Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১০ আশ্বিন ১৪২৫, বুধবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

অজানা আতঙ্কে হারিয়ে যাচ্ছে রাঙ্গামাটির চিরচেনা রূপ


১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ মঙ্গলবার, ০৩:০১  পিএম

মো: মোস্তফা কামাল, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

বহুমাত্রিক.কম


অজানা আতঙ্কে হারিয়ে যাচ্ছে রাঙ্গামাটির চিরচেনা রূপ
ছবি : বহুমাত্রিক.কম

রাঙ্গামাটি : কেমন যেন অচেনা শহরে পরিণত হচ্ছে প্রিয় শহর রাঙ্গামাটি। এক অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে কম বেশী সকলের মাঝে । এক সময় যে রাঙ্গামাটি ছিল শান্তি ও সম্প্রীতির শহর, সেই রাঙ্গামাটি শহরে এখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

সম্প্রীতির শহর হিসাবে যে রাঙ্গামাটি এক সময় উদাহরণ হিসাবে কাজ করতো সেই রাঙ্গামাটি শহরে এখন সাম্প্রদায়িকতার উত্থান, পারস্পরিক অবিশ্বাস , রাজনৈতিক কারণে হত্যা, হামলা, অপহরণ, হুমকি কোনমতেই কাম্য নয় । কাম্য হতে পারেনা।

শান্তিপ্রিয় রাঙ্গামাটিবাসীর মনে যারা অশান্তির বীজ বপন করছেন কিংবা আমাদের প্রিয় এ রাঙ্গামাটির শান্তি ও সম্প্রীতির ঐতিহ্য যারা বিনষ্ট করছেন তাদের যে কোন মূল্যে প্রতিহত করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের সেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।

ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যারা আমাদের চিরায়ত ঐতিহ্য নষ্ট করছেন তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে কাউকে কোন ছাড় দেয়া যাবেনা। একই সাথে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যারা নানানধরনের গুজব ছড়িয়ে তিল কে তাল বানাচ্ছেন তাদের ব্যাপারেও কঠোরতম অবস্থানে যেতে হবে।

রাঙ্গামাটির সাম্প্রতিক অবস্থান নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত একজন সদস্য তার ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন যিনি কর্মকালীন সময়ের একটি দীর্ঘ সময় রাঙ্গামাটিতে অতিবাহিত করেছেন। তার দেয়া এই স্ট্যাটাসে রাঙ্গামাটিকে নিয়ে তার হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে।

তিনি বলেছেন, একদা আশির দশকে বাংলাদেশের ফেনীকে বাংলাদেশের লেবানন হিসাবে উল্লেখ করা হতো। রাঙ্গামাটি কি এখন সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত দু:খজনক । তাহলে তার এই স্ট্যাটাস এর সূত্র ধরেই বলা যায় রাঙ্গামাটি নিয়ে ভিন্ন ভাবনার সৃষ্টি হচ্ছে অনেকের মাঝে।

এমন এক সময় ছিল যখন রাঙ্গামাটিকে বলা হতো দেশের সবচাইতে শান্তিপূর্ণ শহর। বাংলা নববর্ষকে ঘিরে যেখানে সকল সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এক হয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিত। জাতীয় রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দও যেখানে পরস্পরের হাতে ফুলের স্টিকার প্রদান করত সেই রাঙ্গামাটিতেই এখন কেন এই চিরচেনা পরিবেশ কলুষিত হচ্ছে?

