Bahumatrik Multidimensional news service in Bangla & English
 
৯ মাঘ ১৪২৪, সোমবার ২২ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:০৩ অপরাহ্ণ
Globe-Uro

‘অচিরেই ব্যাংকিং খাতের পরিপূরক হয়ে উঠবে রেমিটেন্স’


২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ মঙ্গলবার, ০২:২৫  পিএম

আশরাফুল ইসলম ও সৈয়দ মোকছেদুল আলম

বহুমাত্রিক.কম


‘অচিরেই ব্যাংকিং খাতের পরিপূরক হয়ে উঠবে রেমিটেন্স’
-নূর-ই-ফেরদৌসী

ঢাকা : দুবাই ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার কোম্পানি আল ফারদান এক্সচেঞ্জ’র বাংলাদেশ প্রধান নূর-ই-ফেরদৌসী বাংলাদেশের বিকাশমান রেমিটেন্স খাতের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেছেন, অচিরেই এই খাত ব্যাংকিং খাতের পরিপূরক হয়ে উঠবে।

তিনি মনে করেন, এই খাতের উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে বিদেশ গমেনেচ্ছু শ্রমজীবী মানুষদের পেশা নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো গেলে দেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থার ঈর্ষণীয় উন্নতি করবে। দেশ এগিয়ে যাবে।

বহুমাত্রিক.কম-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব মতামত তুলে ধরেছেন তিনি।

একইসঙ্গে এই সেক্টরকে আরও সম্প্রসারণে তার ব্যক্তিগত অভিপ্রায়ও জানিয়েছে বিস্তারিতভাবে। কথা বলেছেন নারীদের কর্মসংস্থানের মূলধারায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কেও।

রংপুরে জন্ম নেওয়া নূর-ই-ফেরদৌসী রংপুর শিশু নিকেতন স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে।

এখানে শিক্ষাগ্রহণের সময় তিনি সাহচর্য পান নবযুগের নাট্যচর্চার পুরোধা নাটাচার্য সেলিম আল দীনের। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষার পাঠ গ্রহণ করে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।

পেশাগত জীবনে নূর-ই-ফেরদৌসী বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দেশে ও বিদেশে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়ার্ল্ডওয়াইড মানি ট্রান্সফার কোম্পানি ট্রান্সফাস্ট-এ মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৫’র শেষের দিকে তিনি দুবাইভিত্তিক মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান আল ফারদান এক্সচেঞ্জ এর বাংলাদেশ প্রধান হিসেবে যোগ দেন।

নূর-ই-ফেরদৌসীর সঙ্গে কথা বলেছেন আশরাফুল ইসলম ও সৈয়দ মোকছেদুল আলম

বহুমাত্রিক.কম: রেমিটেন্স আমাদের দেশে কিভাবে এলো?

নূর-ই-ফেরদৌসী : রেমিটেন্স হচ্ছে হুন্ডির উত্তম বিকল্প। হুন্ডিকে নিরুৎসাহিত করার জন্যই সরকার এটি চালু করে। আপনারা জানেন যে, অনেক অবৈধ পন্থা আমাদের দেশের আর্থিক খাতটাকে প্রভাবিত করে আছে। সেক্ষেত্রে রেমিটেন্স হচ্ছে বর্তমানে সেই খাতটা যা কিনা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্প আরএমজি (তৈরী পোশাক খাত) পর তৃতীয় প্রধান খাত। যেই খাত আমাদের দেশের অর্থনৈতিক গতি প্রবাহকে সঞ্চারিত করছে।

আমার সুযোগ হয়েছিল, দেশের বাইরে আমাদের যেসব ভাই-বোনেরা আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলার, নিজ চক্ষে দেখার তারা আসলে কতটা পরিশ্রম করে টাকাটা পাঠায়। এই খাতে আমি যদি কিছুটা কনট্রিবিউট করতে পারি, সেটা অনেকটা কারো আমনত সংরক্ষণের মতো ব্যাপার।

