Bahumatrik Multidimensional news service in Bangla & English
 
৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, সোমবার ২০ নভেম্বর ২০১৭, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

ঝাউদিয়ায় ঝরেছে ৪৭ প্রাণ, এলাকা ছাড়া শত পরিবার


০৫ অক্টোবর ২০১৬ বুধবার, ০১:৪১  এএম

এস এম জামাল, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

বহুমাত্রিক.কম


ঝাউদিয়ায় ঝরেছে ৪৭ প্রাণ, এলাকা ছাড়া শত পরিবার
সংঘাতের জনপদ ঝাউদিয়ায় পুলিশের এমন অভিযান চিরচেনা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি: বহুমাত্রিক.কম

কুষ্টিয়া : জেলার ১১টি গ্রাম নিয়ে গঠিত ঝাউদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ। এর মধ্যে রয়েছে আস্তানগর, হাতিয়া, বদ্দিনাথপুর, ঝাউদিয়া, মাছপাড়া, আলীনগর, উদয়পুর, কাশিনাথপুর, খোর্দ বাখইল, চরবাখইল ও মধ্য বাখইল।

এই ইউনিয়নে ২৫৭৭২ জন জনসংখ্যার মধ্যে ভোটার আছেন ১৯২০৭জন। সড়ক পথে কুষ্টিয়া সদর থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরে এই ইউনিয়নের পূর্বে আব্দালপুর, পশ্চিমে গোস্বামী দূর্গাপুর, উত্তরে উজানগ্রাম এবং দক্ষিণে ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু থানা। ১৯৬২ সালে ইউনিয়ন হিসাবে প্রতিষ্ঠাকালিন সময়ে এর আয়তন ২৬.৭২ কিলোমিটার। সর্বশেষ শতকরা ৪৫ ভাগ শিক্ষার হার অর্জন করলেও এখানে যাতায়াতের ব্যবস্থা আগের মতই কষ্টকর।

’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঝাউদিয়া ছিল মুক্তিবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি। সে কারণে ঝাউদিয়াকে দ্বিতীয় কলকাতা বলা হত। পাশের থানা আলমডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার উজানগ্রাম থেকে পাক বাহিনী ও রাজাকাররা যৌথভাবে ঝাউদিয়ায় আক্রমণ করে। চারদিক থেকে করা সে আক্রমণেও ঝাউদিয়ার মুক্তিযোদ্ধাদের দমাতে পারেনি।

প্রকৃতিগত কারণে ঝাউদিয়া ইউনিয়নের প্রায় চারদিক থেকে বিল ও খালের উপস্থিতি রয়েছে। বিস্তৃত সবুজ মাঠ এবং ভালো রাস্তা না থাকায় এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক বাহিনী সুবিধা করতে পারেনি।
স্বাধীনতার পরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও দখলকে কেন্দ্র করে ঝাউদিয়া ইউনিয়নে দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়। তখন একটি দলের নেতৃত্ব দেয় বাখইল গ্রামের তালেব বিশ্বাস এবং অপর দলের নেতৃত্ব দেয় আস্তানগর গ্রামের আজিজুল মন্ডল। মূলত: বহুল আলোচিত চাপাইগাছির বিলের এপার-ওপার মিলে গ্রাম্য কোন্দলের সূত্রপাত। তবে ইউনিয়নের ১১টি গ্রামের মধ্যে ঝাউদিয়া গ্রাম এই কোন্দলের সঙ্গে শুরু থেকেই জড়ায়নি।

বাকি ১০টি গ্রামেই দুই দলের সমর্থক ও লাঠিয়াল ওইসব লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষ এখানে এই সামাজিক কোন্দল এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, একই বাড়িতে বাবা একদলে আবার ছেলে অন্যদলে। বাবা ছেলের বাড়ি এবং ছেলে বাবার বাড়ি ভাংচুর করছে। দুজনই দুজনকে হত্যা করার জন্য মরিয়া। ইউনিয়নের অন্যতম অর্থকরি জায়গা হিসাবে চাপাইগাছির বিল আলোচিত। এই বিলকে দখল নিতে আধিপত্য বিস্তারের খেলা শুরু হয়। এর সাথে যোগ হয় চেয়ারম্যান নির্বাচন।

ইউনিয়নের কর্তৃত্ব দখলে নিতে সামাজিক দলগুলো চেয়ারম্যান নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই সংঘবদ্ধ হয়। এর পর তাদের হাতে চলে আসে বিল, হাট ও মসজিদ। এখানে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ঝাউদিয়া শাহী মসজিদও টাকা পয়সার অন্যতম কেন্দ্র। সামাজিক দ্বন্ধের সাথে আস্তে আস্তে সেখানে অস্ত্রের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখনই অস্ত্রধারীদের কাছে ভেড়াতে থাকে দু’দলই।

