Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৯ আশ্বিন ১৪২৫, মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮:০৮ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

ঈদ ও বিশ্বকাপ : ফুটবল সমর্থকদের মধুর উত্তেজনা


১৮ জুন ২০১৮ সোমবার, ০৫:৩৯  পিএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


ঈদ ও বিশ্বকাপ : ফুটবল সমর্থকদের মধুর উত্তেজনা

ঢাকা : মুসলমানদের পবিত্র ঈদ আসে বছরে দুটি। ঈদ মানে খুশি বা আনন্দ। সেখানে কোনটি সংযমের মহিমায় আবার কোনটা ত্যাগের মহিমায় আনন্দ দিয়ে থাকে। কিন্তু এ আনন্দটি প্রতিবছরই নতুনরূপে ফিরে ফিরে আসে।

অথচ বিশ্বকাপের আসর ফিরে আসে প্রতি চারবছর পরপর। সেটি ফুটবল বিশ্বকাপ হোক আর ক্রিকেট বিশ্বকাপ হোক। আমরা জানি এখন প্রতিযোগীতামূলক বিশ্বে মানুষের হাতে নষ্ট করার মত সময় খুব কম। মানুষ শুধু এখন সাফল্যের দিকে ছুটছে প্রতিনিয়ত। তারউপর রয়েছে থ্রিজি, ফোর জি, ফাইভ জি এমনকি সিক্সজির মতো গতিময় ডিজিটাল ইন্টারনেট। সবাই এখন ভার্চুয়াল জীবনের দিকে। স্বাভাবিক অনুভূতি ব্যক্ত করার কিংবা বিনোদনের জন্যও যেন সময় হচ্ছে না যান্ত্রিক মানবদের। এরই মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতির উপস্থিতিতে ফিরে আসে সর্বজনীন খুশির ঈদ। আর তেমনি সকলের জন্য খুশির বার্তা নিয়ে এসেছে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮। এ যেন দ্বৈত আনন্দ একসাথে।

ঈদ মানে যেন খুশি কিংবা আনন্দ, তেমনি বিশ্বকাপ ফুটবল মানে বিশ্বময় আনন্দের বন্যা বয়ে চলে। খেলা শুরু হলে সারাবিশ্ব যেন একসাথে নেচে উঠে টিভি সেটের সামনে। আর আমরা বাঙালিরা তো এমনিতেই উৎসবপ্রিয় আবেগময় জাতি হিসেবে পরিচিত। কাজেই আমাদের তো এসব ক্ষেত্রে একটু বেশিই আসে-যায়। তাই দেখা গেছে এবারের ঈদুল ফিতর যেমন এসেছে বাড়তি বিশ্বকাপের মাতোয়ারা খুশি নিয়ে, তেমনি উল্টোভাবে বলতে গেলে বিশ^কাপ ফুটবলও খেলার উৎসবের আমেজের সাথে বাড়তি ঈদ আনন্দ যোগ করেছে। এবারের রমজানের ঈদ অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৬ জুন ২০১৮ এবং বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্ভোধনী ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৪ জুন ২০১৮ তারিখে। আনন্দের কী মধুর যোগাযোগ! খেলা শুরুর দিন থেকে প্রতিদিন গড়ে তিনটি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে যা আন্দোলিত করছে সারাবিশ্বের ফুটবল প্রেমিদের সাথে আমাদের বাঙালিদেরকেও।

ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে বিশ্বের অন্য দেশে কীভাবে বিভিন্ন দেশের সপক্ষে সমর্থন গড়ে উঠে তা বলা মুশুকিল, কিন্তু বাংলাদেশে এ নিয়ে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে যায় তা সবারই জানা। এখানে অদ্ভূত অদ্ভূত সব কর্মকা-। কেউ নিজের দলের সমর্থনের সপক্ষে জমা-জমি পর্যন্ত বিক্রি করে খাসি কিংবা গরু জবাই করে রীতিমত মেজবানির আয়োজন করে খাওয়াচ্ছে। আবার কেউবা তার নিজের সমর্থনের সপক্ষের দেশের পাঁচ কিলোমিটার পতাকা তৈরী করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে সবাইকে। এক্ষেত্রে কেউ কাউকে থামিয়ে রাখতে পারে না কিংবা থামানোর চেষ্টাও করে না।

বাংলাদেশের অনেকের অনেক দেশের প্রতি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সমর্থন থাকলেও পুরো দেশ মূলত দুটি শিবিওে বিভক্ত। তার একটি ব্রাজিল এবং অপরটি আর্জেন্টিনা। সেটি যে সব সময় কোন একটি সূত্র কিংবা গ্রামার মেনেই হয় তা নয়। এখানে অনেক আবেগ-অনুভূতি কাজ কওে থাকে। ব্রাজিল সমর্থকদের প্রধান প্রধান যুক্তি হল- তারাই হলো ফুটবল সুষ্টির আদি দেশ। ব্রাজিল এমন একটি দেশ, যে দেশের জাতীয় পতাকায় একটি বলের ছবি স্থান পেয়েছে। তাছাড়া সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট ফুটবলার পেলের দেশ ব্রাজিল। এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বার শিরোপাও জয় করেছে ব্রাজিল। আর এখন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ট স্ট্রাইকার নেইমার হলেন ব্রাজিলের ইত্যাদি ইত্যাদি। অপরদিকে আশির দশকে ফুটবলের আরেক যাদুকর ম্যারাডোনার মন মাতানো তারকাসুলভ ক্রীড়াশৈলি প্রদর্শন করে সারাবিশ্বের নজরে আসে। তখন তাকে বলা হতো ফুটবলের যাদুকর বা ঈশ্বর। ঐশ্বরিক শক্তি ছিল তার ক্রীড়াশৈলিতে।