আমাদের ভাই-বোনদের কষ্টার্জিত সেই আমানত আমরা যথাযথ চ্যানেলের মাধ্যমে বৈধ পন্থায় তাদের পরিবার-পরিজনের হাতে পৌছে দিচ্ছি। আমার কাছে মনে হয়, এটা শুধুমাত্র একটা জব নয়। অনেকটা সামাজিক দায়িত্ব পালনের মতো। এই সেক্টরে যারা কাজ করেন তারা সবাই অনেক সিনসিয়ারিটি নিয়ে কাজ করেন।

আর ব্যাংকগুলো বেশির ভাগই রেমিটেন্স সেক্টরটাকে সাবসিডি দিয়ে থাকে। তারা সাবসিডি দিয়ে হলেও রেমিটেন্সটাকে সঙ্গে রাখে। কারণ তারা চায় যাতে বৈধ পথে টাকাটা দেশে আসে। যাতে বেআইনি হুন্ডির মাধ্যমে না আসে। এভাবেই আসলে রেমিটেন্স আমাদের আর্থিক খাতের অংশ হয়ে উঠে।

বহুমাত্রিক.কম: আপনাদের টার্গেট পিপল মূলত কারা?

নূর-ই-ফেরদৌসী : বলে রাখি, আমাদের টার্গেট পিপল কিন্তু রিচ পিপলরা নন। মূলত শ্রমিক শ্রেণিই হচ্ছেন আমাদের টার্গেট পিপল। আমরা কর্পোরেট বিজনেস কম করি।

বহুমাত্রিক.কম : দেশের বিশাল বৈদেশিক রিজার্ভ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই রেমিটেন্স প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অবদান রাখছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আপনারা যথাযথ স্বীকৃতি কী পাচ্ছেন?

নূর-ই-ফেরদৌসী : সব সময়। বালাদেশ ব্যাংক দিয়েই শুরু করবো। তাদেরকে আমরা শুরুতে যখন অ্যাপ্রোচ করলাম, তারা খুবই পজেটিভ ছিল আমাদের ব্যাপারে।

আমাদের কোম্পানি মূলত ইউএই মার্কেটে তৃতীয় বৃহৎ মানি টান্সফার কোম্পানি, যেটি ৫০ বছর ধরে ব্যবসা করছে। সেখানে আমাদের অবস্থানটা বেশ ভালো। সেখানে আমাদের ৭৫টির মতো শাখা রয়েছে। আরও কিছু পাইপলাইনে আছে। শিগগির ওপেন হবে। বাংলাদেশে আমাদের অ্যাক্টিভিটি শুরু হয়েছে মূলত গত বছর থেকে। এখানে কাজ করার অনুমতি পাওয়ার আগে যখন অ্যাপ্রোচ করেছি খুবই ইতিবাচক সহযোগিতা পেয়েছি।

সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করবো তাদেরকে, আমি যখন অনেকদিন এই সেক্টরে কাজ করতে যেয়ে শুনেই এসেছি, বাংলাদেশে ব্যাংকের কোনো জায়গায় গেলে ‘স্পিডমানি’ ইনভেস্ট করতে হবে। আমি এবিষয়ে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্টে কাজ করেছি, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করেছি কখনো এটি ফেইস করিনি। কেউ আমাকে কথিত সেই ‘স্পিডমানি’ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেন নি। তারা এই খাতটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বলেই কিন্তু আমদের এই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হয়নি। তারা নিবিড়ভাবে আমাদের রেমিটেন্সের গতিপ্রবাহকে পর্যবেক্ষণ করেন। যখন কোনো কোম্পানি ভাল করছে, তখন তাদেরকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতায় তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

বহুমাত্রিক.কম: আপনারা কী স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছেন নাকি ব্যাংকের সঙ্গে ?