জাসদ গণবাহিনী ও কমিউনিস্ট পার্টির অস্ত্রধারী ক্যাডাররা তখন আশ্রয় পেতে থাকে দু’দলে। তখন এলাকায় খুনের চিত্র পাল্টে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ইউনিয়ন নির্বাচনেও সামাজিক দলের থেকে অস্ত্রধারীদের সমর্থন জরুরি হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পরে আশির দশক থেকে দুদলই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। শুরু হয় রক্তারক্তি।

চাপাইগাছির বিলের এপার-ওপার মিলে গ্রাম্য কোন্দলের সূত্রপাত

ঝাউদিয়া ইউনিয়নে প্রথম চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন হাসান আলী। কিন্তু শুরুতেই বিপত্তি। মেয়াদ শেষের তার প্রতি অনাস্থা আনা হয়। সেখানে দায়িত্ব নেন বাদশা মিয়া। এর পর ১৯৭৩ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নেন ওয়ারেশ আলী বিশ্বাস। তিনি দায়িত্ব ছাড়লে ১৯৭৭ সালে নির্বাচিত হন আলী আকবার। এর পর আবারও দায়িত্ব পান হাসান আলী। ১৯৮৩ সালে নির্বাচনে চেয়ারম্যান হন ওয়ারেশ আলী বিশ্বাস। এর পর দুইবার চেয়ারম্যান হন আব্দুল আজিজ।

আবার পরের নির্বাচনে ১৯৯২ সালে নির্বাচিত হন ডা. আব্দুল আজিজ। এ সময়ে এলাকার অবস্থা উত্তপ্ত হতে থাকে। ১৯৯৭ সালের ১৭ ফ্রেব্রুয়ারি চেয়ারম্যান ডা. আব্দুল আজিজকে খুন করা হয়। তাকে হত্যা করার মাধ্যমে এই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান খুনের মিশন শুরু হয়। ১৯৮৮ সালের দিকে আবারও চেয়ারম্যান নির্বাচিত আলী আকবার।

এর পর এলাকায় জাসদের একক আধিপত্য বিস্তার হয়। এর পর ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন আলী আকবর। তিনি ১৯৯৯ সালের ১৭ জানুয়ারি খুন হন। এর পর উপনির্বাচনে জাসদের আঞ্চলিক কমান্ডার আজিবর মেম্বারের বড় ভাই খয়বার রহমান চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাকেও ২০০০ সালের ৫ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরেই কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় সামাজিক দ্বন্দ্বে। একই দিনে হত্যাকারীদের পাঁচজনকেও পিটিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসী।

খয়বার নিহত হওয়ার পরে আজিবর নিজেই ২০০৩ সালের নির্বাচনে দাঁড়ায় এবং অস্ত্রের মুখে জয়লাভ করে। কিন্তু এ সময়ে এলাকায় কমুউনিস্টের প্রভাব বাড়তে থাকে। সে মেম্বার মিজানুর রহমানের নিকট দায়িত্ব দিয়ে ভারতে পালায় এবং সেখানে খুন হয়। আজিবরের ভাই দুলালও খুন হওয়ার মধ্য দিয়ে ঐ পরিবারের তিন ভায়ের গল্প শেষ হয়ে যায়।

চারজন চেয়ারম্যান ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ইউনিয়নে খুন হয়েছে আস্তানগরের আজিজুল মন্ডল, বাখইলের পলান মন্ডল, ছলিমদ্দিন, উদয় পুরের আফতাব মেম্বার, মঞ্জু, বাখইল গ্রামের মজিদ, আজাদ, ঝাউদিয়ার আব্দুল হালিম, হাতিয়ার মাখা জর্দার, মাছপাড়ার আক্কাস সর্দার, ছামছুদ্দিন,রহিম, রাজ্জাক, ফজু ফকির, ফিরোজসহ ৪৭ জন। এসব কারণে এলাকা ছেড়ে প্রায় শতাধিক পরিবার পাড়ি জমিয়েছে অন্যস্থানে।

এক সময়ের সামাজিক দলের প্রধান আবু তালেব মাস্টার দীর্ঘদিন ধরে হরিনারায়নপুর ইউনিয়নে বাড়ি করে সেখানে বসবাস করে আসছিল। সপ্তাহখানেক আগে সে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। ২০১৬ সালের সর্বশেষ আগে ২০১১ সালে সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রেক্ষাপট নতুন করে পাল্টে যায় সে নির্বাচনে। দীর্ঘদিন ধরে এই ইউনিয়নে জাসদ গণবাহিনীর প্রভাব বেশি ছিল। তাদের ভয়ে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত বখতিয়ার হোসেন দীর্ঘদিন এলাকা ছেড়ে বাইরে আত্মগোপনে ছিলেন।