দু:খজনক বিষয় হলো রাঙ্গামাটিতে জাতীয় রাজনৈতিক দলেগুলোর মধ্যে তেমন কোন কোন্দল না থাকলেও এখানে দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দলের সাথে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের যে বিরোধপূর্ণ অবস্থান তা দিনকে দিন যে অবস্থায় যাচ্ছে তাতে চরম অশনি সংকেতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাংলাদেশের মধ্যে এখন কোন জেলাতে সবচেয়ে বেশী হরতাল কিংবা অবরোধ হয় সে পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এ ক্ষেত্রে রাঙ্গামাটি এখন শীর্ষে রয়েছে। এখানকার স্থানীয় রাজনৈতিক দল গুলো প্রায়শ এখন এখানে হরতাল, অবরোধ, সড়ক অবরোধ, নৌ পথ অবরোধ এর মতো জনদুর্ভোগ সৃষ্ঠিকারী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচি পালনকারী সংঘঠনগুলো এগুলোকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হিসাবেই দাবী করছেন।

অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকেও রাঙ্গামাটিতে হরতাল আহবান করা হচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবীতে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ করা হচ্ছে । প্রতিবাদ সমাবেশ করা হচ্ছে এমনকি পুলিশের সাথেও সংঘর্ষ হচ্ছে। 

রাঙ্গামাটিতে সম্প্রতি একটি বিষয় মারাত্মক নিয়েছে। পত্রিকার খবর এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দাবী পাহাড়ে যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত বিশেষ করে উপজাতীয় ব্যক্তিদের তাদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে।

স্থানীয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র নেতা-কর্মীদের হাতে প্রতিনিয়ত অত্যাচারিত হচ্ছেন তারা। সাম্প্রতিক সময়ে রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে হত্যা, একাধিক নেতা –কর্মীর উপর হামলা, অপহরণ, হুমকি প্রদানের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় বিপুল সংখ্যক আওয়ামীলীগ এবং সহযোগী অংগ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের (উপজাতীয়)গণহারে দল থেকে পদত্যাগ এরন ঘটনা ঘটছে।

রাঙ্গামাটি তে একটা সময় ছিল যখন ছোটখাট ঘটনাও মূহুর্তের মধ্যে পাহাড়ী- বাংগালীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক ঘটনায় রুপ নিত। তবে মাঝখানে এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা থেকে কিছুটা উত্তরণ ঘটলেও ইদানিঙ সেই পুরানো বিষয়গুলো আবার মাথাচারা দিয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত কিংবা স্বার্থগত বিষয়কে সাম্প্রদায়িক রুপ দিয়ে রাংগামাটির সার্বিক শান্তিপূর্ণ ও সেৌহার্দময় অবস্থান বিনস্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনার পরপরই বিভিন্ন গুজব এবং ফেসবুকে নানান ধরনের উত্তেজনাকর স্ট্যাটাস ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্ঠা চালানো হচ্ছে।

তবে এখানকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতীর সুদৃঢ় বন্ধন বিনস্ট করার জন্য ইতিপূর্বেও একাধিকার চেষ্ঠা করা হয়েছে। রাঙ্গামাটির অতীত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে মাঝে মধ্যে এরা সফল হয়েছিল। তবে তাদের এই সফলতা স্থায়িত্ব পায়নি। ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সকল পর্যায়ের রাজনৈতিক, সামাজিক বিশিস্ট্য ব্যক্তিবর্গকে একই টেবিলে বসিয়ে সকলের মতামত নিয়ে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো হয়েছে। চরম অস্থিতীশীল পরিস্থিতিতেও পাহাড়ী-বাংগালী উভয় সম্প্রদায়ের বিশিস্ট্য ব্যক্তিবর্গ এক সাথে শান্তি র‌্যালিতে অংশ নিয়েছেন।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য রাজনৈতিক, সামাজিক সকল বিভেদ ভুলে গিয়েছেন। স্থাপন করেছেন সম্প্রতির অনন্য নজির। সময়ের প্রয়োজনে রাঙ্গামাটির শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত এবং এখানকার সেৌহার্দ ও সম্প্রীতির অবস্থান সুনিশ্চিত করার জন্য একদিকে যেমন সকলের মধ্যে শান্তিপূর্ণ মনোভাব সৃষ্ঠি করতে হবে অপরদিকে সম্প্রতি বিনষ্টকারী এবং অস্থিতীশীল পরিবেশ সৃষ্ঠিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসিনক অবস্থানে যেতে হবে।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।