নূর-ই-ফেরদৌসী : শুধুমাত্র ব্যাংকগুলোর সঙ্গে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন মার্কেট থেকে আমাদের আয় করার কোনো সুযোগ নেই। দেশের মার্কেটে আমরা বিনিয়োগকারী হিসেবে রয়েছি। দেশের মার্কেটে আমরা বিনিয়োগ করবো রিলেশনশিপ তৈরী করার জন্য-ব্র্যান্ডিং করার জন্য। আমাদের এই লাইজন অফিসগুলো কোনো পারমিশন নেই যে আমরা দেশের মার্কেট থেকে কোনো উপার্জন করবো। দেশের অর্থনীতিতে যাতে বিনিয়োগকারী হিসেবে অবদান রাখতে পারি সেজন্য আমাদের বাংলাদেশে আসা। আমাদের কোম্পানি একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কর্পোরেট ব্যাংকে ডিপোজিট করে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্টের বিদ্যমান আইন অনুসারে এখানে কাজ করার সুযোগ পায়।

বহুমাত্রিক.কম : আপনাদের লেনদেনে কোনো নির্দিষ্ট সীমা আছে কী?

নূর-ই-ফেরদৌসী: একটা সীমারেখা আছে ৬ মাসের মধ্যে ৫০ হাজার ডলার লেনদেন করার। তারা চায় যত বেশি অর্থ আমরা নিয়ে আসতে পারি, ততোই বাংলাদেশের জন্য ভালো। আমাদের ওপর নির্দেশ থাকে-যতো বেশি বিনিয়োগ করতে পারবো ততো বেশি উৎসাহিত করা হবে। আমাদেরকে কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুপূর্ণ ক্লায়েন্ট হিসেবে গণ্য করে থাকেন।

বহুমাত্রিক.কম : নতুন সেক্টর হিসেবে, বিকাশমান সেক্টর হিসেবে কী ধরণের বাধাবিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে আপনাদের-

নূর-ই-ফেররেদৗসী: আসলে আমাদের পূর্বে যেসব প্রতিষ্ঠান এসেছে, তারা অনেক সংগ্রাম করেছে, আমরা তাদের স্যালুট জানাব। উনারা তখন অনেক বেশি সমস্যা মোকাবেলা করেছে। আমরা যখন দায়িত্ব নিলাম, তখন আসলে একটি কর্পোরেট এনভায়রনমেন্ট তৈরী হয়ে গেছে। আগের কোম্পানিগুলো অনেক সমস্যা তখন মোকাবেলা করেছে, কারণ তখন হুন্ডিটা অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিল। হুন্ডির বাহুবল অনেক শক্ত ছিল। যখন বৈধ পথে রেমিটেন্স আসতে শুরু করলো কেউ কিন্তু শুরুতে সেভাবে মেনে নেয় নাই। দাপ্তরিক চাপগুলোও তাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে।

আমি নাম বলতে চাই না, কোনো এক কোম্পানির বাংলাদেশ প্রধান হুন্ডির লোকদের কাছে প্রহৃত হয়েছেন। তাকে ধরে মেরেছে পর্যন্ত। সেই অবস্থাটা আমাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে না। এরই মধ্যে এটি স্বীকৃত একটি সেক্টর। এখন দেখবেন প্রত্যেকটি ব্যাংকে রেমিটেন্স নামে আলাদা একটি বিভাগই আছে। প্রত্যেকটি ব্যাংকে যাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি আছে, সেখানে আমাদের দু’জন করে প্রতিনিধি আছেন, যারা স্থানীয়দের গ্রাহকদের সহযোগিতা দিয়ে থাকেন। অপারেশনাল সাপোর্টগুলো প্রত্যেকটা ব্যাংক থেকে আমরা পাই।