২০১১ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে জয়ী হন। এর পরে তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে মনোনীত হন। তবে একটা বিষয় খুব আশ্চর্যের, তা হল ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বখতিয়ারের সময়ে ঝাউদিয়া ইউনিয়নে কোন সামাজিক কোন্দল বা খুন হয়নি।

২০১৬ সালের দলীয় নির্বাচনেও নৌকা প্রতীক পান বখতিয়ার হোসেন। কিন্তু সামাজিব দলের প্রতিপক্ষ গ্রুপের কেরামত আলী বিশ্বাস তাকে চ্যালেঞ্জ করে ভোটে অংশ নেন। তিনিও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। নির্বাচনে তিনি নৌকাকে হারিয়ে জয়লাভ করেন। এর পরই এলাকার প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। সেখানে আবারও শুরু হয় হামলা পাল্টা হামলা। এবার বখতিয়ারকে ছাড়িয়ে তার দলের নেতৃত্বে দেয় মজিদ মেম্বার।

ঐতিহ্যবাহী ঝাউদিয়া শাহী মসজিদও টাকা পয়সার অন্যতম কেন্দ্র

চাপাইগাছি বিলের নিয়ন্ত্রণকারী, এক সময়ের কমিউনিস্টের অন্যতম নেতা এই মজিদ মেম্বার এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। সর্বশেষ গত ২৪ সেপ্টেম্বরে এ কোন্দলে খুন হয়েছে দুজন। মাছপাড়ার কৃষক ইমান আলী ও বৈদ্যনাথপুর গ্রামের শাহাজ উদ্দিনকে গুলি ও কুপিয়ে খুন করা হয়। খুনের সময় মজিদ মেম্বার নিজে উপস্থিত থেকে গুলি করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুই খুনের পর ইবি থানায় ১১০ জনকে আসামী করে মামলা হয়েছে। এ মামলায় পুলিশ বখতিয়ার হোসেনসহ আটজনকে আটক করেছে। বাকিরা পালিয়ে রয়েছে। কিন্তু এলাকায় এখন পুরুষ শূন্য। সেখানে ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ঝাউদিয়া গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ শিক্ষক আছালত মোাল্লার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি জানান, পূর্বের সামাজিক কোন্দলের সঙ্গে এখন আবার রাজনৈতিক আধিপত্যের যোগ হয়েছে। ফলে প্রভাব খাটিয়ে দুটি গ্রুপই নিজেদের শক্তি দেখানোর চেষ্টা করছে। এর মাঝ পড়ে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে যেমন জীবনহানী অন্যদিকে দিনের পর দিন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাকা। সব মিলে এলাকার মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে এই কোন্দলে।

আছালত মোাল্লা বলেন, আধুনিক সময়ে মানুষের কাছে এ রকম আদিমতা কারও কাম্য নয়। ঝাউদিয়া বাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার বিশ্বাস বলেন, ইউনিয়নের এই খুন খারাবির প্রভাব শিক্ষার্থীর উপরও পড়ে। তারা ঠিকমত স্কুলে আসতে পারছে না। পরিবারে অশান্তি, ভয় ও আতঙ্ক থাকলে সেখানে লেখাপড়া করাও সম্ভব হয় না। ফলে এই গোন্ডগোল একটি জাতি ধ্বংস করে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, অবিলম্বে আলোচনার মাধ্যমে এখানে চলে আসা দীর্ঘদিনের বিরোধ মিমাংসা করা জরুরি। ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ঝাউদিয়ার এ কোন্দল দীর্ঘদিনের। সেখানে সব সময় সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়। থানা থেকে একটু দূরে বলে সাথে সাথে পুলিশ ভূমিকা রাখতে পারে না। স্থানীয় ক্যাম্প পুলিশের বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়ানোর মত শক্তি বা জনবল নেই।

প্রবীণ এই শিক্ষক বলেন, পুলিশ সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছে, বর্তমানে এলাকায় আতঙ্ক অবস্থা বিরাজ করছে। কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে এই ইউনিয়নের মানুষগুলোকে আমি শ্রদ্ধা করি। মহান মুক্তিযুদ্ধে তারা সাহসী ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু স্থানীয় সামাজিক দ্বন্দ্বের কারণে আজ সে ইউনিয়নটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea
Intlestore

বিশেষ প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ

Hairtrade