাংলাদেশ সরকার।

সবুরন নেছা তার সন্তানদের শহীদের বর্ননা এবং লাশ পর্যন্ত না পাবার দুঃখের কথা বলতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, আমার সন্তানেরা কি দোষ করেছিল যে তাদের এভাবে বেওয়ারিশভাবে পৃথিবী থেকে চলে যেতে হলো। কিন্তু অতি দুঃখের কথা আজও আমাদের এই শহীদ পরিবারটি শহীদের মর্যাদা পায়নি । ইতোমধ্যে আমার স্বামী ইব্রাহিম মোল্যা পরলোক গত হয়েছেন। আমি দেখে যেতে পারব কিনা জানি না তবে সমস্ত যশোর বাসি হয়ত একদিন জানবে আমার সন্তানের রক্তে রঞ্জিত হয়ে এদেশের স্বাধীন পতাকার জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। তার প্রতি আমার সন্তানের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে সে দেশে দাঁড়িয়ে আমার এই অন্তিম সময়ে আকুল আবেদন আমার পরিবার কি শহীদের মর্যাদা পেতে পারেনা ? 

ছবুরন নেছা বর্তমান ৪ ছেলে ১ নাতি ৩ মেয়ে নিয়ে কোন রকমে সামান্য বাস্তভিটা মোল্লা বাড়ি-৫০/এ ঘোপ নওয়াপাড়া রোড, কোতয়ালি সদর যশোর বেঁচে আছেন।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।