তবে একজন নারী হিসেবে বলবো-এখন পর্যন্ত তো মেয়েদেরকে সমাজে সেভাবে নেয় না। একজন নারী হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, কখনো কখনো একটু বাড়তি সংগ্রাম তো করতেই হয়। তবে একে জীবনের অংশ হিসেবেই মনে করি। পেছানোর কোনো সুযোগ নেই। যখন চিন্তা করেছি, সামনে যাব তখন সামনে যেতেই হবে। পিছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই।

বহুমাত্রিক.কম : হুন্ডির ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত ধারণা আছে-এখানো কেউ টাকা নিয়ে প্রতারিত হয় না, সরকার রাজস্ব না পেলেও একটি ইতিবাচক ধারণাও আছে। আপনি হুন্ডির কী কী নেতিবাচক দিক দেখতে পান-

নূর-ই-ফেরদৌসী : এখানে আপনাকে দেখতে হবে, হুন্ডিটা কারা চালায়। যাদের পেশিশক্তি আছে, সন্ত্রাসবাদে জড়িত তারাই চালায়। আমরা যদি হুন্ডিতে টাকা পাঠাই তাহলে তো আমরা তাদেরকেই পরিপুষ্ট করছি। তাদের ব্যবসাকে আরও সম্প্রসারণ করছি। এই টাকা দিয়ে তারা বেআইনি অস্ত্র কিনছে। যে অস্ত্র কিনে তারা এখানে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এটা হচ্ছে হুন্ডির একধরণের নেতিবাচক দিক।

দ্বিতীয়ত: হুন্ডিতে হয়তো কেউ প্রতারিত হচ্ছে না, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এই টাকাগুলো তারা পাচ্ছে কোথায়? তাহলে ওরা আমাদেরকেই শোষণ করছে। আমরা না বোঝে তাদেরকেই সমর্থন করে যাচ্ছি। কিছু কিছু মোবাইল অপারেটর মোবাইল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে-যেগুলো বাংলাদেশে বৈধ না, তবু তারা ব্যবসা করছে। যারা রেমিটেন্স সেক্টরে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে, যা বৈধ নয়।

হুন্ডিকে প্রতিহত করার জন্য অদ্বিতীয় ও একমাত্র সেক্টর হচ্ছে রেমিটেন্স সেক্টর-যথাযথ চ্যানেলে ব্যাংকের মাধ্যমে। শুধু তাই না, যারা বিদেশে থাকে, আমাদের ভাই-বোনেরা, ধরেন তারা দশ হাজার টাকা পাঠাবেন। স্বজনরদের হাতে যখন সেই ক্যাশ টাকাটা যাবে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তা খরচ হয়ে যাবে। আর যখন তাদের একটি করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকবে তখন হয়তো দশ হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা উঠাবেন, এভাবে টাকা জমানোর প্রবণতা তৈরী হবে। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় বলতে কিছু নাই কিন্তু বিশেষভাবে যারা বিদেশে থাকে তাদের পরিবার যেটা পাচ্ছে খরচ করে ফেলছে। সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে দশ-পনের বছর পর যিনি বিদেশ থেকে আসবেন, তখন তিনি দেখবেন তার হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে অর্জিত অর্থের কিছুই আসলে রাখেনি তার পরিবার।

এক্ষত্রে যদি নির্দিষ্ট একটা অ্যাকাউন্ট থাকে, সঞ্চয় থাকে, তাহলে সম্পদ সৃষ্টির প্রবণতা তৈরী হবে। এভাবেই তো এককটি দেশ উন্নতি করে।

বহুমাত্রিক.কম : বিদেশ থেকে বিভিন্ন মানি ট্রান্সফার কোম্পানির মাধ্যমে টাকা পাঠাতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ বৈরী অভিজ্ঞতার কথাও বলেন। যেমন জাতীয় পরিচয়পত্রে ছোটখাটো ভুল থাকে, ফরম পূরণ করায়ও ভুল হয়-যা বিড়ম্বনার তৈরী করে। তাদের দাবি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সেভাবে স্টেকহোল্ডার বান্ধব হয়ে উঠেনি-