একমাত্র ম্যারাডোনার বদৌলতে একবার আর্জেন্টিনা শিরোপা অর্জন করেছিল। রানার্স আপ হয়েছে বেশ ক’বার। এরপর থেকে আর্জেন্টিনা শিরোপা খুব বেশিবার না পেলেও বিশ^কাপের প্রতি আসরেই আর্জেন্টিনা থাকে টপ ফেভারিট হিসেবে। আর তাছাড়া ম্যারাডোনা থেকে তার উত্তরসূরি হিসেবে আসে লিওনেল মেসি।

আর এসব সমর্থন এবং পাল্টা সমর্থনের কারণে সারাদেশের প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় কিংবা ছাদে শোভা পেয়েছে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার জাতীয় পাতাকা। সেটা নিয়েও একটি ছোট্ট কাহিনি রয়েছে। একসময় শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের পতাকাই টানানো হতো। তাতে মনে হতো যেন এটা আমাদের বাংলাদেশ নয়। যেন একখ- ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা। আবার ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময়েও ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া , ইংল্যান্ড কিংবা শ্রীলংকান পতাকা উড়ছে। সেটাকে সমন্বয় সাধন করে একটি নির্দেশনা জারি করা হলো- যাতে যে যে দেশের সমর্থক সে দেশের পতকা উড়াবে কিন্তু সেই সাথে সবার উপরে আমাদের বাংলাদেশের রক্তাক্ত জাতীয় পতাকা চির উন্নত থাকতে হবে। সবাই সেটা মেনেছে এবং এখন তাই মানা হচ্ছে। আমরা যে দেশপ্রেমিক জাতি তার একটি বড় প্রমাণ এ জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন।

তবে এবারে ব্যাজিল এবং আর্জেন্টিনা দলের যে দুটি খেলা ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে কোন পক্ষই পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি। কারণ তারা কেউই গোলের হিসেবে জিততে পারেনি। প্রথমে ঈদের দিন অর্থাৎ ১৬ জুন ২০১৮ তারিখের খেলাটিতে আর্জেন্টিনা আইসল্যান্ডকে বিরাট ব্যবধানে হারাবে সেটাই সবার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ১-১ গোলে ড্র হওয়াতে সমর্থকরা হতাশ হলেও হয়তো বিরোধী শিবির অর্থাৎ ব্রাজিল সমর্থকরা কিছুটা মনে মনে খুশিও হয়ে থাকতে পারে। সেইসাথে ব্রাজিল সমর্থকরা আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধুর খোচা মেরে মরে কথা বলতে ছাড়েনি। কিন্তু পাশা উল্টে যেতে খুব বেশি সময় পর করতে হয়নি কারো।

দেখা গেল পরের দিন অর্থাৎ ১৭ জুন ২০১৮ তারিখের ব্রাজিলের প্রথম খেলায় সমর্থকসহ সকলের প্রত্যাশা ছিল ব্রাজিল তার প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ডকে বিরাট গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে এগিয়ে থাকবে। কিন্তু বিধির বিধান না যায় খ-ন। তারাও সুইজারল্যান্ডের সাথে ১-১ গোলে ড্র করে আর্জেন্টিনার পদাঙ্কই অনুসরণ করল। চুনকালি পড়ল মধুময় নিন্দুকদের চোখেমুখে। তখন আবার খুনসুটির সমালোচকদের বোল পাল্টে যেতে থাকল। সৃষ্টি হতে থাকল নতুন নতুন ব্যাখা বিশ্লেষণ, যুক্তি তর্ক ইত্যাদি। আসলে স্বভাবজাতভাবেই বাঙালি জাতি এটিকে সবসময়ই উৎসব হিসেবে নিয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলে দলে যেভাবে মতবিরোধ তৈরী হয়, খেলা নিয়ে কখনই সেরকম কোন মতবিরোধ সৃষ্টি হতে দেখা যায় না। এ যেন একটি সৌহার্দ্যের সারথী। সরকার-বিরোধী দল কারোর মধ্যেই যেন কোন বিরক্তি নেই। রাজনৈতিক বিরোধীতা থাকলেও খেলা সে সমর্থনের ক্ষেত্রে সবাই যেন একাকার। এখান থেকে অনেক কিছুই শিক্ষণীয় রয়েছে যা আমাদের সকলের স্বার্থে প্রয়োজনে শিখতে হবে।

ঈদের আনন্দের আমেজে যেহেতু বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়েছে, আশা করি আগামী একমাস যে এ খেলাটি চলবে সেখানে পুরো সময়জুড়েই সে শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করবে। এবারের ঈদটি যেমন অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে নির্বিঘ্নে হয়েছে। তেমনি ঈদের পরে বাড়ি থেকে কর্মক্ষেত্রে ফেরাটাও যেন তেমন নির্বঘ্ন হয় সেটা কামনা করি। বাঙালি খেলাপ্রিয় জাতি। দেখা গেছে একসময় আবাহনী-মোহামেডান খেলা হলে রাস্তায় কোন মানুষ থাকত না। সবাই বসে যেত টিভি সেটের সামনে। ফুটবলকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা-অকাক্সক্ষা। কিন্তু ফুটবল এতটা ভাল করতে না পারলেও ক্রিকেট নিয়ে আমরা সেই স্বপ্নের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি বলা চলে। সঠিক নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতায় একসময় আমরা ফুটবলকে নিয়েও অনেক এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি। এমনভাবে ঈদ আর বিশ্বকাপ উত্তেজনা একসাথে কবে হবে বলা মুশুকিল। সেজন্য এবারের দ্বৈত আনন্দ যেন চির ভাস্বর হয়ে থাকে।

লেখক: কৃষিবিদ ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

email: [email protected]

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।