নূর-ই-ফেরদৌসী: একজন মানুষ আসলে একবারই ভুল করে। যে সমস্যাটা হয় তা হচ্ছে, ধরেন নামটা এক অক্ষরে-ফাতেমা। তিনি বিদেশ থেকে যখন টাকাটা পাঠান তখন কিন্তু এক নামে আসে না। প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় নাম থাকে। তখন মিস ফাতমা, মোসাম্মৎ ফাতেমা-এমন কিছু একটা লাগিয়ে দিয়ে টাকাটা বালাদেশে পাঠায়। কিন্তু ভোটার আইডিতে শুধুই আছে ফাতেমা। এভাবেই আসলে কিছু সমস্যা তৈরী হয়। এক্ষেত্রে শিখতে শিখতেই শিখবেন।

বহুমাত্রিক.কম : আপনি মনে কিনা এক্ষত্রে ব্যাংক বা রেমিটেন্স প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সহযোগিতা করার দরকার?

নূর-ই-ফেরদৌসী: আমরা যথেষ্ট সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। নামের বিষয়গুলো কিন্তু আমরা বলে দিই আপনারা দিয়ে দেন। কারণ বিভিন্ন রকম ভেরিফিকেশন হয়। যেমন জিজ্ঞেস করে আগেরবার কত টাকা নিয়েছিলেন, এরকম । অনেক স্টেপ আছে। শুধু আইডি ভেরিফিকেশনই না, আরও ভেরিফিকেশন হয়। এমনও হয়েছে এক বোন-আরেক বোনের টাকা উঠাতে এসে ধরা খেয়ে গেছে।

ব্যাংকগুলো অনেক সহযোগিতা করে। প্রতেকটি ব্যাংকে নির্দেশনা থাকে রেমিটেন্সের জন্য কেউ যেন দাঁড়িয়ে না থাকেন। সব জায়গায় বিশেষ খাতির করে। তারা হচ্ছেন কনট্রিবিউটর। তাদের দ্বারা দেশের অর্থনীতি ঘুওে দাঁড়াচ্ছে। ব্যাংক ম্যানেজাররা তাদের চা খাইয়েও টাকাটা হাতে তুলে দেন।

তারপরও বিচ্ছিন্ন ঘটনা তো আছেই। আমাদের কোনো গ্রাহককে বাজেভাবে ট্রিট করা হয়েছে এমন নজির এখনো পাইনি। যদিও আমার কাছে আসার তাদের কোনো সুযোগ নাই। তারা হয়তো জানেও না আল ফারদান নামে একটি কোম্পানি আছে। তারা হয়তো জনতা ব্যাংক থেকে টাকা উঠাচ্ছে, বা ইসলামী ব্যাংক থেকে।

বহুমাত্রিক.কম : সম্প্রতি দেশে-বিদেশে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে একধরণের সতর্কতা জারি করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। এক্ষেত্রে আপনাদের বাড়তি কোনো সতর্কতা আছে কী?

নূর-ই-ফেরদৌসী: নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি যদি লেনদেন হয় তখন ব্যক্তিগত নয়, কর্পোরেট ট্রানজেকশন হয়। সেক্ষেত্রে লাইসেন্সসহ সব ডুকমেন্ট দিয়ে লেনদেনটা করতে হয়। এরপরও যে আসে না তা না। দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকে চলে আসে সেরকম লেনদেন। তখন আমাদের দায়িত্ব থাকে মনিটর করা। জানা চেষ্টা করি এই ট্রানজেকশনটা নেবে কে? তখন আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমরা তাদের জানাই-এই ট্রানজেকশনটা সন্দেহজনক মনে হচ্ছে, একটু মনিটর করা হোক। বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করি। বাদবাকীটা তারা দেখে। মোটকথা সন্দেহজনক মনে হলেই যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি।

বিভিন্ন দেশে টাকা পাঠানো নিষেধ আছে। আমি যখন দেশের বাইরে ছিলাম দেখেছি, ইরাক-ইরানে টাকা পাঠানো নিষিদ্ধ ছিল। একটা নির্দিষ্ট পরিমানের বেশি টাকা পাঠানো নিষিদ্ধ। ওই পরিমাণ অতিক্রম করলে যথাযথ ডকুমেন্টশন ছাড়া টাকা উঠানো যায় না।

বহুমাত্রিক.কম : রেমিটেন্সের জন্য সম্ভাবনাময় দেশ কোনগুলো? নতুনভাবে আর কোথায় এই সম্ভাবনা আছে-

নূর-ই-ফেরদৌসী : মালয়েশিয়া আছে। জিজিসি (সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত) তো আছেই। জিসিসি-তে ভিসাটা ওপেন করছে না। যাদের ওয়ার্কপারমিট শেষ হয়ে যাচ্ছে তখন তাদের দেশে ফেরত আসছে হচ্ছে।

যত তাড়াতাড়ি জিসিসির চ্যানেলগুলো ওপেন হয়ে যাবে, ততোই ভাল। জিসিসি ইজ দ্য বেস্ট মার্কেট অব বালাদেশ রেমিটেন্স। কেএসএ’তে যেটা হল। মধ্যপ্রাচ্য হল একেবারে কী পয়েন্ট, আমরা বেঁচেই আছি মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্য যারা যায় তারা শ্রমিক শ্রেণি। তাদের পরিবার সঙ্গে যায় না। সবাইকে রেখে যায়। তাদের দেশে টাকা পাঠানাটা বাধ্যতামূলক থাকে।

জিসিসিতে কখনো স্থায়ী রেসিডেন্সশিপ পাবে না। ইউরোপ আমেরিকায় যেটা হয়-স্থায়ী রেসিডেন্টশিপ পাওয়ার সুযোগ থাকে। নির্দষ্ট সময় পরে পিআর পেয়ে যাবে। তার চিন্তা করে পরিবার নিয়ে যান। তখন তাদের আয়টাও সেখানেই থেকে যায়। তাদের ট্রানজেকশন যা হয় ঈদ বা উৎসবের সময়গুলোতে।

প্রত্যেক মাসে টাকা আসে আসলে লেবার ওরিয়েন্টেড কান্ট্রিগুলো থেকে। যেমন-বাহরাইন, সৌদি আরব, দুবাই প্রভৃতি তারপরও ইউরোপ-আমেরিকায় শিক্ষার্থীরা পড়তে যাচ্ছে, তারাও টাকা পাঠান। তবে যুক্তরাজ্য থেকে ট্রানজেকশনগুলো হুন্ডি করতে পছন্দ করে।

বহুমাত্রিক.কম : আমাদের রেমিটেন্স সেক্টরটি বিকাশমান একটি সেক্টর। প্রবাহমান রেমিটেন্স সেক্টরটাকে আরও নিরাপদ ও সম্প্রসারিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর কী করা উচিত বলে মনে করেন ?

নূর-ই-ফেরদৌসী : এবিষয়ে আমার প্রস্তাব ছিল একটি ফেরাম প্রতিষ্ঠার। যে ফেরাম আসলে কাজ করবে এই সেক্টরকে আরও বিকশিত করতে-সম্প্রসারিত করতে।

ধরুন একজন বিদেশে যাবে তিনি প্রোপার চ্যানেলটাই বুঝে উঠতে পারছেন না। অবৈধভাবে লোকজন নদীপথে পাড়ি জমাচ্ছে, কারণ তারা আসলে জানেই না কিভাবে বিদেশ যেতে হয়। এর থেকে অনেক কম ঝুঁকি ও কম টাকায় বৈধ চ্যানেলে যাওয়া সম্ভব সেটা তারা জানেন না। এক্ষত্রে যদি মেসিভ আকারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বা সরকারে পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো যায়-এভাবে তোমরা যেও না, আমরা তোমাদের ইনফরমেশন দেব, তোমরা এভাবে নিরাপদে যাও।

একই সঙ্গে বিদেশে গমনেচ্ছুরা যখন জনশক্তি রপ্তানি বুরে‌্যাতে আসেন, আমরা তখন তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারি। আমরা যদি সব রেমিটেন্স প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে হয়ে তাদের সহযোগিতা করতে পারি, তাহলে পুরো সমাজের একটি বড় অংশের উন্নয়ন করা সম্ভব। এর আগে আমি যখন ট্রান্সফাষ্ট-এ ছিলাম তখন ব্র্যাক’র সঙ্গে চেষ্টা করেছিলাম বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে। তখন তারা বিষয়টিতে কাজ করতে আগ্রহীও হয়েছিল। ব্র্যাকের একটি প্রোগ্রামই আছে মাইগ্রেশন নিয়ে। ব্র্যাকের অনেক ট্রেইনার আছেন, আমরা তাদের ট্রেনিং দিতে পারি, তারা যেটা করবে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বলবে তাদের স্বামীরা যাতে বৈধপথে বিদেশে যায়, বৈধপথে টাকা পাঠায়।

আরেকটা পরিকল্পনা ছিল আমার, আমি ব্র্যাকের সঙ্গে শেয়ার করেছিলাম-দেশ থেকে যারা বিদেশে যায় তারা বেশির ভাগ অদক্ষ। তাদের উপার্জন ক্ষমতা খুবই কম। সেক্ষেত্রে আমরা যদি তাদের কিছুটা কারিগরি দক্ষ করে পাঠাতে পারতাম-যেমন নারী চালকদের অনেক চাহিদা জিসিসি দেশগুলোতে। ব্র্যাক তখন বলেছিল আমাদের বিনিয়োগ করতে, শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ জটিলতায় প্রসঙ্গটি এগোয়নি।

তখন এটি হয়নি কিন্তু এটি আমার একটি পরিকল্পনা ছিল। একসময় হয়তো হবে। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশ থেকে মাইগ্রেশন কখনো বন্ধ হবে না। মানুষ যেতেই থাকবে। শুধু বাংলাদেশ কেন পথিবীর সব দেশ থেকেই একদেশ থেকে আরেক দেশে মানুষ যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আশা করা যায় অচিরেই রেমিটেন্স সেক্টরটা ব্যাংকগুলোর পরিপূরক হয়ে উঠবে।

বহুমাত্রিক.কম : দেশের সম্ভাবনাময় রেমিটেন্স সেক্টরকে ঘিরে মানিট্রান্সফার কোম্পানিগুলোতে কাজ করার জন্য দক্ষ মানুষ সম্পদ কতটা তৈরী হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবিষয়ে অধ্যয়নের সুযোগ-ই কতটা?

নূর-ই ফেরদৌসী : আমার জানামতে, বিশেষ ভাবে রেমিটেন্স খাতটাকে গুরুত্ব দিয়ে কোনো একাডেমিক বিষয় এখনো অন্তর্ভূক্ত হয়নি। এছাড়া এনিয়ে কোনো ডিসকাশন বা সেমিনার এখনো সেভাবে হয়নি। যদি কখনো সুযোগ পাই নিশ্চয় এনিয়ে কাজ করার চেষ্টা করবো।

বহুমাত্রিক.কম : নারীদের কর্মসংস্থানের মূলধারায় নিয়ে আসতে, কিংবা অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে কী করা উচিত-

নূর-ই-ফেরদৌসী : মেয়েদের পড়াশুনা একটা লেভেলে এসে বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়, যেটা আমরা গ্রামে সাধারণত দেখে থাকি। এখনো এই চিন্তা বদ্ধমূল রয়েছে, মেয়েদের গায়ের রঙটা ফর্সা হতে হবে-তার মেধা আছে কিনা সেটা বিষয় নয়। এই কুসংস্কারগুলো থেকে বেরিয়ে এসে যদি আমরা ছেলে মেয়ের প্রভেদ গুচাতে পারি তাহলে উন্নতি হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এই কথাগুলি আমরা সবাই জানি তবে বাস্তবায়নের বেলায় ছেলে আর মেয়ের বেলায় প্রভেদটা থেকেই যাচ্ছে।

শুধু গ্রামের কথাই বলবো কেন, শহরেও অনেক শিক্ষিত পারিবারের কথা জানি, যারা ছেলে-মেয়ের ক্ষেত্রে প্রভেদ করেন। গতকালও আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম এনিয়ে। আমার পরিচিত নারী যিনি মা হবেন। ডাক্তারি পরীক্ষার পর জানা গেছে তার মেয়ে হবে। এরপর থেকে তার স্বামী ও শ্বশুড়বাড়ির লোকজন যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। অনেকে বলেন এরকম হয়-ই। আমার কথা হচ্ছে আর কয় জেনারেশন লাগবে এথেকে বের হয়ে আসতে, আমি আসলে জানি না।

বহুমাত্রিক.কম : রেমিটেন্স সেক্টরে নারীর অবদান কতটুকু?

নূর-ই-ফেরদৌসী : অবশ্যই নারীদের বড় অবদান রয়েছে। সম্প্রতি সরকার সৌদিতে নারী কর্মী পাঠাচ্ছে। কিন্তু তাদের সেরকম প্রশিক্ষণ নেই। কিছুদিন আগে চায়না থেকে বিদেশি বন্ধুরা এসেছিলেন। তারা বলছিলেন চায়নাতে তো সব হোটেলে নারীরা সার্ভ করে, আমাদের হোটেলগুলোতে সব পুরুষ কর্মী কেন?

বললাম আমাদের এখানে সে অবস্থা এখনো তৈরী হয়নি দক্ষতা বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে। তাই আমাদের চিন্তা করতে হবে কোন দেশে কোন ধরণের নারী শ্রমিক দরকার-তা নিয়ে যদি গবেষণা-সমীক্ষা করে দেখা হয়, তাদেরকে সেইভাবে দক্ষ করে পাঠাতে পারলে এই খাত আরও ভাল করবে।
যেমন গালফে মহিলাদের জন্য মহিলা ক্যাব থাকে, যাকে বলে পিঙ্ক ক্যাব। ওই ক্যাবে শুধু মহিলারাই উঠতে পারেন। ওই ক্যাব চালান নারীরাই। এর ভাড়াও স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ। সেই নারী চালক ছেলেদের চেয়েও বেশি আয় করেন।

সেইদিক বিবেচনায় আমাদের দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে হবে। তা না করে অদক্ষ শ্রমিক পাঠালে একটি নির্দিষ্ট সময় পর সে দেশে আসার জন পাগল হয়ে যাবে। তার জমিটাও গেল, খরচও উঠিয়ে আনতে পারলো না। তাদের কাছে মনে হয় এদেশে অনেক কষ্ট, থাকা সম্ভব না। তার সাথে ইন্ডিয়ান ভাল বেতন পাচ্ছে। নেপালি-পিলিপাইনের ওরা ভাল করছে..বাংলাদেশের অবস্থার সবার নীচে। শেষ পর্যন্ত তারা ফেডআপ হয়ে যাচ্ছে। তাই আবারও বলছি বিদেশের যাওয়ার আগে যদি একটা পার্টিকুলার প্রফেশনে যান ও সেই বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে যান তাহলে এমন হবে না।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea
Intlestore

মুখোমুখি -এর সর্বশেষ

Hairtrade